সুমেরু হল পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের বিন্দু। যা ৯০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত। অন্যভাবে বলা যেতে পারে, দক্ষিণ মেরুর ঠিক বিপরীত প্রান্তে এর অবস্থান। প্রায় সারা বছরই বরফ থাকে আর্কটিক ওশন বা সুমেরু মহাসাগরে। এই বরফ সাম্রাজ্যের ঠিক মাঝখানে উত্তর মেরুর অবস্থান। সে কারণেই দক্ষিণ মেরুর মতো উত্তর মেরুতে কোনও স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। শুধু তাই নয় উত্তর মেরু বিন্দু খুঁজে বের করাও কঠিন। কারণ মেরু বিন্দু অস্থায়ী ও ভাসমান বরফের ওপর সর্বদা ধাবমান একটি বিন্দু। বরফ খণ্ডের ওপর এমন কোনও বিন্দু নেই, যা দিয়ে বোঝা যেতে পারে যে সেটাই উত্তর মেরু। আর বিন্দুটি ধাবমান হওয়ায় কেউ এখানে খুঁটি পুঁতে রাখেনি। এ বিন্দুটিকে জিপিএস দিয়ে খুঁজে বের করে নেওয়ার নিয়ম। সবথেকে অসুবিধে হল জিপিএস দিয়ে হয়তো বের করা হল এটাই উত্তর মেরু ( ৯০ ডিগ্রি উত্তর এবং পূর্ব-পশ্চিম রিডিং শূন্য), বরফ চলমান হওয়ার ফলে কয়েক মিনিটেই উত্তর মেরু আবার হারিয়ে যায়। আবার মেরুবিন্দুর সন্ধানে খোঁজাখুঁজি শুরু করতে হয়। ভাসমান বরফের ওপর হেঁটে বেড়িয়ে জিপিএস দিয়ে উত্তর মেরু খুঁজে বের করতে বেশির ভাগ সময় তিন-চার দিন সময় লেগে যায়।
উত্তর মেরুতে একটানা চলে ছ’মাস দিন ও ছ’মাস রাতের রাজত্ব। সেখানে স্থায়ী কোনও লোকবসতি নেই এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে এই মুহূর্তে কোনও দেশ উত্তর মেরু ও সুমেরু মহাসাগরের চারধারে ঘিরে থাকা এলাকার মালিকানা দাবি করতে পারে না। বহুকাল ধরেই উত্তর মেরু জয়ের স্বপ্ন দেখে এসেছে মানুষ এবং এর মূল উদ্দেশ্য ছিল আর্কটিক মহাসাগরের মধ্যে দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পৌঁছনোর একটি জলপথের সন্ধান লাভ করা। প্রথম এই অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন ১৭৭৩ সালে ব্রিটিশ নাবিক কনস্ট্যানটাইন ফিপস। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে তিনি ৮০ ডিগ্রি ৪৮ মিনিট অক্ষাংশ পর্যন্ত পৌঁছে শেষপর্যন্ত নতিস্বীকার করে ফিরে এসেছিলেন। এর পর চলেছে একের পর এক অভিযান, তবে প্রথম সাফল্যের মুখ দেখেছিলেন ১৯০৯ সালের ৬ এপ্রিল রবার্ট এডউইন পিয়েরি এবং তাঁর দল। পিয়েরি ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ। তাঁর জন্ম হয় ১৮৫৬ সালে পেনসিলভানিয়ার ক্রেসনে। উত্তর মেরু অভিযানের পরে তিনি ‘দ্য নর্থ পোল’ (১৯১০ সালে) এবং ‘সিক্রেটস অব পোলার ট্রাভেল’ (১৯১৭ সালে) নামে দু’টি বই লেখেন। ১৯১১ সালে তিনি রিয়ার অ্যাডমিরাল পদ থেকে অবসর নেন এবং ১৯২০ সালে মারা যান।
উত্তর মেরু জয় করতে চেয়েছেন অনেকেই এবং উত্তর মেরু জয়ের দাবিদারের সংখ্যাও কম নয়। তবে বেশির ভাগ দাবির সত্যতা নিয়েই নানা প্রশ্ন এবং সংশয় আছে। এমনকী, পিয়েরির মেরু বিজয় নিয়েও আছে সংশয়। ১৯০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়ে মার্কিন অভিযাত্রী ফ্রেডরিক কুক ঘোষণা করেছিলেন, প্রায় দু’বছরের ভ্রমণ শেষে সফলভাবে তিনি উত্তর মেরু জয় করে ফিরেছেন। কুকের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আরও এক মার্কিন অভিযাত্রী রবার্ট পিয়েরি পাল্টা দাবি করলেন, ওই বছর ৬ এপ্রিল তিনি ও তাঁর সঙ্গীরাই প্রথম পা ফেলেছেন উত্তর মেরুতে। কুকের দাবিকে অগ্রাহ্য করে শেষ পর্যন্ত সবাই পিয়েরির দাবিকেই সত্য বলে মেনে নিলেও আজও তাঁদের এই উত্তর মেরু বিজয় পুরোপুরি সংশয়মুক্ত হতে পারেনি। আসল কারণ হল সে সময়ে অভিযাত্রীদের বর্ণনার অস্পষ্টতা এবং ত্রুটিমুক্ত যন্ত্রপাতির অভাব। পিয়েরির নিজের লেখা মেরু বিজয়ের বইও নাকি সে সংশয় দূর করতে পারেনি বলে জানা যায়। কে প্রথম উত্তর মেরু জয় করেন, এ প্রশ্ন যে ভবিষ্যতেও রহস্যের ধূম্রজাল হয়ে থাকবে আমাদের কাছে এ বিষয়ে কোনও
সন্দেহ নেই।