নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: শনিবারের সকাল। অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেকটাই ফাঁকা মা ফ্লাইওভার। বাইপাসগামী লেন দিয়ে দ্রুত গতিতে যাচ্ছিল কালো এসইউভি গাড়িটি। ওভারটেক করতে গিয়ে আচমকাই নিয়ন্ত্রণ হারায় গাড়িটি। ডিভাইডার টপকে এসে বিপরীত লেনের দু’টি গাড়িকে ধাক্কা মারে সেটি। দুর্ঘটনা কবলিত একটি গাড়ির মধ্যে তখন ইউনিফর্ম পরে বসে খুদে পড়ুয়া। বাবা-মায়ের সঙ্গে স্কুলে যাচ্ছিল চার বছরের শিশুটি। গাড়ি চালাচ্ছেন চালক। আচমকাই প্রচন্ড সংঘর্ষ। তাতেই রীতিমত থরথর করে কাঁপতে থাকে শিশুটি। ট্রমাগ্রস্ত হয়ে পড়ে স্কুলপড়ুয়া। গুরুতর জখম হন গাড়ির চালক। দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে যে বেপরোয়া গাড়িটি, তার চালককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, সকাল ৮টা নাগাদ তপসিয়া থানা এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। ‘থার’ গাড়ি বিপজ্জনক গতিতে আসছিল পার্ক সার্কাসের দিক থেকে। বাইপাসমুখী ফ্ল্যাঙ্কে একের পর এক গাড়িকে ওভারটেক করে এগিয়ে যাচ্ছিল গাড়িটি। বিশ্বকর্মা বিল্ডিংয়ের কিছুটা আগেই দুর্ঘটনা ঘটে। পার্ক সার্কাসের দিকে যাচ্ছিল একটি কালো অল্টো গাড়ি। তাতে সন্তান সহ এক দম্পতি ছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁদের নাম অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (৪০), স্বর্ণালী রায় (৩৮)। নিউটাউনের বাসিন্দা তাঁরা। দম্পতি ৪ বছরে ছেলে রায়ান বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্কুলে ছাড়তে যাচ্ছিলেন। সংশ্লিষ্ট গাড়িটি চালাচ্ছিলেন গোপাল চৌধুরী (৩২)। তিনি রাজারহাটের বাসিন্দা।
উলটোদিকের লেন থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি ডিভাইডারে ধাক্কা মারে ‘থার’। ভেঙে যায় ডিভাইডারের কংক্রিট। অভিঘাতে গাড়ির সামনের ডানদিকের চাকাও খুলে বেরিয়ে যায়। নিয়ন্ত্রণ হারানো সেই গাড়ি অনির্বাণদের ছোট গাড়ির ডানদিকে সরাসরি ধাক্কা মারে। দুমড়ে-মুচড়ে যায় সেই গাড়ির ডানপাশ। সংঘর্ষ এতটাই তীব্র ছিল যে, গাড়ির একপাশে ধাক্কা লাগা সত্ত্বেও ফেটে যায় নিরাপত্তার স্বার্থে থাকা এয়ারব্যাগ। ভেঙে যায় গাড়ির চালকের আসনের পাশের দরজাও। গুরুতর জখম হন গোপাল। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সংঘর্ষের অভিঘাতে প্রায় ১৫-২০ ফুট দূরে ছিটকে যায় ছোট গাড়িটি। আচমকা দুর্ঘটনায় নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে আরও একটি গাড়ি তাতে ধাক্কা মারে।
দুর্ঘটনার জেরে মা ফ্লাইওভারে ব্যাপক যানজট তৈরি হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় তপসিয়া থানা, ইস্ট ট্রাফিক গার্ড ও তিলজলা ট্রাফিক গার্ডের পুলিশ। ছোট গাড়িটি থেকে নিরাপদে চালক সহ গোটা পরিবারকে উদ্ধার করা হয়। রীতিমত হকচকিয়ে যায় শিশুটি। তাঁকে জল খাইয়ে আশ্বস্ত করে পুলিশ ও অন্যান্য যাত্রীরা। ওই গাড়ির চালকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় দ্রুত কর্মা অ্যাম্বুলেন্সে চাপিয়ে তাঁকে এসএসকেএমের ট্রমা কেয়ার সেন্টারে পাঠানো হয়। তাঁকে রেড জোনে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে, শিশু সহ দম্পতিকে বাইপাসের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অনির্বাণের শরীরের একাধিক জায়গায় গুরুতর চোট লেগেছে। শিশু ও তাঁর মায়ের আঘাত আংশিক। কিন্তু, তাঁরা মারাত্মকভাবে ট্রমায় রয়েছে।
এদিকে, ঘাতক গাড়ির চালকও জখম হন। হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ‘থার’ চালককে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপরেই চালককে গ্রেপ্তার করে তপসিয়া থানার পুলিশ। প্রাথমিকভাবে পুলিশের সন্দেহ মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন তিনি। ট্রাফিক আইনের একাধিক ধারায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছেন তদন্তকারীরা। পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতের নাম রাজ সিং। এদিন তাঁকে শিয়ালদহ আদালতে পেশ করা হয়। তিনদিনের পুলিশ হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।



