সুমন মুখোপাধ্যায়, সিউড়ি: কথায় আছে, ‘গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না!’ এই প্রচলিত প্রবাদ সিউড়ির মোরব্বার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। শহরের ঐতিহ্য মোরব্বার কদর কমছে খোদ শহরেই। উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা। মিষ্টি ব্যবসায়ীদের একাংশের আশঙ্কা, ঘরে ঘরে সুগার রোগীদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। সেকারণেও মিষ্টিজাতীয় এই মোরব্বা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন শহরের বাসিন্দারা।
মিষ্টি ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, শুরুতে শুধুই চালকুমড়ার মোরব্বা তৈরি হতো। এরপর একে একে শতমূল, বেল ও পর আরোও বেশকিছু জিনিস যোগ হয়। শহরের বাসিন্দাদের দাবি, কড়া চিনির রসে চোবানো থাকে এই মোরব্বা। কিন্তু অধিকাংশ বাড়িতেই এখন সুগারের রোগী থাকায় অতিরিক্ত মিষ্টির কারণে মোরব্বা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু জেলা সদর সিউড়ি এই মোরব্বার জন্যই বিখ্যাত। কিন্তু কালের নিয়মে গুটিকয়েক মিষ্টির দোকান ছাড়া সেই মোরব্বা আর পাওয়া যায় না। মিষ্টি ব্যবসায়ীদের দাবি, শহরবাসীর অধিকাংশই অতিরিক্ত মিষ্টির জন্য মোরব্বা পছন্দ করেন না। সেকারণে বাধ্য হয়ে মোরব্বা তৈরি করি না। কয়েকটি দোকানেই মাত্র মোরব্বা পাওয়া যায়।
বিভিন্ন নথি ও মিষ্টি ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, মোরব্বার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনগরের রাজাদের কথা। তাঁদের এক পূর্বপুরুষ আগ্রায় গিয়ে পেঁপের বা পিঠা মোরব্বার প্রেমে পড়েন। তারপর থেকে রাজনগরের ও তাঁতিপাড়া বিভিন্ন ময়রা রাজার অনুরোধে এই মিষ্টি তৈরি করতে শুরু করেন। রাজ্যের অন্যান্য জেলা যেমন শক্তিগড়ের ল্যাংচা, বর্ধমানের সীতাভোগ-মিহিদানা, গুপ্তিপাড়ার কাঁচাগোল্লা, বাঁকুড়ার মেচা বিখ্যাত। তেমনই জেলা সদর সিউড়ি বিখ্যাত হয়ে ওঠে মোরব্বার জন্য। কিন্তু অতিরিক্ত মিষ্টির কারণে বাধ্য হয়ে শহরবাসী মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
মিষ্টি ব্যবসায়ীরা জানান, প্রথমে বেল, পেঁপে, শতমূলী, হরিতকি, চালকুমড়ো ইত্যাদি মোরব্বা তৈরি করা হতো। পরে সব্জি অর্থাৎ পটল, গাজর সহ অন্যান্য সব্জি দিয়ে মোরব্বা তৈরি হতো। কালের বিবর্তনে এইসমস্ত মোরব্বার পাশাপাশি জায়গা করে নেয় আম, আনারস, কামরাঙা, চেরির মোরব্বাও। মূলত কাঁচা ফল থেকেই মোরব্বা তৈরি করা হয়।
সিউড়ির নামী মোরব্বা বিক্রেতা সুশান্ত সাহা বলেন, মোরব্বার ব্যবসা কিছুটা সিজিনের ব্যবসার মতো হয়ে গিয়েছে। রথ বা অন্যান্য উৎসবে নয়, একমাত্র পৌষমেলা ও পাথরচাপুড়ির মেলার সময় মোরব্বা বিক্রি ভালো হয়। এছাড়া বহু মানুষ এখন স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে গিয়েছেন। শহরের লোকজন খুব একটা পছন্দ না করলেও বাড়িতে বাইরে থেকে কোন আত্মীয় এলে এখনও মোরব্বা নিয়ে যান। মিষ্টি বেশি থাকায় কারণেও বিক্রি কিছুটা কমেছে।
শহরের বাসিন্দা সমর্পণ ভট্টাচার্য বলেন, এখন কমবয়সি ছেলেমেয়েরা ফাস্টফুডের দিকে বেশি ঝুঁকছে। মিষ্টি খুব একটা পছন্দ করে না। এছাড়াও প্রায় প্রতিটা বাড়িতে সুগারের রোগী রয়েছে। সে কারণে মিষ্টি খুব একটা বেশি ঢোকে না বলতে গেলেই চলে। মোরব্বায় এত পরিমাণ মিষ্টি থাকে যে শুধু কম বয়সি ছেলেমেয়ে বলে নয়, আমরাও খুব একটা বেশি পছন্দ করি না। এছাড়া প্রচারের অভাবে মোরব্বা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। গুটিকয়েক দোকানে মোরব্বা বিক্রি হয়। অথচ জেলা সদর মোরব্বার জন্যই বিখ্যাত। মিষ্টি কমিয়ে মোরব্বা তৈরি করা যায় কিনা সেব্যাপারে ভাবনাচিন্তা করা দরকার। -নিজস্ব চিত্র