


সৌরাংশু দেবনাথ, কলকাতা: দুপুর দুটো থেকে প্র্যাকটিস। ঘড়িতে পৌনে তিনটে, কিন্তু বছর পনেরোর গোলগাল কিশোরের দেখা নেই। অথচ, ঠা ঠা রোদে দিব্যি নেট চলছে রাজস্থান রয়্যালসের। তাহলে কি ইডেনে আসেইনি সে? ক্যাপ্টেন রিয়ান পরাগ, পেসার জোফ্রা আর্চার, পাওয়ার হিটার শিমরন হেটমায়ারদের মতো হোটেলে বিশ্রাম নেওয়াকেই শ্রেয় মনে করেছে? জল্পনার সঙ্গে ক্রমশ মিশছিল আক্ষেপ। ক্যামেরাম্যানদের বিরক্তি ততক্ষণে ঊর্ধ্বমুখী। এমন সময়েই হেলতে দুলতে ড্রেসিং-রুম থেকে তার আবির্ভাব। মুহূর্তে সবার যাবতীয় আকর্ষণের কেন্দ্রে বৈভব সূর্যবংশী। ভারতীয় ক্রিকেটের নয়া বিস্ময় প্রতিভা!
কোনো সন্দেহ নেই, রবিবার রোদ উপেক্ষা করে ইডেনের গ্যালারি ভর্তি থাকবে বিহারের সমস্তিপুরে জন্মানো কিশোরের ব্যাটে ঝড়ের আশাতেই। হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতোই সম্মোহনী ক্ষমতার অধিকারী দেখাচ্ছে তাকে। এখনও গোঁফ না ওঠা দশম শ্রেণির ছাত্র মাঠে থাকলে বিরাট কোহলির দিকেও ক্যামেরার ফোকাস কমছে। শনিবারের বারবেলায় ইডেনে যেমন প্রধান পিচের পাশে প্র্যাকটিসের উইকেটে বৈভব ব্যাট হাতে দাঁড়ানোর আগেই চিত্রসাংবাদিকরা সুবিধামতো পজিশন নিয়ে নিলেন। যাতে নেট বাধা না হয়ে ওঠে ছবিতে। বছর সাত-আটের ছেলেকে নিয়ে বৈভবের টানেই ভরদুপুরে ক্লাবহাউসের লোয়ার টিয়ারে হাজির এক দম্পতি। বিধ্বংসী মেজাজে থাকা বাঁ-হাতি ওপেনারের ব্যাটে লেগে বলগুলো উড়ে যাচ্ছিল এদিকে-ওদিকে। আর হাততালি দিয়ে উঠছিল ছেলেটা। বাবা-মায়ের মুখেও তখন তৃপ্তির হাসি। যাক, বৈভবের ব্যাট তো দেখা হল!
তার আগে অবশ্য চলেছে বেশ খানিকক্ষণের দৌড়াদৌড়ি। জায়ান্ট স্ক্রিনের সামনে দু’দিকে স্টাম্প পুঁতে স্টপওয়াচ হাতে দৌড়তে বলা হল। বাধ্য ছাত্রের মতো ঘামে জবজবে জার্সি পরেই তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করল রাজস্থান রয়্যালসের তরুণ ক্রিকেটার। জ্বালা ধরানো গরমকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়েই। সফল হওয়ার খিদে অবশ্য ছোট থেকেই সঙ্গী। ভোর চারটায় পাটনায় প্র্যাক্টিস করার জন্য বাবার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ত বছর আটেকের বৈভব। আরও আগে ঘুম থেকে উঠে দু’জনের জন্য জলখাবার বানিয়ে দিতেন মা। শুধু প্রতিভা নয়, কঠোর পরিশ্রমও রয়েছে ক্রিকেটবিশ্বকে চমকে দেওয়া পারফরম্যান্সের নেপথ্যে। বুমরাহই হোক বা ভুবনেশ্বর, হ্যাজলউড— বাঁ-হাতির দাপটে অসহায় দেখিয়েছে নামজাদা বোলারদেরও। তবে শেষ ম্যাচে পয়লা বলেই ফিরতে হয়েছে বৈভকে। সেই যন্ত্রণা সুদে-আসলে মিটিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে সে হাজির গঙ্গাপাড়ের নন্দনকাননে। তিনদিন ধরে নেটে অক্লান্ত দেখানো বৈভব প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এবারের আসরে অন্তত ছয়শো রান করার চ্যালেঞ্জ রেখেছে নিজের সামনে। পাঁচ ইনিংসে হয়েও গিয়েছে দুশো।
বৈভবকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত রাজস্থানের কোচ কুমার সাঙ্গাকারা। শ্রীলঙ্কান কিংবদন্তির কথায়, ‘ওকে বলেছি, সাফল্যের মত ব্যর্থতাকেও উপভোগ করতে। ৩৫ বলে সেঞ্চুরি, ১৫ বলে পঞ্চাশ বা প্রথম বলেই আউট— যাই ঘটুক না কেন, খোলা মনে ব্যাট করতে হবে। সেটা যেন কখনো হারিয়ে না ফেলে। ব্যর্থতা ক্রিকেটেরই অঙ্গ। ও দুর্দান্ত প্রতিভা। পাশাপাশি প্রচণ্ড পরিশ্রমীও। কী হতে পারে, তা অনুমান করে সেইমতো নিজেকে তৈরি রাখার ক্ষমতা রয়েছে। রাজস্থান দলে ওর থাকা, আমার কাছে বড় স্বস্তি।’ ইডেনে গত ডিসেম্বরে সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিল বৈভব। মহারাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ৬১ বলে করেছিল অপরাজিত ১০৮। শোনা যাচ্ছে, ইডেনে রবিবার হাজির থাকবেন বৈভবের বাবা-মা। কে জানে, এমন প্রেরণা আরো এক শতরানের জন্ম দেবে কিনা!