নয়াদিল্লি: আইন মেনে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে ‘নিশ্চয়তা’ দেয় আমাদের সংবিধান। সেই অধিকারকে পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখতে হবে। শুধুমাত্র বিক্ষোভ প্রদর্শন হচ্ছে বলেই লাঠি চালানো যায় না। প্রতিবাদী পড়ুয়াদের উপর পুলিশি বর্বরতা নিয়ে সোমবার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তোপ দাগল সুপ্রিম কোর্ট। পুলিশের ‘মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগে’র ইস্যুতে শীর্ষ আদালতের আরও পর্যবেক্ষণ, ‘ছাত্রছাত্রী হোক বা পুলিশকর্মী, জখম হওয়ার সব ঘটনাই উদ্বেগের। সকলের প্রাণ সমান গুরুত্বপূর্ণ।’ বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, সে বিষয়ে সর্বভারতীয় স্তরে গাইডলাইন আনার বিষয়টিও বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছে দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ। ককরোচদের আন্দোলন শেষ হয়ে গেলেও দিল্লি, বিহার, অসম, পশ্চিমবঙ্গে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর বন্ধ হয়নি। ধৃতদের মুক্তির দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে। এদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ইস্যুতে আক্রমণ শানিয়েছেন রাহুল গান্ধী। লিখেছেন, ‘মোদিজি, আপনার প্রতিশ্রুতি কোথায় গেল? বলেছিলেন, ছাত্রদের বিরুদ্ধে এফআইআর হবে না। তাদের মুক্তি দেওয়া হবে। কোথায়? বদলে প্রাণঘাতী হামলা, আর নির্মম নির্যাতন চালানো হচ্ছে। আসলে এই সরকার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়। ছাত্রদের কণ্ঠরোধ করতে সব ধরনের কৌশল অবলম্বন করে। মোদিজি ক্ষমা চান।’
বিহারে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে একে-৪৭ রাইফেল ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। সেই ঘটনা তুলে ধরে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন আরজেডি নেতা মনোজ ঝা। তাঁর আবেদনটি এদিন উল্লেখ করা হয় প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে। শীর্ষ আদালত সেটিকে গত ২০ জুলাই দিল্লিতে প্রতিবাদী পড়ুয়াদের ‘সংসদ চলো’ মিছিলে পুলিশের বাড়াবাড়ির অভিযোগে তদন্তের দাবিতে হওয়া অন্যান্য আবেদনগুলির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। এদিন প্রধান বিচারপতি এও বলেছেন, পুলিশের বাড়াবাড়ির তদন্ত অবশ্যই করতে হবে। বিক্ষোভে জখম পুলিশদের কেন পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়নি, তার ব্যাখ্যাও সরকারকে দিতে হবে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনাকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চে মঙ্গলবার বিষয়টির শুনানি হবে। জখম পুলিশকর্মীদের পরিবারের তরফে পেশ করা পৃথক একটি আবেদনও শুনতে রাজি হয়েছে শীর্ষ আদালত।
আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীর করা একটি আরজি সহ অন্যান্য আবেদনগুলিতে বিক্ষোভের সময় পুলিশের আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিস্তারিত নির্দেশিকা চাওয়া হয়েছে। ওই আবেদনগুলিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য সাদা পোশাকের পুলিশ কর্মীদের উপর নিষেধাজ্ঞা, বিএনএসএস-এর ১৬৩ ধারার (পূর্বে সিআরপিসি-র ১৪৪ ধারা) অধীনে জারি করা নিষেধাজ্ঞার জন্য কঠোর নিয়মকানুন এবং দিল্লিতে ২০ জুলাই পুলিশের পদক্ষেপের স্বাধীন তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। গোটা ঘটনার সঙ্গে তুলনা টানা হয়েছে ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের। অভিযোগ, বেকারত্ব, ব্যয়বহুল শিক্ষা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবির মতো বিষয় নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন চলছিল। কিন্তু প্রতিবাদকারীরা লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, পেলেট গানের শিকার হয়েছেন। ছাত্রীদের উপর অত্যাচারও চালানো হয়েছিল।
আবেদনগুলিতে সংবিধানের ১৪, ১৯ ও ২১ অনুচ্ছেদের অধীনে মৌলিক অধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রয়েছে বিধিনিষেধমূলক নির্দেশিকা জারি ও বিএনএস-এর ১৫২ ধারার সমালোচনাও। মামলাকারীদের দাবি, বাকস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ভিন্নমতের উপর ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা চলছে। কেন্দ্রের পক্ষে আদালতে উপস্থিত সলিসিটার জেনারেল তুষার মেহতা অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন, সরকার আদালতকে সবরকম সহায়তা করবে।