বিশেষ সংবাদদাতা, শ্রীনগর: ঘড়িতে সকাল ৯টা। স্থান পহেলগাঁও বাজার। নিত্যদিন এই সময়টা ক্রেতাদের ব্যস্ততা, দোকানিদের হাঁকডাক, গুঞ্জনে ভরে ওঠে। বুধবার সেই চেনা চিত্র উধাও। দোকানে দোকানে তালা। বাজার ঘিরে অচেনা নিস্তব্ধতা। খেলে বেড়াচ্ছে কাক-পায়রার দল। মাঝে মধ্যে নীরবতা ভেঙে এগিয়ে আসছে পুলিসের গাড়ি। বিগত দিনগুলিতে বেশ কয়েকবার বন্ধ থেকেছে এই বাজার। কখনও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভয়ে, কখনও প্রশাসনিক ‘নির্দেশে’। এই প্রথম প্রতিবাদ জানাতে দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। মঙ্গলবার পহেলগাঁওয়ের এই বাজার থেকেই মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে জঙ্গিদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন পর্যটক। তাতে মন খারাপ অতিথি বৎসল কাশ্মীরিদের। সেই নৃশংস হামলার প্রতিবাদে বুধবার কাশ্মীর বন্ধের ডাক দেওয়া হয়। তাতে স্বতঃস্পূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন উপত্যকার মানুষ। ৩৫ বছরে এই প্রথম ধর্ম, সম্প্রদায়, রাজনীতি, পেশা ভুলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর।
এদিন সকাল থেকে কাশ্মীরের সমস্ত দোকান, বাজার ছিল বন্ধ। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের দরজাও খোলেনি। জম্মুর একাধিক মসজিদ থেকেও বন্ধের সমর্থন করতে আহ্বান জানানো হয়। শ্রীনগর থেকে অনন্তনাগ, সোপিয়ান থেকে বারামুলা—সর্বত্র শান্তি ও বিচারের দাবিতে পথে নেমেছেন মানুষ। কোথাও প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন তাঁরা। কোথাও আবার মোমবাতি হাতে নীরবেই হতাহতদের জন্য চোখের জল ফেলেছেন। সেইসঙ্গে সমবেতভাবে শপথ নিয়েছেন, জম্মু ও কাশ্মীর থেকে সন্ত্রাসবাদ মুছে ফেলার।
এদিন পহেলগাঁওয়ের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলি শুনশান ছিল। অতীতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হুমকিতে শ্রীনগরে বন্ধ পালিত হয়েছে। সেখানেও এদিন সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাতে এগিয়ে এসেছেন। শ্রীনগরে প্রতিবাদ মিছিল করে শাসক দল ন্যাশনাল কনফারেন্স। যোগ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লার ছেলে জামির ও জাহির। পিডিপিও বিক্ষোভ মিছিল করে। নেতৃত্বে ছিলেন দলের সুপ্রিমো তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি। মিছিলে ছিল সন্ত্রাস বিরোধী পোস্টার। কোনওটায় লেখা, ‘কাশ্মীরিদের উপরেই এই হামলা হয়েছে।’ কোনওটায় আবার ‘নিরপরাধদের হত্যালীলা বন্ধে’র দাবি জানাানো হয়েছে। মিছিল লালচকে পৌঁছেতেই বিবিধের মাঝে মিলনের এক বিরল চিত্র। ধর্ম, সম্প্রদায়, রাজনীতি ভেদে সকলেই একজোট হয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছেন। মেহেবুবা বলেন, ‘শুধু পর্যটকদের উপর হামলা হয়নি, কাশ্মীরের আত্মাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে জঙ্গিরা। রক্তপাত বন্ধ করতে হবে।’ জঙ্গি হামলার কড়া নিন্দা করেছেন হুরিয়ত কনফারেন্সের চেয়ারম্যান মিরওয়াইজ উমর ফারুক। এদিন ইসলামি পণ্ডিতদের সংগঠন এমএমইউও শান্তিপূর্ণ বন্ধের ডাক দিয়েছিল। এদিন কাশ্মীর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (কেসিসিআই)-ও শ্রীনগরের ঘণ্টাঘরে জঙ্গি হানার প্রতিবাদে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ মিছিল করেন কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া ও অধ্যাপক-শিক্ষাবিদরা।