নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান: কৃত্তিবাসী রামায়ণ অনুযায়ী, রাবণ ছিলেন শিবের পরম ভক্ত ও সাধক। দেবাদিদেবের আশীর্বাদে তিনি পেয়েছিলেন অসীম ক্ষমতা। তাতে তাঁর দম্ভ ও অহঙ্কার উত্তোরত্তর বাড়ছিল। সেই অহঙ্কারের বশবর্তী হয়ে অপহরণ করেছিলেন সীতাকে। ভগবান রামচন্দ্র পড়লেন বিপাকে। রাবনের হাত থেকে তো পত্নীকে রক্ষা করা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! তিনি সরাসরি মহাদেবের লোক! অনেক ভেবেচিন্তে রামচন্দ্র শরণ নিলেন প্রজাপতি ব্রহ্মার। সৃষ্টির কর্তা দেখলেন, এ তো মহা বিপদ! মহাদেবকে চটালে প্রলয় অবশ্যম্ভাবী। তিনি রামচন্দ্রকে পরামর্শ দিলেন, তুমি যদি পার্বতীকে সাধন-শক্তিতে ম্যানেজ করতে পারো, তাহলে এ বিপদ থেকে মুক্তি মিলতে পারে। তার পরের ঘটনা মোটামুটি সবারই জানা। আর একবার ঝালিয়ে নিতে চলে আসতে পারেন বর্ধমানের তেলিপুকুরে। পুজোর ক’টা দিন শহরের ভিতর তেলিপুকুর ফিরছে ত্রেতা যুগে! সৌজন্যে সুকান্ত স্মৃতি সংঘ।
হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। এবার এই ক্লাবের থিম রামায়ণ। পৌরণিক কাহিনির নানা দৃশ্য তাদের মণ্ডপ সজ্জায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বনবাসে রামচন্দ্রের কেমন কেটেছিল? সেখানকার পরিবেশ কেমন ছিল? রাবনকে জব্দ করতে পার্বতীর সাধনা কীভাবে করেছিলেন—সবকিছুই সাজানো থাকছে পর্যায়ক্রমে। এবং সবকিছুই প্রাণবন্ত। কলিযুগে থেকেও ত্রেতাযুগে ফিরে যাওয়ার এ এক সুবর্ণ সুযোগ। শিহরণ জাগবে দেহ ও মনে। আসলে, স্বয়ং ইষ্ট দেবতাদের ধ্যানমূর্তি চোখের সামনে দেখলে কার না ভালো লাগে! ফলে, সুকান্ত স্মৃতি সংঘের প্যাণ্ডেল যেন আস্ত একটা দেবভূমি।
পুজো উদ্যোক্তা তথা ক্লাবকর্তা রাসবিহারী হালদার পৌরাণিক যুগে ফেরানোর প্রস্তুতির মাঝে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, ‘এখন রামচন্দ্রকে নিয়ে একটি দল রাজনীতি করছে। অথচ, তাঁরই ‘অকালবোধান’ আজকে বাঙালির হেরিটেজ উৎসব। সেটাই আমরা মণ্ডপে ফুটিয়ে তুলেছি। লক্ষ্মণগণ্ডি থেকে স্বর্ণমৃগ— সবই দেখা যাবে মণ্ডপে। ওরা দেবতাদের নিয়ে রাজনীতি করে। আর আমরা শান্তি, ঐশ্বর্য আর উন্নতির প্রার্থনা করি।’ উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, রামায়ণের সব দৃশ্যই মণ্ডপে চাক্ষুষ করা যাবে। নজর কাড়বে প্রতিমাও। দেবী দুর্গার সামনে বসে নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো করছেন রাম। হনুমানের গন্ধমাদন পর্বত তুলে আনার দৃশ্যও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পুজোর উদ্বোধন। প্রতিবছরই এখানকার পুজো মণ্ডপ দেখতে বোধনের আগে থেকেই ভিড় উপচে পড়ে। এবারও সেটাই হতে চলেছে। মণ্ডপের সঙ্গে সামঞ্জাস্য রেখেই থাকছে আলোকসজ্জাও।
শহরের অন্যান্য পুজো কমিটি গুলির প্রস্তুতিও জোর কদমে চলছে। বর্ধমান শহরে এ বছর প্রায় ৪০টি বিগবাজেটের পুজো হচ্ছে। কেশবগঞ্জ আমরা ক’জন ক্লাব এবার তুলে আনছে এক টুকরো কাশ্মীর। তাদের থিম কাশ্মীর লেকে অন্নপূর্ণা। ভূস্বর্গের নানা দৃশ্য এখানে দেখা যাবে। ভদ্রপল্লি সর্বজনীন পুজো কমিটির থিম আলোর মহামায়া। দেবিকে প্রার্থনার দৃশ্য এই মণ্ডপও ফুটিয়ে তুলেছে। তবে, সবকিছুকে ছাপিয়ে রামচন্দ্রের ‘অকালবোধন’ নিয়ে উন্মাদনা এখন তুঙ্গে বর্ধমান শহরে। -নিজস্ব চিত্র