Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অধর্মের অভ্যুত্থান রোধে আবির্ভূত শ্রীচৈতন্য

আজ দোল উৎসব। গোটা ভারত রঙিন হবে হরেক রঙে। বাংলার প্রাচীন বৈষ্ণবতীর্থ নবদ্বীপও হয়ে উঠবে এক টুকরো ‘বৃন্দাবন’। তবে, এখানকার দোল উৎসব আর পাঁচটা বৈষ্ণবতীর্থের মতো নয়।

অধর্মের অভ্যুত্থান রোধে আবির্ভূত শ্রীচৈতন্য
  • ৩ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শুভজিৎ অধিকারী: আজ দোল উৎসব। গোটা ভারত রঙিন হবে হরেক রঙে। বাংলার প্রাচীন বৈষ্ণবতীর্থ নবদ্বীপও হয়ে উঠবে এক টুকরো ‘বৃন্দাবন’। তবে, এখানকার দোল উৎসব আর পাঁচটা বৈষ্ণবতীর্থের মতো নয়। এখানে রঙে-আবিরে সৌহার্দ বিনিময়—সবটাই নবদ্বীপ-নন্দন নিমাইকে ঘিরে। কিংবা বলা ভালো গৌরাঙ্গ কেন্দ্রিক। তাই, দোল বা ফাল্গুনি পূর্ণিমার আর এক নাম গৌর পূর্ণিমা। প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর আগে ঠিক এই দিনে জগন্নাথ মিশ্র ও শচীদেবীর ঘরে আবির্ভূত হয়েছিলেন বাংলার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক শ্রীচৈতন্য। তখন নবদ্বীপে ভর সন্ধ্যা। আকাশে পূর্ণচন্দ্রের বিকাশ। কিছু পরেই চন্দ্রগ্রহণ। সিংহলগ্নে শচীদেবীর কোল ঝলমল করে এল এক ফুটফুটে শিশু। মাতামহ নাম রাখলেন বিশ্বম্ভর। পরে তিনি সমাজের অচলায়তন ভাঙতে হয়ে উঠবেন বাংলার বিদ্রোহী মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্য। ভক্তি ও প্রেম নির্ভর গণঅভ্যুত্থানের নায়ক। 

Advertisement

আজ, সেই বিশ্বম্ভরের জন্মদিন। নবদ্বীপবাসীর দোল উৎসবের যাবতীয় আড়ম্বর ঘরের বিশ্বম্ভরকে বুকের বাঁদিকে রেখেই। ঘরে ঘরে স্থাপন করা হয় তাঁর বিগ্রহ। দিনভর চলে পুজোপাঠ। বিশাল অট্টালিকায় বড় বিগ্রহ, বড় আয়োজন। টিন বা টালির চালা ঘরে ছোট্ট বিগ্রহ, ছোটো আয়োজন। কোথাও গোটা একটা পাড়া মিলেমিশে আয়োজন করে গৌর বন্দনার। তৈরি করা হয় প্যান্ডেল। জন্মোৎসবে মেতে ওঠেন সকলেই। সেই পাড়ায় তখন জাতি-ধর্মের ভেদাভেদ উধাও। সবাই মহাপ্রভুর পদযুগলে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। রং-আবির মেখে গড়াগড়ি খান। এক পংক্তিতে বসে প্রসাদও গ্রহণ করেন। মঠ-মন্দিরগুলিতেও মহাপ্রভুকে নিয়ে থাকে ভক্তদের উন্মাদনা। আগত অতিথির অ্যাপায়ন। দোলের দিন বহিরাগত সবাই নবদ্বীপবাসীর একান্ত আপনজন। সকালের চা-বিস্কুট থেকে শুরু করে বিকেলের টিফিন—একেবারে নির্ভেজাল আন্তরিক আতিথেয়তা। ব্রেকফাস্টে কারও বাড়িতে লুচি, আলুর দম। কোথাও খিচুড়ি। সঙ্গে ফল-ফলাদি। দুপুরের আহারে বাড়িতে কিংবা মঠ-মন্দিরে হরেক পদে পাতপেড়ে খাওয়ানো। আবার কোনও বাড়িতে পুষ্পান্ন, পনিরের তরকারি। পেটপুরে না খাওয়া পর্যন্ত কোথাও ছাড় নেই। ঘরের ছেলের, ঘরের জামাইয়ের জন্মদিন পালন বলে কথা! তাঁর জন্মোৎসবে এসে কেউ খালি মুখে ফিরে যাক, সেটা নবদ্বীপবাসী গর্হিত অপরাধ বলে  মনে করেন। সে তুমি হিন্দু হতে পারো অথবা মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ। দোলের ক’টা দিন নবদ্বীপে এলেই তোমাকে আতিথেয়তা গ্রহণ করতেই হবে। এটা মিশ্র বাড়ির ছেলে নিমাইয়ের নিদান। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর পরও সেই সমাজ ও ধর্ম সংস্কারের নিদান অমান্য করার সাহস দেখাননি নবদ্বীপবাসী। আসলে, শ্রীচৈতন্যের বার্তা মানেই তো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ। তাঁরই ভবিষ্যদ্বাণী মেনেই আবির্ভুত হয়েছিলেন শচী-নন্দন। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, ‘যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।’ পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্। ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে। অর্থাৎ, হে ভারত, যখনই ধর্মের পতন হয় এবং অধর্মের উদয় হয়, তখন আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হই। সাধুদের পরিত্রাণ করতে, দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করতে এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে আবির্ভূত হই। গৌরের আবির্ভাবও এমনই এক ক্রান্তিকালে।
বল্লাল সেনের বাংলার হিন্দু সমাজ তখন লক্ষ্যভ্রষ্ট। উগ্র জাতিভেদ প্রথা সমাজকে ভেঙে খানখান করে দিচ্ছে। স্বার্থান্বেষী কিছু ব্রাহ্মণের আচার আচরণ আমাদের সনাতন ধর্মের গৌরবকে সমুজ্জ্বল করার পরিবর্তে তছনছ করে দিচ্ছে। তাতে অনুঘটকের কাজ করছে ইসলামধর্মের আগ্রাসন। সেন রাজবংশের সময় বাংলার অন্যতম রাজধানী ছিল নবদ্বীপ। খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বখতিয়ার খিলজি নবদ্বীপ দখল করে বাংলায় মুসলিম সাম্রাজ্য পত্তনের পথ সুগম করে। হিন্দু সমাজে অনৈক্য, খেয়োখেয়ি, সেনদের আমলে তৈরি জাতিভেদ প্রথার প্রাবল্য সহ একাধিক কারণে মুসলিম ধর্ম ক্রমেই বিকশিত হতে থাকে। স্বার্থান্বেষী ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে বীতশ্রদ্ধ হয়ে বহু হিন্দুধর্মের লোকজন ধর্মত্যাগী হন। এমনকি, অনেক ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভূতরাও স্বার্থের তাগিদে স্বধর্ম পরিহার করেন। এরপর বাংলার স্বাধীন সুলতান হিসেবে সিংহাসনে বসেন আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। সময়টা  ১৪৯৩ সাল। তাঁর আমলে রাজনৈতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা তৈরি হলেও তলে তলে ধর্মীয় অস্থিরতা চলছিল। হিন্দুধর্ম ছাড়ার প্রবণতা বেড়ে যায় অনেকটাই। তার উপর তান্ত্রিক গোষ্ঠীর ব্রাহ্মণরা দেব-দেবীর আরাধনার নামে সমাজে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করেছিলেন। বৃন্দাবন দাস সেই সময়ের সামাজিক অবস্থার ছবি আঁকতে গিয়ে বলছেন, ‘বাংলার মানুষ তখন প্রকৃত বৈদিক ধর্মের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। ধর্মকর্মের মধ্যে ছিল সারারাত জেগে মঙ্গলচণ্ডীর গীত শোনা। মদ-মাংসের মোচ্ছবের মাধ্যমে যক্ষপূজা করা। ধূমধাম করে বিষহরির পূজা করা। এসব ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণদের একটা বড় অংশ মদত জুগিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করত। ফলে প্রকৃত ধর্মের প্রতি কারও তেমন আগ্রহ ছিল না। আর পুত্রকন্যার বিয়েতে অর্থের অপচয় করা ছিল সেই সময়ের একটি ব্যাধি।’ তার পরেই বৃন্দাবন দাস লিখছেন, ‘কোনও  সন্দেহ নেই, যে সে সময়ে সমাজের মধ্যে মূঢ়তা ও উদ্দেশ্যহীন একটা মানসিকতা সবার মধ্যে তৈরি হয়েছিল। যা একদল চিন্তাশীল ও ভাবুক সম্প্রদায়কে বিচলিত করে তুলেছিল।’ ঠিক এই সময় বাংলার ধর্মীয় আকাশে নক্ষত্রের ন্যায় উদিত হয়েছিলেন নিমাই।   
বৃন্দাবন দাস বর্ণিত বাংলার সেই অধঃপতনে যাওয়া সমাজকে উত্তরণের দিশা দেখালেন নবদ্বীপে উদিত নিমাই। পরম ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হয়েও স্বার্থ নির্ভর ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন। সন্দেহ নেই, চৈতন্যদেব ছিলেন আসলে একজন তুখোড় সমাজ বিজ্ঞানী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পণ্ডিত মানুষ। তিনি বুঝেছিলেন, হিন্দুধর্মকে খাদের কিনারা থেকে তুলে আনতে হলে তার অন্যতম ধারা বৈষ্ণবধর্মকে বাংলায় রেনেসাঁর রূপ দিতে হবে। আম-জনতার সঙ্গে বৈষ্ণবধর্মের আত্মিক সংযোগ স্থাপন করতে হবে। আর সেই আত্মিক-যোগ হতে পারে ঈশ্বর সাধনায় সমাজের সকলস্তরের মানুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তাই তিনি প্রবর্তন করলেন নগরকীর্তনের। বলতে লাগলেন, ভগবানকে ডাকতে হলে উচ্চবর্ণীয় হতে হবে, তার কোনো মানে নেই। প্রেম ও ভক্তি থাকলেই সকল জাতের, সকল ধর্মের মানুষ তাঁর কৃপাপ্রার্থী হওয়ার যোগ্য। শুধু বলেই থেমে থাকলেন না, বুকে আশ্রয় দিলেন মুচি, মেথর সহ সমাজের পতিত মানুষজনকে। সবাইকে শামিল করলেন ভক্তিভাবাশ্রিত হরিনাম সংকীর্তনে। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর এই চেষ্টা ভক্তিসেনা অভ্যুত্থানের রূপ নেয় গোটা নবদ্বীপে। গেল গেল রব পড়ে যায় অতি রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ সমাজে। তাঁদের বুঝতে অসুবিধা হয় না, পণ্ডিত নিমাইয়ের এহেন ধর্মীয় উদারতা বেশ বিপাকে ফেলবে। হারাতে হতে পারে রুজিরুটিও। তড়িঘড়ি নিমাইকে দমাতে উপায় খুঁজতে থাকেন সকলে। দলবেঁধে নালিশ ঠোকেন বাংলার নবাব নিযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেট চাঁদ কাজির কাছে। তিনিও সুযোগ খুঁজছিলেন। অভিযোগ পেয়েই কঠোর পদক্ষেপ। একদিন ঘুম থেকে উঠেই নবদ্বীপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন হরিনাম। খোল-করতাল নিয়ে ঘরের বাইরে বেরলেই পাকড়াও। সঙ্গে নির্মম নির্যাতন। হার মানার পাত্র ছিলেন না নিমাই। তিনিও পালটা ডাক দিলেন কাজির প্রাসাদ ঘেরাওয়ের। সেদিন কাজিও কল্পনা করতে পারেননি, নিরস্ত্র মানুষের প্রেমের এত শক্তি! লুকিয়ে পড়লেন প্রাসাদের এক কোণে। তারপরই রচিত হল বাংলার ভক্তিবাদ আন্দোলনের নতুন অধ্যায়। প্রাণবন্ত ও গতিশীল হয়ে উঠল বৈষ্ণব সমাজের নগরকীর্তন। 
কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, বাংলার হিন্দুসমাজে চৈতন্য যুগেরও বহু পূর্বে ভগবৎপ্রেম ও ভক্তিবাদ আশ্রিত বৈষ্ণবধর্ম বিদ্যমান ছিল। রামানন্দ সম্প্রদায় কিংবা মাধ্ব সম্প্রদায়ের বৈষ্ণবরাও ছিলেন। তা সত্ত্বেও কেন চৈতন্যের সময় বাংলায় বৈষ্ণবধর্মের জনপ্রিয়তা শীর্ষে ওঠে? উত্তরে বলা যেতে পারে, তৎকালীন সময়ে সুফি মতবাদের উদার মানবপ্রেম ও সাম্যনীতির আদর্শকে যুক্ত করে চৈতন্যদেব একটি নব্য ভাববাদী ধর্মীয় দর্শনকে তুলে ধরলেন। যা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের মনের গভীরে দাগ কাটে। আর সেই কারণেই চৈতন্যদেবের প্রেমভক্তিবাদে সমাজের সব স্তরের মানুষের সমাবেশ ঘটেছিল। এতে সনাতন ধর্মে নতুন প্রাণসঞ্চার হয়। বর্ণবাদী হিন্দু সমাজ দ্বেষ-হিংসা ভুলে সৌভাতৃত্বের বন্ধনে সর্বশক্তিমান হয়ে ওঠে। তাই মধ্যযুগের ষোড়শ শতকের সময়কালকে বলা হয় চৈতন্য-নবজাগরণ। 
ক’দিন আগে খবরে প্রকাশ, বাংলায় বিশেষ একটি রাজনৈতিক দল নাকি হরিনামে ভোট বৈতরণি পেরোতে চাইছে। দলীয় বুথ কর্মীদের খোল-করতাল কিনতে টাকা-পয়সাও দেবে। ফতোয়া দেওয়া হয়েছে, নগরকীর্তন করতে হবে পাড়ায় পাড়ায়। কিন্তু যাঁদের বুকভরা বিদ্বেষ তাঁরা কি সেই বুকে ধারণ করতে পারবেন, সকল ধর্মের মানুষকে? নাকি নিছক বাংলার মহান যুগপুরুষ শ্রীচৈতন্য প্রবর্তিত নগরকীর্তনকে রাজনীতির পাকচক্রে ফেলে কালিমালিপ্ত করতে চাইছেন? প্রশ্ন থেকেই যায়। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ