নিজস্ব প্রতিনিধি: নিয়োগ দুর্নীতির দাগ শুধু শাসকের গায়েই নয়! এই দোষে দুষ্ট বিরোধী বাম-বিজেপিও। তার প্রমাণ দিচ্ছে ‘অযোগ্য’ বলে ঘোষিত এসএসসির তালিকাই। দক্ষিণ থেকে উত্তরবঙ্গ, ছবি সর্বত্র অল্পবিস্তর একই। ‘অযোগ্য’ মানচিত্রে একে একে ভেসে উঠছে বর্ধমান, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর, বা উত্তর ২৪ পরগনা। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী? এঁরা কেউ ‘নিয়ম মেনে’ শিক্ষকের চাকরি পাননি। অন্তত সুপ্রিম কোর্ট, সিবিআই এবং এসএসসি সে কথাই বলছে।
যেমন বিজেপির রাজ্য নেতা পিন্টু শ্যাম। দুই বর্ধমান ও বীরভূম সাংগঠনিক জেলার যুব মোর্চার ইনচার্জ তিনি। অযোগ্যদের তালিকায় জ্বলজ্বল করছে তাঁরই দাদা সৌরভ শ্যামের নাম। সৌরভবাবু উত্তরবঙ্গের একটি স্কুলে চাকরি করতেন। পিন্টু শ্যাম বলেন, ‘সিবিআই ভালোভাবে তদন্ত করলে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে। এসবই ষড়যন্ত্র।’ এছাড়াও বর্ধমানের ম্যাপে উঠে এসেছেন মৌমিতা কুণ্ডু। তিনি নাকি এক বিজেপি নেতার বউদি। পূর্ব মেদিনীপুর ঢুকলে শোনা যাচ্ছে সৌমেন করের নাম। কে তিনি? ময়নার গোজিনা গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান। বরাবরই বিজেপি করেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলা থানার মুণ্ডুমারী ঊষানন্দ বিদ্যাপীঠে অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন। ২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ ঘিরে সিবিআই তদন্ত চলাকালীন ওই বিজেপি নেতার ওএমআর শিট ভাইরাল হয়েছিল। ৫৫টি এমসিকিউ প্রশ্নের মধ্যে তিনি দাগ কেটেছিলেন মাত্র তিনটিতে। তাতেই অঙ্কের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপত্র! মুণ্ডুমারী ঊষানন্দ বিদ্যাপীঠের টিচার ইনচার্জ দিলীপ মাইতি বলেন, ‘২০১৬ সালে এসএসসির মাধ্যমে আমাদের স্কুলে তিনজন নিযুক্ত হন। আগেই স্কুলে যোগ্যদের একটা তালিকা এসেছিল। তাতে সৌমেনবাবু বাদে বাকি দু’জনের নাম ছিল।’ সৌমেন বলেন, ‘অযোগ্য তালিকায় নাম আছে কি না দেখিনি। তবে সর্বোচ্চ আদালতের রায় বেরনোর পর স্কুলে যাচ্ছি না।’
উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়ার বিজেপি নেতা তথা দলের জেলা কমিটির সহ সভাপতি অসীমকুমার মৃধার ভাই অনুপকুমার মৃধার নামও রয়েছে অযোগ্যের তালিকায়। অসীমবাবু ২০১৬ নির্বাচনে চাকুলিয়া কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন। তাঁর ভাই অনুপবাবু ইসলামপুরের ধনতলা হাইস্কুলে ভূগোলের শিক্ষক। ১৮০৬ জনের তালিকায় ভাইয়ের নাম ওঠায় অসীমবাবু বলেন, ‘দোষীরা যে দলেরই হোক, আইন অনুযায়ী তাদের বিচার হবে। এর বেশি কিছু বলব না।’
বাতিলের তালিকায় জায়গা পেয়েছেন বিজেপির বীরভূম সাংগঠনিক জেলার কোষাধ্যক্ষ সুরজিৎ সরকারের স্ত্রী লক্ষ্মী বিশ্বাস। বাড়ি রামপুরহাট পুরসভার ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে। ২০১৬’র প্যানেল অনুযায়ী তিনি পলিটিক্যাল সায়েন্সের শিক্ষিকা হিসেবে নলহাটির কলিঠা হাইস্কুলে যোগ দেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে মিউচুয়াল ট্রান্সফার নিয়ে রামপুরহাটের কুসুম্বা হাইস্কুলে আসেন। তাঁর পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড কী? সুরজিৎবাবুর বাবা অমিয় সরকার বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাংলা, বিহার, ওড়িশা ও আন্দামানের ক্ষেত্র প্রচারক। লক্ষ্মীদেবীকে বহুবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। শিক্ষিকার স্বামী ফোনে বলেন, ‘এর মধ্যে চক্রান্ত রয়েছে।’ ‘অযোগ্য’ তালিকায় নাম রয়েছে বনগাঁর একাধিক শিক্ষকেরও। তারই মধ্যে একজন রীতেশ ঘোষ। নদীয়ার একটি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন তিনি। সিপিএমের নেতা হিসেবেও এলাকায় পরিচিতি ছিল তাঁর। যদিও রীতেশবাবুর দাবি, এখন আর দলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘কী কারণে অযোগ্য, সেটা স্পষ্ট করুক এসএসসি। আমি আদালতে যাব। আদালতের নির্দেশে যে বাগ কমিটি গঠন হয়েছিল, সেটাই এসএসসি মানেনি।’
তৃণমূলের কানাইয়ালাল আগরওয়াল বলেন, ‘বিজেপি একতরফা সরকারের সমালোচনা করে। নিজেদের ঘরে কী হচ্ছে, সে খবর রাখে না।’ তথ্যাভিজ্ঞ মহল বলছে, দুর্নীতির রং দেখাটাই অবাস্তব। এই তালিকা তার প্রমাণ। একদিকে তৃণমূলের সেটিংয়ের তত্ত্ব নিয়ে সিপিএম-বিজেপি একে অপরের বিরুদ্ধে তোপ দাগে। অথচ, চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে এই দুই দলই ‘সেটিং’ করেছে! তৃণমূলেরই একাংশ বলছে, সব পাখি মাছ খায়, দোষ হয় মাছরাঙার।