নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: চুরির গভীরতা কতটা অতলস্পর্শী ছিল, তা প্রমাণ করতে একটা মাসই যথেষ্ট। বীরভূমের পাথর শিল্পাঞ্চলে রাজস্ব আদায়ের ‘পদ্ধতি’ বদল করতেই রাজকোষ উপচে পড়ল। তৃণমূলের আমলে পাথর থেকে মাসে যে রাজস্ব আদায় হতো, বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই সেই আদায় এক ধাক্কায় বেড়েছে অন্তত চারগুণ! চলতি বছরের নির্বাচনের ঠিক আগের মাসগুলিতে গড়ে ২০ কোটি টাকার কাছাকাছি রাজস্ব আদায় হয়েছিল। সেখানে বিজেপি জমানার প্রথম মাসেই সেই আদায় ছুঁয়েছে প্রায় ৭৩ কোটি টাকা। এখানেই প্রশ্ন উঠছে, এতদিন ধরে যাঁরা এই সিন্ডিকেট চালিয়ে কোটি কোটি টাকা রাজকোষ থেকে হাপিস করলেন, তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এখনও হচ্ছে না কেন? কবে খাঁচায় পোরা হবে সেই রাঘব বোয়ালদের?
বীরভূমের এই পাথর সাম্রাজ্যের ‘বেতাজ বাদশা’ একজনই। জেলার কয়েকশো অবৈধ খাদানের অঘোষিত মালিক তিনি। তৃণমূল জমানায় জেলার ডিসিআর (ডুপ্লিকেট কার্বন রিসিট) টোল গেটগুলোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক ছিলেন এই প্রভাবশালী। অভিযোগ, বিড়ালকে মাছ পাহারায় বসানোর মতো তাঁকেই ডিসিআর আদায়ের অলিখিত লাইসেন্স সঁপে দিয়েছিল প্রশাসন। আর এই মহা-লুটের কারবারে সমান অংশীদার ছিল ভূমিদপ্তর, পরিবহণ দপ্তর ও জেলা প্রশাসনের পদস্থ আধিকারিকদের একাংশ। অভিযোগ, তৃণমূল জামানায় প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা স্রেফ লুট হতো এই পাথর বলয় থেকে। সরকার গঠনের পরেই বীরভূমের বালি ও পাথর ব্যবসায়ে চেপে বসা সিন্ডিকেটের টুঁটি চেপে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তার পরেই জেলাজুড়ে চোরদের অলিখিত ‘রাজত্ব’ খতম হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁরই ক্যাবিনেটের মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়।
ভূমিদপ্তরের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। নির্বাচনের আগে পাথর থেকে ডিসিআর বাবদ আদায় হয়েছিল যথাক্রমে জানুয়ারিতে ২১ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ২২ কোটি ও মার্চে ১৯ কোটি টাকা। আর ভোটের মরশুমে এপ্রিলে সেই আদায় রহস্যজনকভাবে কমে দাঁড়ায় মাত্র ৯ কোটি ৮০ লক্ষ টাকায়। কিন্তু মে মাসে বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই ছক বদলে যায়। সিদ্ধান্ত হয়, কোনো মধ্যস্বতভোগী দালাল নয়, সরকার নিজে সরাসরি রাজস্ব আদায় করবে। পুলিশ, ভূমি ও পরিবহণ— এই তিন দপ্তরকে যৌথভাবে ময়দানে নামানো হয়। পাথর বলয়ের ৯টি চেক গেটে সরকারিভাবে কড়া নজরদারিতে শুরু হয় ডিসিআর সংগ্রহ। আর তাতেই একেবারে ম্যাজিক! গত ১৭ মে থেকে ১৭ জুন— মাত্র এক মাসের সরকারি নিয়ন্ত্রণে কোষাগারে ঢুকেছে প্রায় ৭৩ কোটি টাকা। মন্ত্রী জগন্নাথ সাফ জানিয়েছেন, ‘আগামী মাসগুলোতে এই রাজস্ব ১০০ কোটি টাকা ছোঁবে। মাত্র ১ মাসের মধ্যে এই ব্যবস্থার আমরা বদল এনেছি, এটাই আসল পরিবর্তন, এটাই ডবল ইঞ্জিন সরকারের ইমপ্যাক্ট।’
এখানেই শেষ নয়, এই রাজস্বের টাকা তৃণমূলের তহবিলে পাচার হতো বলেও অভিযোগ তুলেছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘একুশের বিধানসভা, তেইশের পঞ্চায়েত হোক কিংবা চব্বিশের লোকসভা— ভোটের বছরগুলিতেই পাথর থেকে প্রতি মাসে আয় অদ্ভুতভাবে কমে গিয়েছে। ১০-১২ কোটির মধ্যে। নির্বাচন না থাকলে সেই বছরে আয় আবার দ্বিগুণ হয়েছে।’ জগন্নাথবাবুর তির্যক মন্তব্য, ‘ভোটের বছরগুলিতে পাথরের গড় আয় কমে যাওয়ার একটাই মানে— অবৈধভাবে তোলা টাকা সরকারি কোষাগার এড়িয়ে সরাসরি তৃণমূলের পার্টি ফান্ডে জমা পড়েছে।’
তবে, গত এক মাসে পাথর থেকে রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে বিজেপি নেতৃত্ব নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করলেও, আসল অস্বস্তি কিন্তু কাটছে না। কোটি কোটি টাকার এই চুরির সুতো কার হাতে ছিল? লুটের টাকা কার কার পকেটে ঢুকল, তা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে কি না— সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে বীরভূমে।