Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভোটে জিততে সরকারি চাকরির খোয়াব বন্ধ হোক!

গোটা জাতিকে লাইনে দাঁড় করিয়ে চাকরির খোয়াব দেখাচ্ছে গেরুয়া শিবির। জিতে এলে বাংলার ছেলেমেয়েদের বিজেপি নাকি সরকারি চাকরি দেবে! সঙ্গে ৪৫ দিনে সপ্তম বেতন কমিশন।

ভোটে জিততে সরকারি চাকরির খোয়াব বন্ধ হোক!
  • ৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১৬:০৪
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: গোটা জাতিকে লাইনে দাঁড় করিয়ে চাকরির খোয়াব দেখাচ্ছে গেরুয়া শিবির। জিতে এলে বাংলার ছেলেমেয়েদের বিজেপি নাকি সরকারি চাকরি দেবে! সঙ্গে ৪৫ দিনে সপ্তম বেতন কমিশন। এই স্বপ্ন দেখিয়েই ঢালাও প্রচার চলছে কাকদ্বীপ থেকে কোচবিহারে! বিজ্ঞাপনে হাসিমুখে একজন বলছেন, খালি হাতে আর বসে থাকতে হবে না। একবার বিজেপি এলেই রাজ্যে নাকি ঢালাও সরকারি চাকরির বান ডাকবে! নিয়োগ শুরু পরিবর্তনের দু’মাসের মধ্যে। আর ডিসেম্বরেই সব সরকারি শূন্যপদ পূরণ শেষ। তাই শুনে সাজানো ঘরে মৃদু হাসি ছড়িয়ে পড়ছে। তাই তাই তাই, আনন্দের আর সীমা নেই! বলুন তো, সরকারি চাকরি হাতের মোয়া নাকি? বাংলার আম জনতা কি দুধেভাতে যে দিল্লি থেকে উড়ে এসে যে যা খাওয়াবেন তাই খাবে এবং হজম করবে? দশ লক্ষেরও বেশি শূন্য পদ বছরের পর বছর ফাঁকা, নরেন্দ্র মোদি সরকার নিয়োগ করে না কেন? মোদি জমানার ১২ বছর ইতিমধ্যেই পার। মহামারী থেকে হরেক কিসিমের বিপর্যয়। একবারের জন্য কেন্দ্রে নিয়োগের দরজা খোলেনি আচ্ছে দিনের ব্যর্থ রাজা। সরকারি হিসাবই বলছে, দেশে বেকারত্বের হার রেকর্ড করেছে। বছরে দু’কোটি চাকরি তো শতাব্দীর সেরা জুমলা ছিল মোদিজির সোনা মাখা মুখে, দ্বিতীয় জুমলা নোটবাতিলের কুনাট্য! আর অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকাও। এমন শত সহস্র জুমলা উপহার দিয়েছে বিজেপি। দোসর আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি। বেকার লোকের সংখ্যা বাড়ছে লাফিয়ে। হাতে কাজ নেই, গোদের উপর বিষফোড়া ৪০০ টাকার রান্নার গ্যাস বেড়ে হাজার টাকা। পেট্রল একশো ছাড়িয়েছে কবেই। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। প্রবীণদের আরও সমস্যা। ব্যাংকে সুদ একবার বাড়ে, পরক্ষণেই আবার কমে! আয়ের এই ওঠানামায় কোথায় যাবে চাকরিহারা মানুষ? পাঁচ বছর অন্তর ভোট আসে আর মনভোলানোর নাটক শুরু হয়।

Advertisement

সেদিন পর্যন্ত দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ নিয়োগ সংস্থা ছিল রেল। তারাও বহু ক্ষেত্রে হাত তুলে নিয়েছে। ঢালাও বেসরকারিকরণ, আউটসোর্সিং এবং চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকের বাড়বাড়ন্তে কর্মসংস্থান তলানিতে। একই অবস্থা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বিমাক্ষেত্রে। একের পর এক ব্যাংককে একে অপরের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। লাভজনক করতে শাখার সংখ্যা কমানো হচ্ছে। শেষে নাকি মাত্র ৪টি বড়ো ব্যাংক থাকবে! তাহলে চাকরি হবে 
কোথা থেকে। সরকারি চাকরি ক্রমেই ডুমুরের ফুল। কল-কারখানাতেও সুযোগ কমছে। এই কঠিন সময়ে শুধুমাত্র ভোটে জিততে বাংলায় সরকারি পদ পূরণের মিথ্যে স্বপ্ন দেখানো কি কেন্দ্রের শাসকদলের বাচ্চাদের রংবেরঙের বেলুন হাতে গুঁজে মনভোলানোরই বিচিত্র পদ্ধতি? আরও খটকা দু’মাসের টাইম ফ্রেম বেঁধে দেওয়ায়। দু’মাসে আবেদন, পরীক্ষা এবং ইন্টারভিউ সম্পূর্ণ হয়ে যাবে? আর ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সমাপ্ত! এ তো এক অসম্ভব ধূর্ত পরিকল্পনা। তাতেও না হলে সাধারণ নিম্নবিত্ত ঘরের ছেলেরা স্টার্ট আপ 
খুলবে! বলতে সুন্দর, ভাবতে ভালো। কিন্তু বাস্তবে? হতাশা আর হতাশা। ভোট যায় ভোট আসে, কেউ কথা রাখে না! ভোটের সঙ্গেই প্রতিশ্রুতিগুলোও ভেসে চলে যায় সাগরের জলে। এবারের চ্যালেঞ্জ বাঙালি সত্তাকে বাঁচানোর। ওইটুকুই তো অবশিষ্ট পড়ে আছে।
চাকরির মিথ্যে প্রতিশ্রুতির পর অনুপ্রবেশ ইস্যুও ব্যুমেরাং হওয়ার পথে। অমিত শাহ ঘুসপেটিয়া বললেই আজকাল লোকে মুখ টিপে হাসে। ভাবটা এমন উনিই তো সবচেয়ে বড়ো অনুপ্রবেশকারী এই বাংলায়। হাতে গুজরাত দাঙ্গার রক্ত। তিনি দেবেন চার্জশিট! এসআইআর-এর মতোই শেষে উলটো ফল হবে না তো! ইতিমধ্যেই এই প্রশ্ন বিজেপিকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। গত বৃহস্পতিবার ভবানীপুরে দলবদলুর মনোনয়নের কর্মসূচি শেষ করেই অমিত শাহ ছুটে যান অসমে। কিন্তু গুয়াহাটিতে টানা দশ বছর সরকার চালানোর পরও তাঁর মুখে ভাষণের শুরুতেই ঘুসপেটিয়া শুনে চমকে উঠলাম। ওটা তো বাংলার জ্বলন্ত সমস্যা, গেরুয়া শাসিত অসমে কেন রিপিট করছেন? ঘুরিয়ে কি অমিত শাহরা স্বীকার করে নিচ্ছেন, এক দশক রাজত্ব করার পরও অনুপ্রবেশ সমস্যা নির্মূল করতে ব্যর্থ অসমের শাসক বিজেপি। এনআরসি করেও কোনো কাজ হয়নি সেখানে। সাম্প্রতিকতম এসআরও অর্থহীন। সমস্যা সেই তিমিরেই। সেই কারণে এবারও সেখানে গেরুয়া প্রচারের মূল ইস্যু আবর্তিত হচ্ছে ইনফিলট্রেশনকে ঘিরেই। সত্যি সমস্যা মেটেনি না রাজনীতি করার জন্য জিইয়ে রাখা হয়েছে দলের স্বার্থে, তা হিমন্ত বিশ্বশর্মারাই ভালো বলতে পারবেন।
ভবানীপুরে দলবদলুর মনোনয়ন জমা শেষ হতেই অমিতজি, উড়ে গিয়েছেন অসমে। সরকারি হাওয়াই জাহাজ পিছনে বাঁধা আছে বলেই যা দস্তুর। 
বিকেল সাড়ে তিনটেয় সেখানে নির্ধারিত ছিল তাঁর জনসভা। বাংলা ঘুরে যাওয়ায় সেই সভা একটু পিছোল বটে। কিন্তু ন্যারেটিভ খুব বদলাল না। ভাষণের শুরুতেই  ঘুসপেটিয়া তাড়ানোর হুংকার! সবাই জানে অসমে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে ২০১৬ সালের জুন মাসে। দশ বছরেও অনুপ্রবেশ সমস্যার সমাধান হল না। এর দায় কার? আর বাংলার মানুষকে ধাপ্পা দিচ্ছেন? একবার জেতান, সীমান্তে রাতারাতি বেড়া দিয়ে অনুপ্রবেশ সমস্যার সমাধান করে দেব! সবিনয়ে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলি, এটা আপনাদের কত নম্বর জুমলা?
নারী নির্যাতন নিয়ে বাংলাকে দুষছেন। ঘটা করে চার্জশিট দিয়েছেন। দামি গ্লসি কাগজে ছাপিয়েছেন। তাতে ১১ নম্বর পৃষ্ঠায় ঘটা করে একটি পরিসংখ্যান দেওয়া আছে। যেখানে বলা হচ্ছে এনসিআরবি’-র রিপোর্ট অনুযায়ী বিগত তেইশ সালে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ হাজার ৭৩৮টি নারী নির্যাতনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিটি রাজনৈতিক দল সোচ্চার হবে এটাই কাম্য। কিন্তু অমিত শাহ এটা বললেন না ওই একই সময়ে ডবল ইঞ্জিন উত্তরপ্রদেশে এর দ্বিগুণেরও বেশি মহিলা নির্যাতনের ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দোষীরা শুধু শাস্তি পায়নি তাই নয়, মামলা পর্যন্ত রুজু হয়নি। বরং হাতরাসের গণধর্ষণের খবরাখবর নিতে গিয়ে দু’বছরেরও বেশি জেল খেটেছেন সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান। তিনি যাতে জামিন না পান, তার জন্য বিজেপি ও রাজ্যের সরকার চেষ্টার কসুর করেনি? কী করেনি ওরা লাদাখের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া সোনাম ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে? জেলে আটকে রাখতে তাঁর বিরুদ্ধে কালা আইন ব্যবহার করতেও পিছপা হয়নি কেন্দ্র সরকার। ওড়িশায় ক্ষমতায় আসার পর দু’বছরে ধর্ষণ কী হারে বেড়েছে, একবারও বলছেন না তো। আজ ভোটের মুখে এসে বাংলাকে মৃগয়া বানানোর মিথ্যে হাতছানি! এই টোপ কতটা বিশ্বাসযোগ্য?
বিজেপি ও পরিবারতন্ত্র এবারের ভোটে প্রায় সমার্থক। সোমা ঠাকুর কোন যোগ্যতায় মনোনয়ন পাচ্ছেন বাগদায়? এটাকে পরিবারতন্ত্র বললে ভুল হবে? চেপে ধরবেন? কিংবা পূর্ব মেদিনীপুরের একটি বিশেষ পরিবার? বাঘের পিঠে সওয়ারি দলবদলু না হয় প্রাণপাত পরিশ্রম করছেন। কিন্তু তাঁর ভাইরা? একজন এমপি, অন্যজন বিধায়ক পদে প্রার্থী। কেউ যদি বলেন, এত গুছিয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা পরিবারতন্ত্র ছাড়া সম্ভব কোন রসায়নে, তার উত্তর আছে বিজেপির কাছে? একটাও টেস্ট-ওয়ান ডে না খেলে জয় শাহ আজ বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক। কোন মুখে এই দল স্বজনপোষণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে?
যে দল এ রাজ্যে ক্ষমতা দখলের খোয়াব দেখছে, তারাই নাটাবাড়িতে বাদ দিয়েছে বিদায়ী বিধায়ক মিহির গোস্বামীকে। সদ্য দলে যোগ দেওয়া গিরিজাশংকর রায়কে প্রার্থী করা হয়েছে। মিহিরবাবুর অপরাধ কী? অন্যদিকে চৌরঙ্গিতে প্রার্থী করা হয়েছে সদ্য কংগ্রেস ছেড়ে আসা সন্তোষ পাঠককে। দলে যোগ দিয়েই রাতারাতি টিকিট। কত দাম পড়ল! এর অর্থ একটাই, আপনার হাতে ২৯৪ জন প্রার্থী নেই। তাই কুড়িয়ে বাড়িয়ে জোড়াতালি তালিকা। চার বারেও যা শেষ হয় না। যদি দল ভেঙে কেউ আসে তার অপেক্ষা। আবার ময়নাগুড়িতে দুজন লড়াইয়ে। কৌশিক ও ডালিম রায়। কে শেষপর্যন্ত থাকবেন, শমীকবাবুরও অজানা। এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে টাকার বিনিময়ে টিকিট বিক্রি হয়েছে। এখনই এই অবস্থা, আপনারা কেমন সোনার বাংলা বানাবেন বেশ বোঝা যাচ্ছে।
আচ্ছা যে দল বাংলা দখলের স্বপ্ন দেখছে তার নেতারা ক’জন বাংলা ভাষাটা জানেন, আধঘণ্টা হিন্দি বর্জিত ভাষণ দিতে পারেন? আসলে বাঙালির গর্ব ও অহংকার থেকে তারা শতহস্ত দূরে। এরা হিন্দি চাপাবে। স্কুলে বাংলা ঐচ্ছিক বিষয় হয়ে যাবে। সহ্য হবে তো! দু’চারজন পোড়খাওয়া প্রার্থী ছাড়া আর সবাই কী বলবেন, কী পড়বেন, কোথায় যাবেন, সব ঠিক করে দিচ্ছেন ভিন রাজ্যের বহিরাগতরা। পানিহাটিতেও প্রচার ও প্রার্থীর ঘোরাফেরা নিয়ন্ত্রণ করছেন এক গুজরাতি। তাহলে দাঁড়াল কী! সবটাই মোদি-অমিত শাহের জুমলা। বাংলাটা দখল করে বাংলা ভাষাটাকেই শেষ করে দাও। বাঙালি সত্তাটাকেই গঙ্গায় ভাসিয়ে দাও। মেরুদণ্ড ভেঙে দাও। ভোট মিটে গেলে এইসব গুজরাতি, মারাঠি, বিহারিদের টিকি খুঁজে পাওয়া যাবে না। ৪ মে বিকেলেই পালাবে বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে।
বাংলার এই সর্বনাশ আটকাতে পারে শুধু একটা ভোট। বাংলাকে সর্বনাশের হাত থেকে বাঁচানোর সব দায় এখন আপনার। বাংলা বলা বাঙালিরাই হিন্দি বলয়ের নেতাদের এই দাপাদাপি বন্ধ করতে পারেন। ওরা বলছেন, পালটানো দরকার, কিন্তু শুধু বাংলায় কেন? পরের বছর উত্তরপ্রদেশে যখন ভোট হবে তখন একই নাড়া সমর্থন করবেন তো! চব্বিশের লোকসভা ভোটের আগে আব কি বার চারশো পারের স্লোগান দিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল গেরুয়া শিবির। বারো বছর আগের আচ্ছে দিনের খোয়াব ভেঙে যাওয়ার বেদনা আজ হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছে দেশবাসী। বাজপেয়ি জমানায় ইন্ডিয়া শাইনিংয়ের দাপাদাপি কেমন মুখ থুবড়ে পড়েছিল তার 
স্মৃতি এখনও টাটকা। বাংলার মাটিতে বহিরাগতদের এই বদলের ডাক রুখে দিন। বাংলা বাঙালির হাতে থাক। মাছে ভাতে জাতটার নিঃশ্বাস নিরামিষে আটকে যেন না যায়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ