সোমনাথ বসু: রবিবার ভোর। লায়োনেল মেসি। রোনাল্ডো। এবং এক পেয়ালা চা। এমন কম্বো বাঙালি কখনো দেখেনি। এবার দেখবে। সৌজন্যে, ফুটবলের মহাযুদ্ধ। মসলন্দপুরের হিমাংশু সেন সাড়ে চারটের সময় অ্যালার্ম দিয়ে উঠবেন। নিজেই অনভ্যস্ত হাতে চা বানিয়ে চমকে দেবেন গিন্নি মধুজাদেবীকে। তারপর বসবেন টিভি চালিয়ে। প্রথমে রোনাল্ডো। তারপর মেসি। এ সুযোগ পাবে না আর। যতখুশি দাম দিলেও না।
মসলন্দপুর থেকে মুকুন্দপুর। এমন একটা রবিবারের অপেক্ষায় আজীবনকাল অপেক্ষা করে থাকেন ফুটবলপ্রেমীরা। তুফান ওঠে বেডরুম থেকে ড্রইং রুমে। এমন একটা দিনেই তাঁরা চমকে দিতে চান বাড়ির লোককে। বাবাকে বলতে শোনা যায়, ‘কী রে, পরীক্ষার আগে তো এত সকালে উঠতে দেখা যায় না?’ স্ত্রী বলেন, ‘আজ কি বিবাহবার্ষিকী নাকি?’ উত্তর দেন না হিমাংশুবাবুরা। উত্তর তো টিভির পরদায়!
ক্যালেন্ডারে রবিবার অবশ্যই রেড লেটার ডে। কিন্তু সেটা বড়ো কথা নয়। মায়ামিতে রোনাল্ডোর পর্তুগালের সঙ্গে কলম্বিয়ার খেলা। সিআরসেভেনের ‘সিউউউউ’ সেলিব্রেশন। রোনাল্ডোর দাদাগিরি শেষ হওয়ার আধঘণ্টার মধ্যেই আর্জেন্তিনা-জর্ডন ম্যাচ। ডালাসে। হোক না সূদূর আমেরিকা। প্রযুক্তির কাছে সব দূরত্ব নস্যি। এই ফুটবল জ্বরের প্রধান ভাইরাস মেসি-রোনাল্ডোই। গত ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে দু’গোল পেয়েছেন পর্তুগিজ মহাতারকা। গলার শিরা ফোলানো চিৎকার, শূন্যে উঠে পিছন ফিরে নামার মধ্যে অহংকার মিশে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে মায়ামিতেও। এই শহর এখন মেসির। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর ডেরায় তাই বিপক্ষের জাল কাঁপাতে মরিয়া রোনাল্ডো। যাবতীয় ভেদাভেদ ভুলে সঙ্গ দিতে তৈরি ব্রুনো ফার্নান্ডেজ, নুনো মেন্ডেসরা। প্রতিপক্ষ কলম্বিয়া যথেষ্ট শক্তিশালী দল। প্রথম দু’টি ম্যাচই জিতেছে। কিন্তু বাঙালির রোনাল্ডোপ্রেমের কাছে এই পরিসংখ্যান তুচ্ছ। রবিবার ভোরে উঠে খেলা দেখা তো তাঁর গোলের জন্যই। পর্তুগালকে গ্রুপ সেরা করার জন্যই।
আর্জেন্তিনার লিও মেসি আবার অন্যরকম। রোনাল্ডোর মতো বর্হিমুখী নন, শান্ত-স্থিতধী। কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের সাড়ে তিন বছর পরেও সাফল্যের খিদে একইরকম। প্রথম দু’টি ম্যাচেই তাঁর ঝুলিতে ৫ গোল। সবুজ ঘাসের ক্যানভাসে বাঁ পায়ের তুলি এঁকেই চলেছে রামধনুর সাত রং। বাঙালিও রঙিন। মেজাজে, স্বভাবেও। পূর্বসূরি ডিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনার অভিশপ্ত ডালাসে মেসিই এখন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। তবে নক-আউট নিশ্চিত হওয়ার পর অপেক্ষাকৃত দুর্বল জর্ডনের বিরুদ্ধে কি তাঁকে বিশ্রাম দেবেন স্কালোনি? যদি দেন, তাহলে বাঙালি কিন্তু আর্জেন্তাইন কোচকে ক্ষমা করবে না। কারণ হিসাবে চোটের আশঙ্কা বলতেই পারেন স্কালোনি। কিন্তু বাঙালির রবিবারের সকাল নষ্ট করার অধিকার কি আপনার রয়েছে? আগেভাগে ঠিক করা, ব্রেকফাস্টে লুচি আর সাদা আলুর তরকারি, আর লাঞ্চে কচি পাঁঠার ঝোল। রোনাল্ডো ও মেসি, দু’জনেই জিতলে আনা হবে কাতলাও। কিন্তু মেসি না খেললে মাসের শেষে বাজেট কমতে বাধ্য।
সাড়ে ন’টায় শেষ মেসির ম্যাচ। তারপর ব্যাগ হাতে বাজার যাওয়ার পথে চায়ের দোকানে আড্ডা। হোক না দেরি, রাগ করুক গিন্নি আর ছানাপোনা। মেসি-রোনাল্ডো নিয়ে আড্ডা না মারলে তো রবিবারের সকালটাই মাটি। মান্না দে তাই তো কবেই গেয়েছেন, ‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল...’।