লোকনাথ চক্রবর্তী: তিনি নিখিল রসামৃতসিন্ধু। সাক্ষাৎ মন্মথ মন্মথ। গোপীদের প্রিয়তম। নিত্য তাঁর লীলা। তাঁর গুণ মান কেউ অতিক্রম করতে পারেনি, পারবেও না। এই চরিত্র মাধুরী ও মহিমা সাধারণের নাগালের বাইরে। তবু কবি মনীষী সকলেরই মেধায় হৃদয়ে তাঁর ছোঁয়া লেগেছে বারবার। এখনও কত প্রেমিক ও রসিকজন রাগমার্গে তাঁকে ছুঁতে চান। কতজন আবার আস্বাদন করেছেন ও করেন ওই রূপমাধুরী। অনাহত তাঁর বেণুরবে অরবে তলিয়ে যান কত জ্ঞানীগুণী মুনি জন। অতি অভাজনও সেই সত্রে বঞ্চিত থাকে না। দিব্য সেই অঙ্গগন্ধ আঘ্রাণ করেন লীলাশুকের মতো! হয়তো এই জন্যই সনাতন গোস্বামীকে শ্রীমন মহাপ্রভু বলেছিলেন,
Advertisement
‘কৃষ্ণের যতেক খেলা সর্বোত্তম নরলীলা,
নরবপু তাহার স্বরূপ।’
প্রচলিত বিশ্বাস হল, ‘রাম নরচন্দ্রমা কৃষ্ণ পুরুষোত্তম।’ পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ ঐশ্বর্য ও মাধুর্যের প্রকাশে ভক্তের হৃদয়ে প্রকাশিত হন। আমরা লক্ষ করি এ যাবৎ কৃষ্ণচরিত চর্চা বিস্তর হয়েছে, যাঁরাই মেধাকে শ্রীকৃষ্ণচরণে কোনও সূত্রে নিবেদন করেছেন, তাঁরাই বুঝেছেন যে, কুরুক্ষেত্র, মথুরা ও দ্বারকালীলায় রয়েছে ঐশ্বর্য আর ব্রজলীলা মাধুর্যে মণ্ডিত হয়ে আছে। আরও খেয়াল করলে বোঝা যায়, মথুরা দ্বারকাতেও মাধুর্য আছে, তবে তা ঐশ্বর্য কবলিত আর ব্রজে ঐশ্বর্য মাধুর্যে অভিভূত। এই কৃষ্ণ ভক্তির বশীভূত। সেই ভক্তির একটি হল প্রেমভক্তি। ব্রজগোপীরা প্রেমভক্তির পরাকাষ্ঠা। সেই প্রেমে মনে থাকে না আমি কে? ধর্মের কোনও তত্ত্ব, তথ্য। এই অকৈতব প্রেমের পথেই গোপীরা তাঁকে পেয়েছিলেন আপন করে, তারপর তাঁদের আপন পর সব হারিয়ে গিয়েছিল! সাধন, ভাব, প্রেম, শরণাগতি— ভক্তির এই চতুর্মুখের সঙ্গে বৃহদারণ্যক উপনিষদের অভ্যারোহ তত্ত্বের বেশ মিল আছে, এই সূত্রেই আসে কান্তাভাবের কথা। কান্তাভাবের জমাট চেহারা হল রাসলীলা। এখন আমরা এই প্রসঙ্গে প্রবেশ করব না। তবে মনে রাখব যে, ভক্তিপথে রতির কদর আছে। রতির পাঁচটি পরিচিত ধারা আছে— ১ শান্ত, ২ দাস্য, ৩ সখ্য, ৪ বাৎসল্য, ৫ মধুর। এর মধ্যে মধুরের মহিমা সবথেকে বেশি। তাতে আবার স্বকীয়া পরকীয়ার বৈচিত্র্য আছে। বৈষ্ণবরা পরকীয়া রতির প্রশংসা করেছেন— ‘পরকীয়াভাবে অতি রসের উল্লাস।’ কারণ এই ভূমিই কান্তাপ্রেমের পরাকাষ্ঠা। ব্রজের রাখাল রাজার প্রেমে যেমন গোপিনীরা পূর্ণ ছিলেন তেমনই প্রাগজ্যোতিষপুরে বন্দিনীদেরও ছিল নিখাদ কৃষ্ণ প্রেম! সেই সূত্রেই তাঁরা শ্রীকৃষ্ণকে স্বামীরূপে পেয়েছিলেন। গোপিনীদের সঙ্গে বন্দিনীদের প্রেমে যে বৈচিত্র্য ছিল তা হল— ব্রজাঙ্গনারা বালিকা ও রাসমণ্ডলে নিত্যলীলার অঙ্গভূতা আর বন্দিণীরা হলেন যুবতী, তদ্গতচিত্তা ও একনিষ্ঠা পরায়না। শুদ্ধা। মহিষী-মর্যাদা সম্পন্না। কৃষ্ণলীলায় রুক্মিণী, সত্যভামা, জাম্ববতী প্রমুখ মুখ্য মহিষীদের বাইরে এঁদের প্রকাশ ও অবস্থান প্রসঙ্গটি এখন আমরা যথাশাস্ত্র দেখার চেষ্টা করব।
নরকাসুরের বৃত্তি ও প্রবৃত্তি
শ্রীকৃষ্ণ তখন দ্বারকার রাজা আর প্রাগজ্যোতিষপুরের রাজা ছিলেন নরকাসুর। এঁর মা হলেন ভূমি, তাই তাঁর আর একটা নাম হল ভৌমাসুর। দেবতারা এঁকে ভয় করতেন আর ইন্দ্রের সঙ্গে তাঁর ছিল চরম শত্রুতা। এই নরকাসুর ‘মূর্তিলিঙ্গে’ থাকতেন। মূর্তিলিঙ্গ মানে শিবলিঙ্গের মতো দেখতে একটা বাড়ি। এই বাড়ি পৃথিবীতেই ছিল, নরকাসুর নিজের শত্রুদের থেকে বাঁচার জন্য এই দুর্ভেদ্য বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। সমস্ত দেবতাকে সবসময় বাধা দেওয়াই এই অসুরের কাজ ছিল। একদিন তাঁর চেতনায় দখিনা বাতাসের ছোঁয়া লাগল। হাতি সেজে গিয়েছিলেন প্রজাপতি ত্বষ্টার ঘরে, তারপর তাঁদের বছর চোদ্দোর মেয়ে কশেরুকে দেখে আর চোখ ফেরাতে পারলেন না। মন বলল, আহা কী রূপ! কী শোভা! আবার নিজের কাছেই হেরে গেলেন নরকাসুর। দু’হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরলেন সেই রূপলাবণ্যের মূর্তিকে। জোর করেই সে ধরা হয়েছিল। এমনিতে নরকাসুরের শোক আর ভয় বলে কিছু ছিল না, লজ্জাও ছিল না কোনও কালে। এখন এমন ঘোর লাগল যে, ভালোলাগার সামনে তিনিই নতজানু হলেন। এরপর কত প্রতিজ্ঞা, কত কথা দেওয়া। কশেরুর হাত ধরে নরকাসুর বললেন, দেবী। দেবতা ও মানুষের কাছে যত ধনরত্ন আছে, যত ধন বুকে ধরে পৃথিবী রেখেছে সব আমি তোমায় চুরি করে কেড়েকুড়ে এনে দেব। সমুদ্রের তলায় থাকা যত রত্ন সব সেঁচে ফেলে এনে দেব তোমাকেই। আজ থেকেই যত দৈত্য দানব আছে সবাই তোমার জন্য সবকিছু চুরি করে, লুট করে আনতে শুরু করবে!
নরকাসুর বা ভৌমাসুর যে নামেই বলি তাঁর কিন্তু কিছু মূল্যবোধ ছিল। কশেরুকে কথা দিয়েছেন দেবেন বলে তাই তিনি সৃষ্টি লুটে যা ভালো ভালো রত্ন, সম্পদ, কাপড়-চোপড় এনেছিলেন ও আনিয়েছিলেন সেগুলো আর নিজে ছুঁয়ে দেখেননি কোনও দিন। অধিকার আরোপ করেননি। ভোগও করেননি। তাঁর এই সংগ্রহের মধ্যে নানা জায়গা থেকে গায়ের জোরে চুরি করে আনা অনেক মেয়ে ছিল। তাদের অনেকেই দেবতাদের কন্যা, অনেকে মানুষের, আবার অনেকে ছিলেন গন্ধর্বকন্যা। সাতজন প্রধানা অপ্সরাকেও ধরে এনে নিজের ঘরে আটকে রেখে দিয়েছিলেন। ঝোঁকের মাথায় এভাবে তিনি ষোলো হাজার একশো সুন্দরী মেয়েকে তাঁদের বাড়ি থেকে হরণ করে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু অসুর রাজা ভুলেও এঁদের কাছে কখনও যাননি। ভালো লাগছে বলেননি। তুমি সুন্দর তাও বলেননি। বাড়িতে বন্দি করেছেন, চেতনায় সংগ্রহ করেননি, স্পর্শ করেননি, ঠাঁইও দেননি।
হরিবংশকার বলেছেন, এই সুন্দরী মেয়েরা সবাই সতীত্বের পথে ব্রত ও নিয়ম পালনে যত্নপর হয়ে অসুরের ঘরে থেকেছেন একবেণী ধারণ করে। ‘চতুর্দশ সহস্রাণি একবিংশচ্ছতানি চ। একবেণীধরাঃ সর্বাঃ সতীমার্গমনুব্রতাঃ।’ ভৌমাসুর প্রথমে নিজের বাড়িতে এঁদের ধরে আনলেও শেষ পর্যন্ত মণিপর্বতের ওপরে এই সুন্দরী ব্রতধারী নারীদের বসবাসের জন্য একটি নগর তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন। যেখানে এই নগর স্থাপন করলেন সেই জায়গাকে তখন লোকে অলকা বলে জানত। অলকা জনপদ মুরু নামের এক দৈত্যের দখল করা রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। এই মুর বা মুরু নামে দৈত্যের দশটি ছেলে এবং সেখানকার যাঁরা প্রধান রাক্ষস ছিলেন তাঁরা প্রাগজ্যোতিষপুরের রাজা ভৌমের অনুগামী ছিলেন। তাই তাঁরা ভৌমাসুরকে যেমন ধন জন সম্পদ নিষ্ঠা দিয়ে রক্ষা করতেন তেমনই এই কুমারীদেরও রক্ষা করতেন। এই কাজটি তাঁদের উপাসনা ছিল।
নরকাসুরের অনেক গুণ ছিল, তিনি কথা দিলে কথা রাখতেন। নিজের চেতনা ও ইন্দ্রিয়ের প্রতিও একটা নিয়ন্ত্রণ ছিল। ভালো তপস্বী ছিলেন। তবে সব রিপু জয় করতে পারেননি। তাই এই মহাসুর নরক তপস্যার শেষে তাঁর উপাস্যের বর লাভ করে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন। পুরাকালে সব অসুর একসঙ্গে মিলে যত পাপ করতে পারেননি, একা নরক সেই পরিমাণ পাপ করেছিলেন। ক্ষমতার দম্ভ তাঁকে ক্রমশ তাঁর ঠিকানায় ঠেলে নিয়ে গিয়েছিল। চেতনার চোখে তখন তাঁর মোহাচ্ছন্নতা। তাঁর পাপের ঘনঘটার সূত্রেই পৃথিবী ভারী হয়ে উঠেছিল। চেতনারূপিণী প্রকৃতি এলোমেলো হয়ে গেলে জগতের প্রকৃতিও ঘেঁটে যায়। পৃথিবী হারায় তার বাসযোগ্যতা। মানুষ হারায় তার মান সম্ভ্রম। বুদ্ধির বিভ্রমে তাই নরক দেবমাতা অদিতিকে তিরস্কার করেছিলেন, কুণ্ডল কেড়ে নিয়েছিলেন। তবে অসুরেরও সে পাপ সয়নি।
পুরাণ বলেছেন, ভৌমাসুরের মা হলেন পৃথিবী। বসুন্ধরা। প্রাগজ্যোতিষপুর তাঁর অধিকারে ছিল। সেই সূত্রে যুদ্ধোন্মত্ত চারজন তাঁর দ্বারপাল ছিল, ১ হয়গ্রিব, ২ নিসুন্দ, ৩ বীর পঞ্চনদ আর ৪ সহস্র পুত্রসহ মহাসুর মুরু। মুরুও নিজের উপাস্যের বর লাভ করেছিলেন।
দেখতে দেখতে নরকাসুরের এমন বাড়বাড়ন্ত হয়েছিল যে, তিনি শুধু এখানে নয়, পরলোকের পথেও নানা উৎপাত করতে লাগলেন। দেবযান মার্গ জুড়ে ভয়ঙ্কর সব রাক্ষসদের সঙ্গে নিয়ে এমনভাবে পথ আগলে নিজেকে ছড়িয়ে দিতেন যে, দেবযান মার্গে যাদের গতি লেগেছে এমন পুণ্যাত্মারাও ঊর্ধ্বলোকে যাবার সময় সগণ নরকাসুরের আচরণে সন্ত্রস্ত হতেন।
তখন একদিকে যেমন অসুরের অত্যাচারে সৃষ্টি রসাতলে যাবার জোগাড় হয়েছে তেমনই আবার উল্টোদিকে ধুলার ধরণীকে পবিত্র করে এখানে বিরাজ করছেন শ্রীকৃষ্ণ। দেবতাদের আকূল প্রার্থনায় তাঁর মহাবির্ভাব। তাঁর তেজে প্রোজ্জ্বল বিশ্ব পরিমণ্ডল। ইন্দ্রের ঠিকানা অমরাবতীপুরী, তার থেকে অনেক রমণীয় ছিল রাজাধিরাজ শ্রীকৃষ্ণের রাজধানী দ্বারকা। এই দ্বারকাপুরীর চারদিকে সমুদ্রের বেড়া। পঞ্চপর্বতে সুশোভিত এই নগরীতেই ছিল কৃষ্ণের সভাগৃহ। নাম ছিল দাশার্হী। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে তার আয়তন ছিল এক যোজন। সেখানে বৃষ্ণ ও অন্ধক বংশের সকলকে নিয়ে কৃষ্ণ বসেন। লোকজীবন রক্ষার জন্য রাজকার্য সম্পন্ন করেন।
কৃষ্ণের যুদ্ধযাত্রা
সেদিন যদুবংশের সবাইকে নিয়ে কৃষ্ণ সভায় বসে আছেন হঠাৎ সেখানে দিব্য সুগন্ধপূর্ণ বাতাস বইতে লাগল! দিব্য পুষ্পবৃষ্টি হল ঘর জুড়ে। তারপর মুহূর্তের মধ্যে আকাশে কিলকিলা শব্দ হতে লাগল। তারপর দেখা গেল তেজোরাশি পরিবৃত এক দিব্য আকৃতি প্রকটিত হয়ে আস্তে আস্তে পৃথিবীতে নেমে এলেন। সেই আলোর মধ্যে সাদা হাতির পিঠে বসা ইন্দ্রকে দেখতে পাওয়া গেল। উগ্রসেন বৃষ্ণি ও অন্ধক বংশের সকলকে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ইন্দ্রকে আপ্যায়নের জন্য এগিয়ে এলেন। হাতি থেকে নেমে ইন্দ্র প্রথমে শ্রীকৃষ্ণকে আলিঙ্গন করলেন। তারপর বলরাম ও উগ্রসেনকেও জড়িয়ে ধরলেন। একে একে বয়স অনুসারে অন্য বৃষ্ণিবীরদেরও আলিঙ্গন দিলেন। বলরাম ও শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে পূজা করলেন। দাশার্হী সভা আলো করে ইন্দ্র আসন গ্রহণ করলেন। কৃষ্ণকে আদর করে বললেন, মধুসূদন! শত্রুনাশন। যে কাজ নিয়ে আপনার কাছে এসেছি সেটা বলি— ‘নৈর্ঋতো নরকো নাম ব্রহ্মনো বরদর্পিতঃ। আদিত্যাঃ কুণ্ডলে মোহাজ্জহার দিতিনন্দনঃ।’ ব্রহ্মার বর পেয়ে নরক নামের রাক্ষসের বড়ই গর্ব হয়েছে, সে আমাদের মায়ের কানের দুল দুটি গায়ের জোরে কেড়ে নিয়ে গেছে। প্রতিদিন দেবতা ও ঋষিদের ক্ষতি করছে, তাঁদের উত্ত্যক্ত করছে। তুমি সুযোগ বুঝে এই পুরুষকে বধ কর। ভূমিপুত্র নরকাসুরকে কেউ বধ করতে পারবে না, তুমি গরুড়ে আরোহণ করে তাড়াতাড়ি এই কাজের জন্য রওনা হও। কৃষ্ণ বললেন, বেশ তাই করব। শঙ্খ, চক্র, গদা ও খড়্গধারী কৃষ্ণ ও সত্যভামাকে সঙ্গে নিয়ে এরপর সবার চোখের সামনে গরুড় বায়ুর সাতটি স্তর পেরিয়ে অনেক ওপরে উঠে গেলেন। ঐরাবতে ইন্দ্র ও গরুড়ে অবস্থিত কৃষ্ণ আস্তে আস্তে আকাশে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ইন্দ্র স্বর্গে ফিরলেন আর শ্রীকৃষ্ণ প্রাগ্জ্যোতিষপুরে পৌঁছালেন। যাবার সময় গরুড়ের পাখায় আহত হয়ে বায়ু উল্টো দিকে বইতে লাগল। আকাশে চরে বেড়ানো মেঘকুল খুব শব্দ করে ঘুরতে লাগল।
প্রাগজ্যোতিষপুরে শ্রীকৃষ্ণ নামলেন। দরজায় কত হাতি, ঘোড়া, রথ, সৈন্য। সঙ্গে রয়েছে মুরু দৈত্যের তৈরি ছ’ হাজার পাশ, যার প্রান্তে ক্ষুর লাগানো আছে। পীতবসন বনমালী শ্রীবৎসচিহ্নে অলঙ্কৃত কৃষ্ণের মাথায় রয়েছে কিরীট। সূর্য চন্দ্র ও বিদ্যুতের মতো প্রকাশিত হয়ে তিনি ধনুকে টঙ্কার ধ্বনি করলেন। মুর ছিল বিচক্ষণ। সে টের পেল বিষ্ণু এসেছেন। তার বেজায় রাগ হল। সময়ও শেষের মতো চোখ লাল করে মুর শক্তি নিয়ে ছুটে এলে কৃষ্ণ তার গতির ব্যবস্থা করলেন। এরপর পথ আটকে দাঁড়াল নিসুন্দ। কত অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার হল। মায়া যুদ্ধও হল কিন্তু মসৃণভাবে নিসুন্দ নিধন হয়ে গেল। সামনে এল হয়গ্রীব। তার সঙ্গেও কৃষ্ণের বেশ বড়সড় যুদ্ধ হল, শেষ পর্যন্ত আট লক্ষ সৈন্য সহ হয়গ্রীব বধ করে নরকাসুরের রাজত্বে কৃষ্ণ তাঁর পাঞ্চজন্য শঙ্খ বাজিয়ে দিকে দিকে ছুটে বেড়াতে লাগলেন। নিজের রাজ্যের এই পরিস্থিতি নরকাসুরের কাছে অসহ্য হয়ে উঠল, তিনি যুদ্ধে নামলেন এবং অনেক লড়াই করে শেষ পর্যন্ত ধরাশায়ী হলেন। মৃত্যুর পর রণাঙ্গনে পড়ে থাকা তাঁর শবের উপমা দিয়ে ব্যাস বলেছেন, ‘বজ্রপ্রহার নির্ভিন্নং যথা গৈরিক পর্বতম্।’ বজ্রাঘাতে বিদীর্ণ গৈরিক পর্বতের মতো পড়ে থাকা নিজের ছেলে নরককে দেখে মূর্তিমতী ভূদেবী অদিতির দুল দুটি নিয়ে গোবিন্দের সেবায় উপস্থিত হয়ে বললেন, গোবিন্দ! আপনিই আমাকে এই সন্তান দিয়েছিলেন আজ নিজেই তাকে ভূপাতিত করেছেন। ছোট ছেলে খেলনা নিয়ে যেমন খেলে আপনি তেমনই যেমন খুশি তেমনই খেলা করেন। এই নিন সেই দুই কুণ্ডল আর নরকাসুরের সন্তানকে পালন করুন। হে শরণাগত জনগণের দুঃখনাশন! আপনার ভয়ে ভৌমপুত্র ভগদত্ত নিতান্তই কাতর হয়েছে। শুধু নরকাসুরের সন্তান বলে নানা অপরাধে অপরাধী ভেবে একে উপেক্ষা করবেন না। নিখিল কল্মষনাশন আপনার করকমল একবার এর মাথায় রাখুন। এর সব দোষ চলে যাক।
সন্তানহারা মায়ের এই মৃদু অথচ তীব্র আপ্যায়নের পর শ্রীকৃষ্ণ ধীর পদে পরাক্রমশালী ভূমিপুত্র নরকাসুরের ভবন পরিদর্শন করলেন। দেখা গেল নরকাসুরের ধনাগারে অক্ষয় ধন ও নানা রত্ন সম্ভার রয়েছে। তখনকার দিনেও বিজিতের ধন বিজেতা সংগ্রহ করে নিজের রাজ্যে আনতেন মনে হয়, কারণ আমরা দেখলাম, শ্রীকৃষ্ণ ওই অসুরের ভাণ্ডার থেকে অনেক মণি, মুক্তা, প্রবাল, হীরে নিলেন, সোনার জাম্বুনদ, শাতকুম্ভ, মহামূল্য শয্যা, সিংহাসন, দণ্ড সব নিলেন। এই অসুরের সংগ্রহে এত মূল্যবান সম্পদ ছিল যা কুবেরের ছিল না। অসুরের কোষরক্ষক এই সবকিছুই কৃষ্ণকে অর্পণ করলেন। হাতি, ঘোড়া, সৈন্য, পাখি, চন্দনকাঠ, অগুরু কাঠ এমনি আরও যা কিছু ছিল সবই দেখালেন এবং সেগুলির বর্ণনা করে একটি তালিকাও সমর্পণ করলেন। কৃষ্ণ সেগুলি দেখে ও পরীক্ষা করে সবকিছু দানবদের দিয়েই দ্বারকায় পাঠালেন। তারপর সুবর্ণবর্ষণকারী বরুণের বিখ্যাত ছাতাটি গরুড়ের ওপর রাখলেন। এরপর তিনি মণিপর্বতের কাছে এলেন। হাল্কা হাওয়া বইছে, বৈদুর্যমণির মতো কত তোরণ, কত পতাকা, কত সুন্দর সুন্দর বড় বাড়ি। এখানেই অন্তঃপুরে এসে কৃষ্ণ স্থির হলেন।
ষোলো হাজার কন্যার কৃষ্ণ দর্শন ও প্রার্থনা
বিদ্যুতে গাঁথা মেঘের মতো ঝলমলে মণিপর্বত। নরকাসুরের নানা সময় নানা জায়গা থেকে হরণ করে আনা মেয়েরা সেখানেই সংরক্ষিত ছিল। শ্রীকৃষ্ণ দেবতা ও গন্ধর্বদের সোনার বরণ কান্তিমতী ও স্নেহের এই কন্যাদের দেখলেন। পর্বতের কন্দরে এঁদের লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। সবাই অত্যন্ত সুন্দরী, পৃথুলশ্রোণী। এই কুমারীরা কিন্তু নরকাসুরের দ্বারা পরাজিত হননি। কামভোগ বলে এঁদের কিছু ছিল না। মণিপর্বতে স্বর্গসুখের আয়োজনকে তাঁরা উপেক্ষা করেছেন। অনুমোদন বা গ্রহণ করেননি। একবেণী ধারণ করে থেকেছেন। কাষায় বস্ত্র পরেছেন। সব ইন্দ্রিয়কে সম্পূর্ণ সংযত করে রেখেছেন। ষোলো হাজার এই ব্রতী রমণীরা শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করে তাঁকে ঘিরে ধরলেন। ব্রত ও উপবাস করে তাঁদের সর্বাঙ্গ দুর্বল হয়ে গেছে কিন্তু সর্বান্তঃকরণে তাঁরা ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ দর্শন অভিলাষী। যদুকুল শ্রেষ্ঠ পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ সামনে এলে ষোলো হাজার কুমারী হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন। নরকাসুর, মহাসুর মুর, হয়গ্রীব ও নিসুন্দ মারা গেছে জেনে তাঁরা কৃতাঞ্জলি হয়ে কৃষ্ণের বন্দনা করলেন। কিছু বৃদ্ধ দানব এই কন্যাদের এতকাল রক্ষা করতেন, বয়সের ভারে নত সেই দানবরাও এসে কৃষ্ণের কাছে কৃতাঞ্জলি হলেন। প্রণাম করলেন। রায় রামানন্দ মহাপ্রভুকে প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন,
সচ্চিদানন্দতনু ব্রজেন্দ্রনন্দন।
সর্বৈশ্বর্য সর্বশক্তি সর্বরসপূর্ণ।।
বৃন্দাবনে অপ্রাকৃত নবীন মদন।
কামগায়ত্রী কামবীজে যাঁর উপাসন।।
স্ত্রী পুরুষ স্থাবর জঙ্গম সব কিছুই এঁর অপ্রাকৃত ভাবে এঁতে আকৃষ্ট হয়। তাঁর শৃঙ্গার ও রস হল অপ্রাকৃত। মাধুর্যে কৃষ্ণের তুলনা নেই। মহাপ্রভু শিখিয়েছেন, ‘কৃষ্ণ মাধুর্যসার, অন্য সিদ্ধি নাই তার, তেঁহো মাধুর্যের খনি।’ সাধ্যবস্তু নির্ণয় প্রসঙ্গে রামানন্দের আরও কিছু উন্মোচন হল ভক্তি পথের পাথেয়। তিনি প্রকাশ করেছিলেন, ‘কান্তাপ্রেম সর্বসাধ্যসার।’ কারণ কান্তাপ্রেমে শান্তের নিষ্ঠা, দাস্যের নিষ্ঠা ও সেবা, সখ্যের নিষ্ঠা, সেবা ও সঙ্কোচ শূন্যতা থাকে। বাৎসল্যের নিষ্ঠা, সেবা, সঙ্কোচহীনতা ও মমতার আতিশয্য থাকে। তাই শ্রীকৃষ্ণ শুধু কান্তাপ্রেমেই বশ্যতা স্বীকার করেছেন। এছাড়া মধুর রস সর্বগুণের আধার। ভাগবতে শ্রীভগবান নিজেই স্বীকার করেছেন যে, কান্তাপ্রেমের কাছে তিনি ঋণী।
অপরিসীম সৌন্দর্য ও মাধুর্যের আশ্রয় হলেও কৃষ্ণ যখন কান্তা সঙ্গে প্রকাশিত হন, তখন তিনি অধিকতর উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। কান্তাপ্রেমের আঁতুর হল ব্রজাঙ্গনাদের হৃদয়কমল। সে প্রেমের পরম প্রকাশ হলেন শ্রীরাধারানি। তবে এরপরে বিলাস-মহত্ত্ব প্রসঙ্গ আছে। বুদ্ধির দৌড় এই পর্যন্তই। তবে প্রেমবিলাস বিবর্তে প্রসিদ্ধ পংক্তি হল, ‘না সো রমণ, না হাম রমণী। দুঁহুমন মনোভব পেষল জানি।’ বিশ্বনাথ ‘বিবর্তে’র মানে বলেছেন, বিপরীত আর জীবগোস্বামী মনে করেছেন পাকা অবস্থা। মহাপ্রভু রামানন্দের মুখ আচ্ছাদন করে জানিয়েছেন, সাধ্যবস্তুর এটাই সীমা।
দ্বারকায় ফেরা ও ষোলো হাজার কন্যাকে বিবাহ করা
বৃষভতুল্য বিশাল নয়নশোভিত শ্রীকৃষ্ণকে মুখোমুখি দেখে ষোলো হাজার সুন্দরীর আর চোখে পলক পড়ে না। সকলের মন বলে উঠল ইনিই আমার স্বামী। ইনাকেই আমি স্বামীরূপে বরণ করতে চাই। ‘সর্বাসামেব সঙ্কল্পঃ পতিত্বেনাভবত্ততঃ।’ কৃষ্ণের অপরূপ রূপ দর্শনে এই রমণীদের সমস্ত ইন্দ্রিয় আনন্দসাগরে ডুবে গেল। আশিরনখ অত্যন্ত হর্ষ উপস্থিত হওয়ায় উৎফুল্ল মেয়েরা সবাই কৃষ্ণকে বললেন, আপনি আমার স্বামী হন। পুরাকালে এখানেই বায়ুদেবতা ও দেবর্ষি নারদ আমাদের যা বলেছিলেন, আজ দেখুন সেই কথাটি সত্য হল। সেদিন বায়ু ও নারদের ভবিষ্যৎ বাণী ছিল, শঙ্খ, চক্র, গদা ও খড়্গধারী যিনি সর্বব্যাপী নারায়ণ তিনি ভূমিপুত্র নরককে বধ করে তোমাদের সকলের পতি হবেন। ‘স ভৌমং নরকং হত্বা ভর্ত্তা চ ভবিতা স বঃ।’ আমরা দীর্ঘকাল সেই শত্রুদমন শ্যামসুন্দরের বিষয়ে শুনে এসেছি, আজ প্রিয়তম সেই পুরুষের দর্শন সৌভাগ্য পেলাম। আপনাকে দেখে আমরা সকলে কৃতার্থা।
ইন্দ্রের ছোট ভাই মাধব এই আত্মনিবেদন বাক্যকে সম্মান করে সেই রমণীদের প্রতি প্রসন্ননয়নে তাকালেন। সকলের সঙ্গে কথাবার্তা বললেন। তাঁদের যথোচিত সম্মান দিলেন এবং একে একে সকলকে পালকিতে বসালেন। কিঙ্কর নামের দানবরা এই পালকি বহন করে দ্বারকার দিকে এগিয়ে গেলেন। এই কিঙ্করদের গতি বায়ুর মতো, এঁরা হাজার হাজার সংখ্যায় সব শিবিকা বহন করতে লাগলেন। তাঁদের প্রবল কোলাহলে চারদিক ভরে উঠল।
পর্বতরাজ মণিপর্বতের সবচেয়ে উঁচু শিখর এখন চাঁদ-সূর্যের মেশানো আলোয় ভরে আছে। তাতে মণি ও সোনার তৈরি তোরণদ্বার কী সুন্দর লাগছে। এই পাহাড়ে কত পাখি। কি তাদের কুল গোত্র কে জানে। কতরকমের হাতি, হরিণ, সাপ আর গাছপালা কে তার খবর রাখে। তবে সবমিলে মণি পর্বতের যে শোভা তা কিন্তু সকলেরই নজর কাড়ে। এখানে কোনও কোনও পাথর ও শিলা ছড়ানো অঞ্চলে বানরের বসতি। হাজার হাজার পালকি এগিয়ে চলেছে দ্বারকার পথে। ওই দেখা গেল ‘ন্যঙ্কু’ মানে বিশেষ প্রজাতির শূকর-সিংহ। বরাহ আর রুরু মৃগকুল ওই শূকর-সিংহের সেবা করছে। সামনে কত ঝর্ণা। জলপ্রপাত। আলো আর জলে মিলেমিশে ওপর থেকে তরল আলোর কাছে এসে ধরা দেওয়া স্নিগ্ধ মাধুর্য। এই পথে ছিল আরও অনেক বড় বড় আন্তর শিখর। তাদের গায়ে মাথায় বিচিত্র শোভাসম্পন্ন বনস্পতির সমাহার। এই হরিণের দল দৌড়ে পেরিয়ে গেল। চকোর আর ময়ূরের কেকা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। শ্রীকৃষ্ণ এই সবই দেখলেন। পালকিতে আছেন যে ষোলো হাজার রমণী তাঁদেরও এই রমণীয় দৃশ্য চোখ এড়িয়ে গেল না। কৃষ্ণ ঝপ করে দু’বাহু বাড়িয়ে এই পর্বত শিখরটি উপড়ে নিয়ে গরুড়ের পিঠে রাখলেন। মহদায়তন গরুড় তার যাত্রাপথে দিক সমূহে প্রচণ্ড কোলাহল উৎপন্ন করে উড়ে চলেছেন। শ্রীকৃষ্ণের বশীভূত হয়ে তিনি চন্দ্র ও সূর্যের প্রদেশ অতিক্রম করে দেবতা ও গন্ধর্বসেবিত মেরুপর্বতে একবার থামলেন। মধুসূদন শ্রীকৃষ্ণ একে একে সব দেবতাদের বাড়িগুলি দেখলেন। বিশ্বদেব, মরুৎ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের স্থান সব পেরিয়ে দেবলোকে ইন্দ্রের রাজপ্রাসাদে ঢুকলেন। শতক্রতু ইন্দ্র খুব আনন্দিত হয়ে কৃষ্ণকে অভিনন্দিত করলেন। শ্রীকৃষ্ণ প্রধানা মহিষীদের অন্যতমা সত্যভামাকে সঙ্গে নিয়ে অদিতির দিব্য কুণ্ডল দুটি ইন্দ্রকে দিয়ে প্রণাম করলেন। ইন্দ্রও নানা ধনরত্ন দিয়ে কৃষ্ণের আদর সৎকার করলেন। এদিকে পুলোমা কন্যা শচীদেবীও সত্যভামাকে যথাযথ অভিনন্দিত করলেন। এরপর ইন্দ্র ও কৃষ্ণ একসঙ্গে অত্যন্ত সমৃদ্ধিশালী অদিতিদেবীর দিব্যভবনে গেলেন। দেবমাতাকে দর্শন ও প্রণাম করে কুণ্ডল দুটি নিবেদন করলেন। এরপর আশীর্বাদের ও সৌজন্য বিনিময়ের প্রসঙ্গ প্রকাশিত হল। অদিতি কৃষ্ণকে মন প্রাণ দিয়ে আশীর্বাদ তো করলেনই সঙ্গে সত্যভামাকেও আশীর্বচন উজাড় করে দিলেন। তারপর বললেন, শ্রীকৃষ্ণ! যতকাল তুমি মানবশরীরে মনুষ্যলোকে থাকবে, ততকাল আমার বৌমা সত্যভামা বৃদ্ধা হবেন না। এভাবে সমৃদ্ধ আপ্যায়ন সম্পন্ন হলে কৃষ্ণ দ্বারকার পথে আবার রওনা হলেন। পথে সামনে এল দেবতাদের ক্রীড়া কানন, সেখানে দেবতাদের বহুমানিত ও পূজিত বড় একটি গাছ ছিল, সেই দিব্য বৃক্ষে সবসময় অত্যন্ত সুগন্ধযুক্ত ফুল থাকত। তার পবিত্র গন্ধে দেবভূমি পরিপূর্ণ থাকত। এই গাছের বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তার কাছে গেলে সকলের নিজের পূর্বজন্মের কথা মনে পড়ে যেত। দেবতারা এই গাছটিকে সর্বতোভাবে রক্ষা করতেন। সত্যভামার অনুরোধে কৃষ্ণ ওই গাছটি উপড়ে নিয়ে গরুড়ের পিঠে রাখলেন আর রওনা দিলেন। দেবতাদের মনে কষ্ট হল, কিছুটা বিরূপ পরিস্থিতিও সামনে এল তবু এই ঘটনায় ইন্দ্র স্থির থাকলেন, তিনি বিবেচনা করলেন যে, কৃষ্ণ আমার মহৎকার্য সম্পন্ন করেছেন তাই তাঁর এই কাজটি অনুমোদন করাই উচিত। এমনটা জানিয়েছেন হরিবংশকার আর শ্রীমদ্ভাগবতম্ বলেছেন অন্য কথা, তাঁর মত হল, স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ইন্দ্র নতমস্তকে মুকুটের অগ্রভাগ দিয়ে অতুল বিক্রম কৃষ্ণের শ্রীচরণ স্পর্শ করে নিজের শত্রুশাতন করার জন্য প্রার্থনা করেছিলেন, আর সামান্য পারিজাত গাছটির জন্য তাঁরই সঙ্গে বিবাদ করলেন। এই আচরণে দেবতাদেরও তমোগুণের পরিচয় হল। আক্ষেপ করে দ্বৈপায়ন এখানে বলেছেন, ‘অহো সুরাণাঞ্চ তমো ধিগাঢ্যতাম্।’ দেবতাদের এই ঐশ্বর্যমদে ধিক। কৃষ্ণের যাত্রা পথের দু’ধারে দেবতারা তাঁকে পূজা করছেন, সপ্তর্ষিরা বন্দনা করছেন। অপ্সরারা সত্যভামাকে পিছন দিক থেকে দেখে নিজেদের কৃতার্থ বোধ করলেন।
দ্বারকায় পৌঁছে শ্রীকৃষ্ণে সমর্পিত হৃদয়া সেই ষোলো হাজার কন্যার প্রার্থনা— ‘ভূয়াৎ পতিরয়ং মহ্যং ধাতা তদনুমোদতাম্’কে সম্মান করে কৃষ্ণ একসময়েই সকলকে বিবাহ করলেন। এরপর প্রত্যেক স্ত্রী যেমন আলাদা আলাদা ঘরে অবস্থান করছিলেন শ্রীকৃষ্ণও অতগুলি বিগ্রহ ধারণ করে নিজে সেই স্ত্রীদের ঘরে একসময়ে উপস্থিত হয়ে যথাবিধানে তাঁদের পাণিগ্রহণ করলেন। ভাগবত বলছেন, তখন প্রত্যেক বনিতার ঘরই অতুল সৌন্দর্যমণ্ডিত ছিল এবং বাসুদেব প্রত্যেকের ঘরেই অবিচ্ছেদে বসতি করতে লাগলেন। অহো! যিনি ইচ্ছামাত্র এই অচিন্ত্য রচনাবিশিষ্ট জগতের সৃষ্টি করছেন, তাঁর নিজের আর ভোগ ব্যাপার কোথায়? তবে ভক্ত কামিনীদের প্রার্থনা পূরণের জন্য তিনি প্রাকৃত জনের মতো গৃহস্থধর্ম অনুশীলন করেছেন। তাঁর স্ত্রীরা সকলেই শ্রীশ্রীকমলার অংশসম্ভূতা। তিনি তাঁদের সঙ্গেই বিহার করেছেন। ব্রহ্মাদি লোকপালরা কেউ যাঁকে পাবার উপায় জানতে পারেন না, সেই শ্রীপতিকে এই বিবাহ পদ্ধতির দ্বারা পতিরূপে পেয়ে সেই ললনারা অনুরাগপূর্ণ মৃদুমন্দ হাসির বিকাশে অপাঙ্গ দৃষ্টি ও নবীন সঙ্গমজনিত উপহাসাদি বাক্যের উল্লেখে লজ্জা পেয়ে নিরন্তর পরমানন্দের উত্তরোত্তর বৃদ্ধিতে গোবিন্দকে একাগ্রচিত্তে ভজনা করেছেন। এই ষোলো হাজার স্ত্রীর প্রত্যেকের ঘরে শত শত দাসী পরিচর্যায় নিযুক্ত থাকলেও এঁরা সকলেই কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের সেবা নিজে হাতে করতেন। দাসীদের ওপর নির্ভর করতেন না। নিজেরাই শ্রীকৃষ্ণের অভিবাদন, প্রত্যুৎগমন, আসন দেওয়া, চরণ ধুইয়ে দেওয়া, পান দেওয়া, চরণ সেবা, চামর ব্যজন, গন্ধলেপন, ফুল-মালা দিয়ে সাজানো, কেশ ও শয্যা সংস্কার, ভোগ নিবেদন প্রভৃতি সবই নিজেরা সমাধা করতেন। নারদ প্রভুর এই গার্হস্থ্য লীলা দর্শন করে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
কৃষ্ণের এই ষোলো হাজার স্ত্রীর অপ্রাকৃত পরিচয় দিয়ে শাস্ত্র বলেছেন, এঁরা হলেন আসলে ষোলো হাজার দুশো ঋক্। আর কৃষ্ণ হলেন পুরুষোত্তম পরমাত্মা ওঙ্কার। এই গভীর তত্ত্বে আজ আমরা আর প্রবেশ করলাম না। তবে এটা মনে রাখতেই হবে যে, ‘হ্লাদিনীর সার প্রেম, প্রেমসার ভাব। ভাবের পরমকাষ্ঠা, নাম মহাভাব।’
নরবপু তাহার স্বরূপ।’
প্রচলিত বিশ্বাস হল, ‘রাম নরচন্দ্রমা কৃষ্ণ পুরুষোত্তম।’ পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ ঐশ্বর্য ও মাধুর্যের প্রকাশে ভক্তের হৃদয়ে প্রকাশিত হন। আমরা লক্ষ করি এ যাবৎ কৃষ্ণচরিত চর্চা বিস্তর হয়েছে, যাঁরাই মেধাকে শ্রীকৃষ্ণচরণে কোনও সূত্রে নিবেদন করেছেন, তাঁরাই বুঝেছেন যে, কুরুক্ষেত্র, মথুরা ও দ্বারকালীলায় রয়েছে ঐশ্বর্য আর ব্রজলীলা মাধুর্যে মণ্ডিত হয়ে আছে। আরও খেয়াল করলে বোঝা যায়, মথুরা দ্বারকাতেও মাধুর্য আছে, তবে তা ঐশ্বর্য কবলিত আর ব্রজে ঐশ্বর্য মাধুর্যে অভিভূত। এই কৃষ্ণ ভক্তির বশীভূত। সেই ভক্তির একটি হল প্রেমভক্তি। ব্রজগোপীরা প্রেমভক্তির পরাকাষ্ঠা। সেই প্রেমে মনে থাকে না আমি কে? ধর্মের কোনও তত্ত্ব, তথ্য। এই অকৈতব প্রেমের পথেই গোপীরা তাঁকে পেয়েছিলেন আপন করে, তারপর তাঁদের আপন পর সব হারিয়ে গিয়েছিল! সাধন, ভাব, প্রেম, শরণাগতি— ভক্তির এই চতুর্মুখের সঙ্গে বৃহদারণ্যক উপনিষদের অভ্যারোহ তত্ত্বের বেশ মিল আছে, এই সূত্রেই আসে কান্তাভাবের কথা। কান্তাভাবের জমাট চেহারা হল রাসলীলা। এখন আমরা এই প্রসঙ্গে প্রবেশ করব না। তবে মনে রাখব যে, ভক্তিপথে রতির কদর আছে। রতির পাঁচটি পরিচিত ধারা আছে— ১ শান্ত, ২ দাস্য, ৩ সখ্য, ৪ বাৎসল্য, ৫ মধুর। এর মধ্যে মধুরের মহিমা সবথেকে বেশি। তাতে আবার স্বকীয়া পরকীয়ার বৈচিত্র্য আছে। বৈষ্ণবরা পরকীয়া রতির প্রশংসা করেছেন— ‘পরকীয়াভাবে অতি রসের উল্লাস।’ কারণ এই ভূমিই কান্তাপ্রেমের পরাকাষ্ঠা। ব্রজের রাখাল রাজার প্রেমে যেমন গোপিনীরা পূর্ণ ছিলেন তেমনই প্রাগজ্যোতিষপুরে বন্দিনীদেরও ছিল নিখাদ কৃষ্ণ প্রেম! সেই সূত্রেই তাঁরা শ্রীকৃষ্ণকে স্বামীরূপে পেয়েছিলেন। গোপিনীদের সঙ্গে বন্দিনীদের প্রেমে যে বৈচিত্র্য ছিল তা হল— ব্রজাঙ্গনারা বালিকা ও রাসমণ্ডলে নিত্যলীলার অঙ্গভূতা আর বন্দিণীরা হলেন যুবতী, তদ্গতচিত্তা ও একনিষ্ঠা পরায়না। শুদ্ধা। মহিষী-মর্যাদা সম্পন্না। কৃষ্ণলীলায় রুক্মিণী, সত্যভামা, জাম্ববতী প্রমুখ মুখ্য মহিষীদের বাইরে এঁদের প্রকাশ ও অবস্থান প্রসঙ্গটি এখন আমরা যথাশাস্ত্র দেখার চেষ্টা করব।
নরকাসুরের বৃত্তি ও প্রবৃত্তি
শ্রীকৃষ্ণ তখন দ্বারকার রাজা আর প্রাগজ্যোতিষপুরের রাজা ছিলেন নরকাসুর। এঁর মা হলেন ভূমি, তাই তাঁর আর একটা নাম হল ভৌমাসুর। দেবতারা এঁকে ভয় করতেন আর ইন্দ্রের সঙ্গে তাঁর ছিল চরম শত্রুতা। এই নরকাসুর ‘মূর্তিলিঙ্গে’ থাকতেন। মূর্তিলিঙ্গ মানে শিবলিঙ্গের মতো দেখতে একটা বাড়ি। এই বাড়ি পৃথিবীতেই ছিল, নরকাসুর নিজের শত্রুদের থেকে বাঁচার জন্য এই দুর্ভেদ্য বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। সমস্ত দেবতাকে সবসময় বাধা দেওয়াই এই অসুরের কাজ ছিল। একদিন তাঁর চেতনায় দখিনা বাতাসের ছোঁয়া লাগল। হাতি সেজে গিয়েছিলেন প্রজাপতি ত্বষ্টার ঘরে, তারপর তাঁদের বছর চোদ্দোর মেয়ে কশেরুকে দেখে আর চোখ ফেরাতে পারলেন না। মন বলল, আহা কী রূপ! কী শোভা! আবার নিজের কাছেই হেরে গেলেন নরকাসুর। দু’হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরলেন সেই রূপলাবণ্যের মূর্তিকে। জোর করেই সে ধরা হয়েছিল। এমনিতে নরকাসুরের শোক আর ভয় বলে কিছু ছিল না, লজ্জাও ছিল না কোনও কালে। এখন এমন ঘোর লাগল যে, ভালোলাগার সামনে তিনিই নতজানু হলেন। এরপর কত প্রতিজ্ঞা, কত কথা দেওয়া। কশেরুর হাত ধরে নরকাসুর বললেন, দেবী। দেবতা ও মানুষের কাছে যত ধনরত্ন আছে, যত ধন বুকে ধরে পৃথিবী রেখেছে সব আমি তোমায় চুরি করে কেড়েকুড়ে এনে দেব। সমুদ্রের তলায় থাকা যত রত্ন সব সেঁচে ফেলে এনে দেব তোমাকেই। আজ থেকেই যত দৈত্য দানব আছে সবাই তোমার জন্য সবকিছু চুরি করে, লুট করে আনতে শুরু করবে!
নরকাসুর বা ভৌমাসুর যে নামেই বলি তাঁর কিন্তু কিছু মূল্যবোধ ছিল। কশেরুকে কথা দিয়েছেন দেবেন বলে তাই তিনি সৃষ্টি লুটে যা ভালো ভালো রত্ন, সম্পদ, কাপড়-চোপড় এনেছিলেন ও আনিয়েছিলেন সেগুলো আর নিজে ছুঁয়ে দেখেননি কোনও দিন। অধিকার আরোপ করেননি। ভোগও করেননি। তাঁর এই সংগ্রহের মধ্যে নানা জায়গা থেকে গায়ের জোরে চুরি করে আনা অনেক মেয়ে ছিল। তাদের অনেকেই দেবতাদের কন্যা, অনেকে মানুষের, আবার অনেকে ছিলেন গন্ধর্বকন্যা। সাতজন প্রধানা অপ্সরাকেও ধরে এনে নিজের ঘরে আটকে রেখে দিয়েছিলেন। ঝোঁকের মাথায় এভাবে তিনি ষোলো হাজার একশো সুন্দরী মেয়েকে তাঁদের বাড়ি থেকে হরণ করে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু অসুর রাজা ভুলেও এঁদের কাছে কখনও যাননি। ভালো লাগছে বলেননি। তুমি সুন্দর তাও বলেননি। বাড়িতে বন্দি করেছেন, চেতনায় সংগ্রহ করেননি, স্পর্শ করেননি, ঠাঁইও দেননি।
হরিবংশকার বলেছেন, এই সুন্দরী মেয়েরা সবাই সতীত্বের পথে ব্রত ও নিয়ম পালনে যত্নপর হয়ে অসুরের ঘরে থেকেছেন একবেণী ধারণ করে। ‘চতুর্দশ সহস্রাণি একবিংশচ্ছতানি চ। একবেণীধরাঃ সর্বাঃ সতীমার্গমনুব্রতাঃ।’ ভৌমাসুর প্রথমে নিজের বাড়িতে এঁদের ধরে আনলেও শেষ পর্যন্ত মণিপর্বতের ওপরে এই সুন্দরী ব্রতধারী নারীদের বসবাসের জন্য একটি নগর তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন। যেখানে এই নগর স্থাপন করলেন সেই জায়গাকে তখন লোকে অলকা বলে জানত। অলকা জনপদ মুরু নামের এক দৈত্যের দখল করা রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। এই মুর বা মুরু নামে দৈত্যের দশটি ছেলে এবং সেখানকার যাঁরা প্রধান রাক্ষস ছিলেন তাঁরা প্রাগজ্যোতিষপুরের রাজা ভৌমের অনুগামী ছিলেন। তাই তাঁরা ভৌমাসুরকে যেমন ধন জন সম্পদ নিষ্ঠা দিয়ে রক্ষা করতেন তেমনই এই কুমারীদেরও রক্ষা করতেন। এই কাজটি তাঁদের উপাসনা ছিল।
নরকাসুরের অনেক গুণ ছিল, তিনি কথা দিলে কথা রাখতেন। নিজের চেতনা ও ইন্দ্রিয়ের প্রতিও একটা নিয়ন্ত্রণ ছিল। ভালো তপস্বী ছিলেন। তবে সব রিপু জয় করতে পারেননি। তাই এই মহাসুর নরক তপস্যার শেষে তাঁর উপাস্যের বর লাভ করে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন। পুরাকালে সব অসুর একসঙ্গে মিলে যত পাপ করতে পারেননি, একা নরক সেই পরিমাণ পাপ করেছিলেন। ক্ষমতার দম্ভ তাঁকে ক্রমশ তাঁর ঠিকানায় ঠেলে নিয়ে গিয়েছিল। চেতনার চোখে তখন তাঁর মোহাচ্ছন্নতা। তাঁর পাপের ঘনঘটার সূত্রেই পৃথিবী ভারী হয়ে উঠেছিল। চেতনারূপিণী প্রকৃতি এলোমেলো হয়ে গেলে জগতের প্রকৃতিও ঘেঁটে যায়। পৃথিবী হারায় তার বাসযোগ্যতা। মানুষ হারায় তার মান সম্ভ্রম। বুদ্ধির বিভ্রমে তাই নরক দেবমাতা অদিতিকে তিরস্কার করেছিলেন, কুণ্ডল কেড়ে নিয়েছিলেন। তবে অসুরেরও সে পাপ সয়নি।
পুরাণ বলেছেন, ভৌমাসুরের মা হলেন পৃথিবী। বসুন্ধরা। প্রাগজ্যোতিষপুর তাঁর অধিকারে ছিল। সেই সূত্রে যুদ্ধোন্মত্ত চারজন তাঁর দ্বারপাল ছিল, ১ হয়গ্রিব, ২ নিসুন্দ, ৩ বীর পঞ্চনদ আর ৪ সহস্র পুত্রসহ মহাসুর মুরু। মুরুও নিজের উপাস্যের বর লাভ করেছিলেন।
দেখতে দেখতে নরকাসুরের এমন বাড়বাড়ন্ত হয়েছিল যে, তিনি শুধু এখানে নয়, পরলোকের পথেও নানা উৎপাত করতে লাগলেন। দেবযান মার্গ জুড়ে ভয়ঙ্কর সব রাক্ষসদের সঙ্গে নিয়ে এমনভাবে পথ আগলে নিজেকে ছড়িয়ে দিতেন যে, দেবযান মার্গে যাদের গতি লেগেছে এমন পুণ্যাত্মারাও ঊর্ধ্বলোকে যাবার সময় সগণ নরকাসুরের আচরণে সন্ত্রস্ত হতেন।
তখন একদিকে যেমন অসুরের অত্যাচারে সৃষ্টি রসাতলে যাবার জোগাড় হয়েছে তেমনই আবার উল্টোদিকে ধুলার ধরণীকে পবিত্র করে এখানে বিরাজ করছেন শ্রীকৃষ্ণ। দেবতাদের আকূল প্রার্থনায় তাঁর মহাবির্ভাব। তাঁর তেজে প্রোজ্জ্বল বিশ্ব পরিমণ্ডল। ইন্দ্রের ঠিকানা অমরাবতীপুরী, তার থেকে অনেক রমণীয় ছিল রাজাধিরাজ শ্রীকৃষ্ণের রাজধানী দ্বারকা। এই দ্বারকাপুরীর চারদিকে সমুদ্রের বেড়া। পঞ্চপর্বতে সুশোভিত এই নগরীতেই ছিল কৃষ্ণের সভাগৃহ। নাম ছিল দাশার্হী। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে তার আয়তন ছিল এক যোজন। সেখানে বৃষ্ণ ও অন্ধক বংশের সকলকে নিয়ে কৃষ্ণ বসেন। লোকজীবন রক্ষার জন্য রাজকার্য সম্পন্ন করেন।
কৃষ্ণের যুদ্ধযাত্রা
সেদিন যদুবংশের সবাইকে নিয়ে কৃষ্ণ সভায় বসে আছেন হঠাৎ সেখানে দিব্য সুগন্ধপূর্ণ বাতাস বইতে লাগল! দিব্য পুষ্পবৃষ্টি হল ঘর জুড়ে। তারপর মুহূর্তের মধ্যে আকাশে কিলকিলা শব্দ হতে লাগল। তারপর দেখা গেল তেজোরাশি পরিবৃত এক দিব্য আকৃতি প্রকটিত হয়ে আস্তে আস্তে পৃথিবীতে নেমে এলেন। সেই আলোর মধ্যে সাদা হাতির পিঠে বসা ইন্দ্রকে দেখতে পাওয়া গেল। উগ্রসেন বৃষ্ণি ও অন্ধক বংশের সকলকে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ইন্দ্রকে আপ্যায়নের জন্য এগিয়ে এলেন। হাতি থেকে নেমে ইন্দ্র প্রথমে শ্রীকৃষ্ণকে আলিঙ্গন করলেন। তারপর বলরাম ও উগ্রসেনকেও জড়িয়ে ধরলেন। একে একে বয়স অনুসারে অন্য বৃষ্ণিবীরদেরও আলিঙ্গন দিলেন। বলরাম ও শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে পূজা করলেন। দাশার্হী সভা আলো করে ইন্দ্র আসন গ্রহণ করলেন। কৃষ্ণকে আদর করে বললেন, মধুসূদন! শত্রুনাশন। যে কাজ নিয়ে আপনার কাছে এসেছি সেটা বলি— ‘নৈর্ঋতো নরকো নাম ব্রহ্মনো বরদর্পিতঃ। আদিত্যাঃ কুণ্ডলে মোহাজ্জহার দিতিনন্দনঃ।’ ব্রহ্মার বর পেয়ে নরক নামের রাক্ষসের বড়ই গর্ব হয়েছে, সে আমাদের মায়ের কানের দুল দুটি গায়ের জোরে কেড়ে নিয়ে গেছে। প্রতিদিন দেবতা ও ঋষিদের ক্ষতি করছে, তাঁদের উত্ত্যক্ত করছে। তুমি সুযোগ বুঝে এই পুরুষকে বধ কর। ভূমিপুত্র নরকাসুরকে কেউ বধ করতে পারবে না, তুমি গরুড়ে আরোহণ করে তাড়াতাড়ি এই কাজের জন্য রওনা হও। কৃষ্ণ বললেন, বেশ তাই করব। শঙ্খ, চক্র, গদা ও খড়্গধারী কৃষ্ণ ও সত্যভামাকে সঙ্গে নিয়ে এরপর সবার চোখের সামনে গরুড় বায়ুর সাতটি স্তর পেরিয়ে অনেক ওপরে উঠে গেলেন। ঐরাবতে ইন্দ্র ও গরুড়ে অবস্থিত কৃষ্ণ আস্তে আস্তে আকাশে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ইন্দ্র স্বর্গে ফিরলেন আর শ্রীকৃষ্ণ প্রাগ্জ্যোতিষপুরে পৌঁছালেন। যাবার সময় গরুড়ের পাখায় আহত হয়ে বায়ু উল্টো দিকে বইতে লাগল। আকাশে চরে বেড়ানো মেঘকুল খুব শব্দ করে ঘুরতে লাগল।
প্রাগজ্যোতিষপুরে শ্রীকৃষ্ণ নামলেন। দরজায় কত হাতি, ঘোড়া, রথ, সৈন্য। সঙ্গে রয়েছে মুরু দৈত্যের তৈরি ছ’ হাজার পাশ, যার প্রান্তে ক্ষুর লাগানো আছে। পীতবসন বনমালী শ্রীবৎসচিহ্নে অলঙ্কৃত কৃষ্ণের মাথায় রয়েছে কিরীট। সূর্য চন্দ্র ও বিদ্যুতের মতো প্রকাশিত হয়ে তিনি ধনুকে টঙ্কার ধ্বনি করলেন। মুর ছিল বিচক্ষণ। সে টের পেল বিষ্ণু এসেছেন। তার বেজায় রাগ হল। সময়ও শেষের মতো চোখ লাল করে মুর শক্তি নিয়ে ছুটে এলে কৃষ্ণ তার গতির ব্যবস্থা করলেন। এরপর পথ আটকে দাঁড়াল নিসুন্দ। কত অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার হল। মায়া যুদ্ধও হল কিন্তু মসৃণভাবে নিসুন্দ নিধন হয়ে গেল। সামনে এল হয়গ্রীব। তার সঙ্গেও কৃষ্ণের বেশ বড়সড় যুদ্ধ হল, শেষ পর্যন্ত আট লক্ষ সৈন্য সহ হয়গ্রীব বধ করে নরকাসুরের রাজত্বে কৃষ্ণ তাঁর পাঞ্চজন্য শঙ্খ বাজিয়ে দিকে দিকে ছুটে বেড়াতে লাগলেন। নিজের রাজ্যের এই পরিস্থিতি নরকাসুরের কাছে অসহ্য হয়ে উঠল, তিনি যুদ্ধে নামলেন এবং অনেক লড়াই করে শেষ পর্যন্ত ধরাশায়ী হলেন। মৃত্যুর পর রণাঙ্গনে পড়ে থাকা তাঁর শবের উপমা দিয়ে ব্যাস বলেছেন, ‘বজ্রপ্রহার নির্ভিন্নং যথা গৈরিক পর্বতম্।’ বজ্রাঘাতে বিদীর্ণ গৈরিক পর্বতের মতো পড়ে থাকা নিজের ছেলে নরককে দেখে মূর্তিমতী ভূদেবী অদিতির দুল দুটি নিয়ে গোবিন্দের সেবায় উপস্থিত হয়ে বললেন, গোবিন্দ! আপনিই আমাকে এই সন্তান দিয়েছিলেন আজ নিজেই তাকে ভূপাতিত করেছেন। ছোট ছেলে খেলনা নিয়ে যেমন খেলে আপনি তেমনই যেমন খুশি তেমনই খেলা করেন। এই নিন সেই দুই কুণ্ডল আর নরকাসুরের সন্তানকে পালন করুন। হে শরণাগত জনগণের দুঃখনাশন! আপনার ভয়ে ভৌমপুত্র ভগদত্ত নিতান্তই কাতর হয়েছে। শুধু নরকাসুরের সন্তান বলে নানা অপরাধে অপরাধী ভেবে একে উপেক্ষা করবেন না। নিখিল কল্মষনাশন আপনার করকমল একবার এর মাথায় রাখুন। এর সব দোষ চলে যাক।
সন্তানহারা মায়ের এই মৃদু অথচ তীব্র আপ্যায়নের পর শ্রীকৃষ্ণ ধীর পদে পরাক্রমশালী ভূমিপুত্র নরকাসুরের ভবন পরিদর্শন করলেন। দেখা গেল নরকাসুরের ধনাগারে অক্ষয় ধন ও নানা রত্ন সম্ভার রয়েছে। তখনকার দিনেও বিজিতের ধন বিজেতা সংগ্রহ করে নিজের রাজ্যে আনতেন মনে হয়, কারণ আমরা দেখলাম, শ্রীকৃষ্ণ ওই অসুরের ভাণ্ডার থেকে অনেক মণি, মুক্তা, প্রবাল, হীরে নিলেন, সোনার জাম্বুনদ, শাতকুম্ভ, মহামূল্য শয্যা, সিংহাসন, দণ্ড সব নিলেন। এই অসুরের সংগ্রহে এত মূল্যবান সম্পদ ছিল যা কুবেরের ছিল না। অসুরের কোষরক্ষক এই সবকিছুই কৃষ্ণকে অর্পণ করলেন। হাতি, ঘোড়া, সৈন্য, পাখি, চন্দনকাঠ, অগুরু কাঠ এমনি আরও যা কিছু ছিল সবই দেখালেন এবং সেগুলির বর্ণনা করে একটি তালিকাও সমর্পণ করলেন। কৃষ্ণ সেগুলি দেখে ও পরীক্ষা করে সবকিছু দানবদের দিয়েই দ্বারকায় পাঠালেন। তারপর সুবর্ণবর্ষণকারী বরুণের বিখ্যাত ছাতাটি গরুড়ের ওপর রাখলেন। এরপর তিনি মণিপর্বতের কাছে এলেন। হাল্কা হাওয়া বইছে, বৈদুর্যমণির মতো কত তোরণ, কত পতাকা, কত সুন্দর সুন্দর বড় বাড়ি। এখানেই অন্তঃপুরে এসে কৃষ্ণ স্থির হলেন।
ষোলো হাজার কন্যার কৃষ্ণ দর্শন ও প্রার্থনা
বিদ্যুতে গাঁথা মেঘের মতো ঝলমলে মণিপর্বত। নরকাসুরের নানা সময় নানা জায়গা থেকে হরণ করে আনা মেয়েরা সেখানেই সংরক্ষিত ছিল। শ্রীকৃষ্ণ দেবতা ও গন্ধর্বদের সোনার বরণ কান্তিমতী ও স্নেহের এই কন্যাদের দেখলেন। পর্বতের কন্দরে এঁদের লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। সবাই অত্যন্ত সুন্দরী, পৃথুলশ্রোণী। এই কুমারীরা কিন্তু নরকাসুরের দ্বারা পরাজিত হননি। কামভোগ বলে এঁদের কিছু ছিল না। মণিপর্বতে স্বর্গসুখের আয়োজনকে তাঁরা উপেক্ষা করেছেন। অনুমোদন বা গ্রহণ করেননি। একবেণী ধারণ করে থেকেছেন। কাষায় বস্ত্র পরেছেন। সব ইন্দ্রিয়কে সম্পূর্ণ সংযত করে রেখেছেন। ষোলো হাজার এই ব্রতী রমণীরা শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করে তাঁকে ঘিরে ধরলেন। ব্রত ও উপবাস করে তাঁদের সর্বাঙ্গ দুর্বল হয়ে গেছে কিন্তু সর্বান্তঃকরণে তাঁরা ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ দর্শন অভিলাষী। যদুকুল শ্রেষ্ঠ পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ সামনে এলে ষোলো হাজার কুমারী হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন। নরকাসুর, মহাসুর মুর, হয়গ্রীব ও নিসুন্দ মারা গেছে জেনে তাঁরা কৃতাঞ্জলি হয়ে কৃষ্ণের বন্দনা করলেন। কিছু বৃদ্ধ দানব এই কন্যাদের এতকাল রক্ষা করতেন, বয়সের ভারে নত সেই দানবরাও এসে কৃষ্ণের কাছে কৃতাঞ্জলি হলেন। প্রণাম করলেন। রায় রামানন্দ মহাপ্রভুকে প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন,
সচ্চিদানন্দতনু ব্রজেন্দ্রনন্দন।
সর্বৈশ্বর্য সর্বশক্তি সর্বরসপূর্ণ।।
বৃন্দাবনে অপ্রাকৃত নবীন মদন।
কামগায়ত্রী কামবীজে যাঁর উপাসন।।
স্ত্রী পুরুষ স্থাবর জঙ্গম সব কিছুই এঁর অপ্রাকৃত ভাবে এঁতে আকৃষ্ট হয়। তাঁর শৃঙ্গার ও রস হল অপ্রাকৃত। মাধুর্যে কৃষ্ণের তুলনা নেই। মহাপ্রভু শিখিয়েছেন, ‘কৃষ্ণ মাধুর্যসার, অন্য সিদ্ধি নাই তার, তেঁহো মাধুর্যের খনি।’ সাধ্যবস্তু নির্ণয় প্রসঙ্গে রামানন্দের আরও কিছু উন্মোচন হল ভক্তি পথের পাথেয়। তিনি প্রকাশ করেছিলেন, ‘কান্তাপ্রেম সর্বসাধ্যসার।’ কারণ কান্তাপ্রেমে শান্তের নিষ্ঠা, দাস্যের নিষ্ঠা ও সেবা, সখ্যের নিষ্ঠা, সেবা ও সঙ্কোচ শূন্যতা থাকে। বাৎসল্যের নিষ্ঠা, সেবা, সঙ্কোচহীনতা ও মমতার আতিশয্য থাকে। তাই শ্রীকৃষ্ণ শুধু কান্তাপ্রেমেই বশ্যতা স্বীকার করেছেন। এছাড়া মধুর রস সর্বগুণের আধার। ভাগবতে শ্রীভগবান নিজেই স্বীকার করেছেন যে, কান্তাপ্রেমের কাছে তিনি ঋণী।
অপরিসীম সৌন্দর্য ও মাধুর্যের আশ্রয় হলেও কৃষ্ণ যখন কান্তা সঙ্গে প্রকাশিত হন, তখন তিনি অধিকতর উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। কান্তাপ্রেমের আঁতুর হল ব্রজাঙ্গনাদের হৃদয়কমল। সে প্রেমের পরম প্রকাশ হলেন শ্রীরাধারানি। তবে এরপরে বিলাস-মহত্ত্ব প্রসঙ্গ আছে। বুদ্ধির দৌড় এই পর্যন্তই। তবে প্রেমবিলাস বিবর্তে প্রসিদ্ধ পংক্তি হল, ‘না সো রমণ, না হাম রমণী। দুঁহুমন মনোভব পেষল জানি।’ বিশ্বনাথ ‘বিবর্তে’র মানে বলেছেন, বিপরীত আর জীবগোস্বামী মনে করেছেন পাকা অবস্থা। মহাপ্রভু রামানন্দের মুখ আচ্ছাদন করে জানিয়েছেন, সাধ্যবস্তুর এটাই সীমা।
দ্বারকায় ফেরা ও ষোলো হাজার কন্যাকে বিবাহ করা
বৃষভতুল্য বিশাল নয়নশোভিত শ্রীকৃষ্ণকে মুখোমুখি দেখে ষোলো হাজার সুন্দরীর আর চোখে পলক পড়ে না। সকলের মন বলে উঠল ইনিই আমার স্বামী। ইনাকেই আমি স্বামীরূপে বরণ করতে চাই। ‘সর্বাসামেব সঙ্কল্পঃ পতিত্বেনাভবত্ততঃ।’ কৃষ্ণের অপরূপ রূপ দর্শনে এই রমণীদের সমস্ত ইন্দ্রিয় আনন্দসাগরে ডুবে গেল। আশিরনখ অত্যন্ত হর্ষ উপস্থিত হওয়ায় উৎফুল্ল মেয়েরা সবাই কৃষ্ণকে বললেন, আপনি আমার স্বামী হন। পুরাকালে এখানেই বায়ুদেবতা ও দেবর্ষি নারদ আমাদের যা বলেছিলেন, আজ দেখুন সেই কথাটি সত্য হল। সেদিন বায়ু ও নারদের ভবিষ্যৎ বাণী ছিল, শঙ্খ, চক্র, গদা ও খড়্গধারী যিনি সর্বব্যাপী নারায়ণ তিনি ভূমিপুত্র নরককে বধ করে তোমাদের সকলের পতি হবেন। ‘স ভৌমং নরকং হত্বা ভর্ত্তা চ ভবিতা স বঃ।’ আমরা দীর্ঘকাল সেই শত্রুদমন শ্যামসুন্দরের বিষয়ে শুনে এসেছি, আজ প্রিয়তম সেই পুরুষের দর্শন সৌভাগ্য পেলাম। আপনাকে দেখে আমরা সকলে কৃতার্থা।
ইন্দ্রের ছোট ভাই মাধব এই আত্মনিবেদন বাক্যকে সম্মান করে সেই রমণীদের প্রতি প্রসন্ননয়নে তাকালেন। সকলের সঙ্গে কথাবার্তা বললেন। তাঁদের যথোচিত সম্মান দিলেন এবং একে একে সকলকে পালকিতে বসালেন। কিঙ্কর নামের দানবরা এই পালকি বহন করে দ্বারকার দিকে এগিয়ে গেলেন। এই কিঙ্করদের গতি বায়ুর মতো, এঁরা হাজার হাজার সংখ্যায় সব শিবিকা বহন করতে লাগলেন। তাঁদের প্রবল কোলাহলে চারদিক ভরে উঠল।
পর্বতরাজ মণিপর্বতের সবচেয়ে উঁচু শিখর এখন চাঁদ-সূর্যের মেশানো আলোয় ভরে আছে। তাতে মণি ও সোনার তৈরি তোরণদ্বার কী সুন্দর লাগছে। এই পাহাড়ে কত পাখি। কি তাদের কুল গোত্র কে জানে। কতরকমের হাতি, হরিণ, সাপ আর গাছপালা কে তার খবর রাখে। তবে সবমিলে মণি পর্বতের যে শোভা তা কিন্তু সকলেরই নজর কাড়ে। এখানে কোনও কোনও পাথর ও শিলা ছড়ানো অঞ্চলে বানরের বসতি। হাজার হাজার পালকি এগিয়ে চলেছে দ্বারকার পথে। ওই দেখা গেল ‘ন্যঙ্কু’ মানে বিশেষ প্রজাতির শূকর-সিংহ। বরাহ আর রুরু মৃগকুল ওই শূকর-সিংহের সেবা করছে। সামনে কত ঝর্ণা। জলপ্রপাত। আলো আর জলে মিলেমিশে ওপর থেকে তরল আলোর কাছে এসে ধরা দেওয়া স্নিগ্ধ মাধুর্য। এই পথে ছিল আরও অনেক বড় বড় আন্তর শিখর। তাদের গায়ে মাথায় বিচিত্র শোভাসম্পন্ন বনস্পতির সমাহার। এই হরিণের দল দৌড়ে পেরিয়ে গেল। চকোর আর ময়ূরের কেকা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। শ্রীকৃষ্ণ এই সবই দেখলেন। পালকিতে আছেন যে ষোলো হাজার রমণী তাঁদেরও এই রমণীয় দৃশ্য চোখ এড়িয়ে গেল না। কৃষ্ণ ঝপ করে দু’বাহু বাড়িয়ে এই পর্বত শিখরটি উপড়ে নিয়ে গরুড়ের পিঠে রাখলেন। মহদায়তন গরুড় তার যাত্রাপথে দিক সমূহে প্রচণ্ড কোলাহল উৎপন্ন করে উড়ে চলেছেন। শ্রীকৃষ্ণের বশীভূত হয়ে তিনি চন্দ্র ও সূর্যের প্রদেশ অতিক্রম করে দেবতা ও গন্ধর্বসেবিত মেরুপর্বতে একবার থামলেন। মধুসূদন শ্রীকৃষ্ণ একে একে সব দেবতাদের বাড়িগুলি দেখলেন। বিশ্বদেব, মরুৎ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের স্থান সব পেরিয়ে দেবলোকে ইন্দ্রের রাজপ্রাসাদে ঢুকলেন। শতক্রতু ইন্দ্র খুব আনন্দিত হয়ে কৃষ্ণকে অভিনন্দিত করলেন। শ্রীকৃষ্ণ প্রধানা মহিষীদের অন্যতমা সত্যভামাকে সঙ্গে নিয়ে অদিতির দিব্য কুণ্ডল দুটি ইন্দ্রকে দিয়ে প্রণাম করলেন। ইন্দ্রও নানা ধনরত্ন দিয়ে কৃষ্ণের আদর সৎকার করলেন। এদিকে পুলোমা কন্যা শচীদেবীও সত্যভামাকে যথাযথ অভিনন্দিত করলেন। এরপর ইন্দ্র ও কৃষ্ণ একসঙ্গে অত্যন্ত সমৃদ্ধিশালী অদিতিদেবীর দিব্যভবনে গেলেন। দেবমাতাকে দর্শন ও প্রণাম করে কুণ্ডল দুটি নিবেদন করলেন। এরপর আশীর্বাদের ও সৌজন্য বিনিময়ের প্রসঙ্গ প্রকাশিত হল। অদিতি কৃষ্ণকে মন প্রাণ দিয়ে আশীর্বাদ তো করলেনই সঙ্গে সত্যভামাকেও আশীর্বচন উজাড় করে দিলেন। তারপর বললেন, শ্রীকৃষ্ণ! যতকাল তুমি মানবশরীরে মনুষ্যলোকে থাকবে, ততকাল আমার বৌমা সত্যভামা বৃদ্ধা হবেন না। এভাবে সমৃদ্ধ আপ্যায়ন সম্পন্ন হলে কৃষ্ণ দ্বারকার পথে আবার রওনা হলেন। পথে সামনে এল দেবতাদের ক্রীড়া কানন, সেখানে দেবতাদের বহুমানিত ও পূজিত বড় একটি গাছ ছিল, সেই দিব্য বৃক্ষে সবসময় অত্যন্ত সুগন্ধযুক্ত ফুল থাকত। তার পবিত্র গন্ধে দেবভূমি পরিপূর্ণ থাকত। এই গাছের বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তার কাছে গেলে সকলের নিজের পূর্বজন্মের কথা মনে পড়ে যেত। দেবতারা এই গাছটিকে সর্বতোভাবে রক্ষা করতেন। সত্যভামার অনুরোধে কৃষ্ণ ওই গাছটি উপড়ে নিয়ে গরুড়ের পিঠে রাখলেন আর রওনা দিলেন। দেবতাদের মনে কষ্ট হল, কিছুটা বিরূপ পরিস্থিতিও সামনে এল তবু এই ঘটনায় ইন্দ্র স্থির থাকলেন, তিনি বিবেচনা করলেন যে, কৃষ্ণ আমার মহৎকার্য সম্পন্ন করেছেন তাই তাঁর এই কাজটি অনুমোদন করাই উচিত। এমনটা জানিয়েছেন হরিবংশকার আর শ্রীমদ্ভাগবতম্ বলেছেন অন্য কথা, তাঁর মত হল, স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ইন্দ্র নতমস্তকে মুকুটের অগ্রভাগ দিয়ে অতুল বিক্রম কৃষ্ণের শ্রীচরণ স্পর্শ করে নিজের শত্রুশাতন করার জন্য প্রার্থনা করেছিলেন, আর সামান্য পারিজাত গাছটির জন্য তাঁরই সঙ্গে বিবাদ করলেন। এই আচরণে দেবতাদেরও তমোগুণের পরিচয় হল। আক্ষেপ করে দ্বৈপায়ন এখানে বলেছেন, ‘অহো সুরাণাঞ্চ তমো ধিগাঢ্যতাম্।’ দেবতাদের এই ঐশ্বর্যমদে ধিক। কৃষ্ণের যাত্রা পথের দু’ধারে দেবতারা তাঁকে পূজা করছেন, সপ্তর্ষিরা বন্দনা করছেন। অপ্সরারা সত্যভামাকে পিছন দিক থেকে দেখে নিজেদের কৃতার্থ বোধ করলেন।
দ্বারকায় পৌঁছে শ্রীকৃষ্ণে সমর্পিত হৃদয়া সেই ষোলো হাজার কন্যার প্রার্থনা— ‘ভূয়াৎ পতিরয়ং মহ্যং ধাতা তদনুমোদতাম্’কে সম্মান করে কৃষ্ণ একসময়েই সকলকে বিবাহ করলেন। এরপর প্রত্যেক স্ত্রী যেমন আলাদা আলাদা ঘরে অবস্থান করছিলেন শ্রীকৃষ্ণও অতগুলি বিগ্রহ ধারণ করে নিজে সেই স্ত্রীদের ঘরে একসময়ে উপস্থিত হয়ে যথাবিধানে তাঁদের পাণিগ্রহণ করলেন। ভাগবত বলছেন, তখন প্রত্যেক বনিতার ঘরই অতুল সৌন্দর্যমণ্ডিত ছিল এবং বাসুদেব প্রত্যেকের ঘরেই অবিচ্ছেদে বসতি করতে লাগলেন। অহো! যিনি ইচ্ছামাত্র এই অচিন্ত্য রচনাবিশিষ্ট জগতের সৃষ্টি করছেন, তাঁর নিজের আর ভোগ ব্যাপার কোথায়? তবে ভক্ত কামিনীদের প্রার্থনা পূরণের জন্য তিনি প্রাকৃত জনের মতো গৃহস্থধর্ম অনুশীলন করেছেন। তাঁর স্ত্রীরা সকলেই শ্রীশ্রীকমলার অংশসম্ভূতা। তিনি তাঁদের সঙ্গেই বিহার করেছেন। ব্রহ্মাদি লোকপালরা কেউ যাঁকে পাবার উপায় জানতে পারেন না, সেই শ্রীপতিকে এই বিবাহ পদ্ধতির দ্বারা পতিরূপে পেয়ে সেই ললনারা অনুরাগপূর্ণ মৃদুমন্দ হাসির বিকাশে অপাঙ্গ দৃষ্টি ও নবীন সঙ্গমজনিত উপহাসাদি বাক্যের উল্লেখে লজ্জা পেয়ে নিরন্তর পরমানন্দের উত্তরোত্তর বৃদ্ধিতে গোবিন্দকে একাগ্রচিত্তে ভজনা করেছেন। এই ষোলো হাজার স্ত্রীর প্রত্যেকের ঘরে শত শত দাসী পরিচর্যায় নিযুক্ত থাকলেও এঁরা সকলেই কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের সেবা নিজে হাতে করতেন। দাসীদের ওপর নির্ভর করতেন না। নিজেরাই শ্রীকৃষ্ণের অভিবাদন, প্রত্যুৎগমন, আসন দেওয়া, চরণ ধুইয়ে দেওয়া, পান দেওয়া, চরণ সেবা, চামর ব্যজন, গন্ধলেপন, ফুল-মালা দিয়ে সাজানো, কেশ ও শয্যা সংস্কার, ভোগ নিবেদন প্রভৃতি সবই নিজেরা সমাধা করতেন। নারদ প্রভুর এই গার্হস্থ্য লীলা দর্শন করে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
কৃষ্ণের এই ষোলো হাজার স্ত্রীর অপ্রাকৃত পরিচয় দিয়ে শাস্ত্র বলেছেন, এঁরা হলেন আসলে ষোলো হাজার দুশো ঋক্। আর কৃষ্ণ হলেন পুরুষোত্তম পরমাত্মা ওঙ্কার। এই গভীর তত্ত্বে আজ আমরা আর প্রবেশ করলাম না। তবে এটা মনে রাখতেই হবে যে, ‘হ্লাদিনীর সার প্রেম, প্রেমসার ভাব। ভাবের পরমকাষ্ঠা, নাম মহাভাব।’



