বলরাম মন্দির স্বামী বিবেকানন্দের বহু স্মৃতি বক্ষে পরম আদরে ধারণ করিয়া আছে। পরিব্রাজক অবস্থায় স্বামী বিবেকানন্দ বলরাম বসুকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান হইতে অনেকগুলি পত্র প্রেরণ করেন। উক্ত পত্রগুলি বলরাম বসুর প্রতি তাঁহার শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও ভালবাসার গভীর পরিচয় বহন করিতেছে। বারাণসীতে অবস্থানকালে বলরাম বসুর মৃত্যু-সংবাদ পাইয়া স্বামী বিবেকানন্দ ক্রন্দন করিয়াছিলেন। উহা প্রত্যক্ষ করিয়া সুপণ্ডিত প্রমদাদাস মিত্র জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি সন্ন্যাসী হইয়া এত শোকাকুল কেন? সন্ন্যাসীর পক্ষে শোক করা অনুচিত।’ তদুত্তরে বিবেকানন্দের মুখ হইতে যে বাণী নির্গত হইয়াছিল তাহাতে তাঁহার বিশাল হৃদয়বত্তা ও সংবেদনশীল মনের অভিব্যক্তি প্রকাশিত হইয়াছিল। স্বামী বিবেকানন্দ বলিয়াছিলেন, ‘বলেন কি! সন্ন্যাসী হইয়াছি বলিয়া হৃদয়টা বিসর্জন দিব? প্রকৃত সন্ন্যাসীর হৃদয় সাধারণ লোকের হৃদয় অপেক্ষা বরং আরো অধিক কোমল হওয়া উচিত। হাজার হউক, আমরা মানুষ তো বটে! তাছাড়া তিনি যে আমার গুরুভাই ছিলেন। আমরা এক গুরুর চরণতলে বসিয়া শিক্ষালাভ করিয়াছি। যে সন্ন্যাসে হৃদয় পাষাণ করিতে উপদেশ দেয় আমি সে সন্ন্যাস গ্রাহ্য করি না।’
স্বামী প্রেমানন্দের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা তুলসীরাম ঘোষ বলরাম মন্দিরে স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিচারণা প্রসঙ্গে লিখিয়াছেন, “১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে বলরামবাবুর দেহান্ত হয় নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হইয়া। শেষের দিকে সবসময় ‘মিলর্ড, মিলর্ড, প্রভু, প্রভু’ বলিতেন। হলঘরে পয়লা বৈশাখ দেহান্ত হয়। সংবাদ পাইয়া পশ্চিম হইতে স্বামীজী আসিয়া একমাস হলঘরে থাকেন শ্রাদ্ধ পর্যন্ত। যতদূর স্মরণে আসে—ঠাকুরের দেহান্তের পর আঁটপুরে স্বামীজীর সঙ্গে বাবুরাম, শশী, নিরঞ্জন, কালী, শরৎ, গঙ্গাধর, শিবানন্দ ও সারদা যান।
“স্বামীজী বলরামবাবুকে বলিতেন, ‘আপনার সঙ্গে আমাদের সম্বন্ধ আলাদা। আপনি যদি আমাদের এ-দরজা দিয়ে বার করে দেন তো আবার ও-দরজা দিয়ে ঢুকব।’
“বলরামবাবুর বাড়ির—দ্বিতলে হলঘর। একদিন মধ্যাহ্নে ঠাকুর দক্ষিণ শিয়রে শায়িত। নরেন্দ্রনাথ কিয়ৎদূরে পূর্বদিকের দেওয়ালে মুখ করিয়া দক্ষিণ-শিয়রে শুইয়া আছেন। ঠাকুর হামা দিতে দিতে স্বামীজীর নিকটে আসিয়া তাঁহাকে ধীরে ধীরে স্পর্শ করিতেছেন। সহসা চমক লাগিয়া নরেন্দ্রনাথের নিদ্রাভঙ্গ হইল। চিৎকার করিয়া বলিলেন, ‘Lo the man is entering into me!’ (দেখ লোকটা আমার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে!) তাহা শুনিয়া ঠাকুর হাসিতে হাসিতে বলিলেন, ‘শালা মনে করেছ, তোমার কিড়ির-মিড়ির ইংরেজি বুলি বুঝি না? তুমি বলছ, আমি তোমার ভিতর ঢুকে যাচ্ছি।” আমরা অবগত আছি, ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে স্বল্পকালের ব্যবধানে সুরেন্দ্রনাথ মিত্র এবং বলরাম বসু দেহত্যাগ করিয়াছিলেন। তাঁহারা যে উভয়েই রামকৃষ্ণ সংঘের রসদ্দার হিসাবে প্রভূত সেবা করিতেন তাহা সর্বজনবিদিত। তাঁহাদের অবর্তমানে প্রাথমিকভাবে যে পরিস্থিতি উদ্ভূত হইয়াছিল তাহা সহজেই অনুমেয়। অথচ রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের (যদিও তখন রামকৃষ্ণ মিশন আত্মপ্রকাশ করে নাই) ভবিষ্যৎ-রূপরেখা সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দ যে সেই কালে চিন্তা করিতেছিলেন তাহা একটি পত্রের মাধ্যমে সম্যকভাবে প্রকাশিত হইয়াছে। বলরাম ভবনে অবস্থানকালে স্বামী বিবেকানন্দ ২৬ মে ১৮৯০ তারিখে প্রমদাদাস মিত্রকে যে পত্র লিখিয়াছেন তাহাতে রামকৃষ্ণ সংঘ সম্পর্কিত তাঁহার দিব্যভাবনা এবং রূপায়ণ বিষয়ক পদ্ধতি-প্রকরণের আভাস রহিয়াছে।
স্বামী শিবপ্রদানন্দ সম্পাদিত ‘শ্রীরামকৃষ্ণ-ভাবতীর্থ বলরাম মন্দির’ থেকে