নিজস্ব প্রতিনিধি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: বেনজির পরিস্থিতি তৈরি হল নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ে। পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির ক্লাস অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দেওয়া হবে ৫ জুলাই থেকে। বন্ধ রাখা হবে সব হস্টেল ও ভবন। প্রত্যেক অভিভাবককে অনুরোধ করা হয়েছে, আপনার সন্তানদের শনিবার দুপুর দেড়টার পর বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য। কবে হস্টেলে নিয়ে আসতে হবে, তা পরবর্তী সময়ে জানিয়ে দেওয়া হবে। ছাত্র মৃত্যুর ঘটনায় বিতর্ক তৈরি হতেই এই সিদ্ধান্ত নিল স্কুল কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ক্লাস ও হস্টেল বন্ধ করার কথা জানিয়েছে তারা। যদিও তাতে কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস নিয়ে কিছু বলা হয়নি। সেক্ষেত্রে এই দুই শ্রেণির কী হবে, সেটা নিয়ে স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়নি।
মঙ্গলবার গরম চা পান করে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র দীপ্তাংশু মাহাতর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তোলপাড় রাজ্য। গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে স্কুলের হস্টেলের দুই হাউস মাস্টারের বিরুদ্ধে। তাঁরা বর্তমানে সাসপেন্ডেড। এসবের মধ্যেই মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা গিয়েছে। সূত্রের খবর, ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, একলপ্তে গরম চা পান করার ফলে ওই ছাত্রের খাদ্যনালি ঝলসে গিয়েছিল। মারাত্মক ক্ষতি হয়েছিল সেই অঙ্গের। চিকিৎসকদের মতে, ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা হয়নি ওই ছাত্রের। ফলে আরও খারাপ হয়েছে পরিস্থিতি। যদি তৎক্ষণাৎ দীপ্তাংশুকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করে কিছুটা স্বাভাবিক করার পর পরবর্তী পদক্ষেপ শুরু হত, তাহলে তাঁর প্রাণ যেত না।
পুলিশ সূত্রে খবর, এই ঘটনার পর ওই ছাত্রের বন্ধু, শিক্ষক সহ অনেকেরই সঙ্গে কথা বলেছেন তদন্তকারীরা। কিন্তু সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি। এদিকে, যে দুজন হাউস মাস্টারের বিরুদ্ধে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে তাঁদের গ্রেপ্তারি এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। কারণ, মৃত ছাত্রের বাবা ই-মেল করে অভিযোগ করেছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী, নথিতে তাঁর সই প্রয়োজন ছিল। সেটা এদিন এসে করে দিয়েছেন তিনি। ফলে এবার পরবর্তী পদক্ষেপ করতে পারবে পুলিশ। ছাত্র মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং বিদ্যালয়ের প্রাক্তনী সংগঠন এনআরভিপি।
ফুটবল ছিল দীপ্তাংশুর নেশা। এখন বিশ্বকাপ চলছে। প্রিয় দল ব্রাজিল, প্রিয় ফুটবলার নেইমার। মিশনের নিয়মে সব ম্যাচ দেখা সম্ভব ছিল না। তাই ৩ জুলাই বাড়ি ফিরে দিদির সঙ্গে বসে বাকি ম্যাচ দেখার পরিকল্পনা করেছিল। আর ফেরা হল না। দীপ্তাংশুর দিদি মঞ্জিমার দাবি, ফ্লাস্কে রাখা চা খাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়লেও ভাইকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়নি। শুরুতেই যথাযথ চিকিৎসা হলে হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। পরিবারের দাবি, বাবা মনোরঞ্জন মাহাত স্কুলে পৌঁছানোর পরও দীপ্তাংশু কথা বলছিল। বাবার মোবাইলে বিশ্বকাপের ম্যাচও দেখেছিল। কিন্তু, অল্প
সময়ের মধ্যেই তার অবস্থার অবনতি হয়। বাবার কাঁধে মাথা রেখেই
মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সে। তিন বছর আগে স্ত্রীকে হারিয়েছিলেন মনোরঞ্জন। এবার অকালে চলে গেল একমাত্র ছেলেও। মধ্যমগ্রামের নবনালন্দা শিশু বিদ্যাপীঠের প্রাক্তন ছাত্র দীপ্তাংশুর এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় বসার কথা ছিল।
২৭ জুন জন্মদিন ছিল দীপ্তাংশুর। তার তিনদিন পর এহেন মর্মান্তিক মৃত্যু... মেনে নিতে পারছে না পরিবার। এখন কলকাতায় ময়নাতদন্তের পর ছেলের দেহ ফেরার অপেক্ষায় তাঁরা। তাঁদের দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে ও দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হোক।