বিশ্বকাপে সৌম্যজিতের গোল, মুগ্ধ পড়শিরা, গর্বের দিনেও আক্ষেপের সুর শ্রীরামপুরের সরকার পরিবারে
  • ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: মোবাইলের স্ক্রিনে যখন দেখেছিলেন ছেলের গোল, তখন কিছুক্ষণের জন্য থেমে গিয়েছিল তাঁর পৃথিবী। শ্রীরামপুর আর রিষড়ার সীমান্তে থাকা টালির চালের ঘরে নেমে এসেছিল অসীম নৈঃশব্দ্য। মধ্যবয়সি পাঁচুগোপাল সরকারের গলা থেকে যে উল্লাস ধ্বনি ছিটকে বেরিয়েছিল, তাতেই সম্বিত ফেরে অন্যদের। ছেলে সৌম্যজিৎ তখন বহুদূরে, পশ্চিম এশিয়া ছুঁয়ে থাকা দেশ আজারবাইজানের বাকুতে সহ খেলোয়াড়দের উষ্ণ আলিঙ্গনে ব্যস্ত। এক দরিদ্র পরিবারের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা, এক সংগ্রামী জীবনের অনন্ত নায়ক। এক কিশোরের পায়ের জাদুর মুগ্ধতা তখনও ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপের গ্যালারিজুড়ে। যদিও তার থেকে অনেক বেশি গর্বিত শ্রীরামপুরের সাতঘরার সরকার পরিবার। উল্লসিত সরকার বাড়ির প্রতিবেশীরাও।

Advertisement

একে ফুটবল, তার উপরে ভারতীয় দল। বাকুর স্টেডিয়াম ভারতের, লাওসকে ৪-২ গোলে হারানোর কাহিনি অনেকেই জানতেন না। তবু শ্রীরামপুরের সাতঘড়ার নাম সেই জয়ের উজ্জ্বল কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ায় এলাকায় উল্লাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। কারণ একটাই, সৌম্যজিৎ সরকার। সাতঘড়া হাইস্কুলের নবমের ছাত্র। দেশের অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল দলের ডিফেন্ডার। ওভারল্যাপ করে বিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে গোলার মতো শটে গোল করে আপাতত সাতঘড়ার সাতরাজার ধন এক মানিক, সৌম্যজিৎ। পাড়ার ছেলের সাফল্য নিয়ে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিলেন সূর্যকান্ত, সৌম্যজিতের প্রতিবেশী। বলেন, ও অনেক লড়াই করেছে। ওর জন্য আমরা গর্বিত বললেও কম বলা হয়। ছোটো থেকে ফুটবলই ওর পৃথিবী। সাধারণ বেসরকারি সংস্থার কর্মী বাবা পাঁচুগোপাল আপ্রাণ চেষ্টা করেও ছেলের সব প্রয়োজন মেটাতে পারেননি। আজ ছেলের সাফল্যে গর্বের সঙ্গে ঝরে পড়ে আক্ষেপও। বলেন, ওর জন্য বিশেষ কিছু করতে পারিনি। ও যা হয়েছে, তা শুধু নিজের প্রতিভায়।
সেই প্রতিভা আর লড়াইয়ের কাহিনি মতি নন্দীর উপন্যাসের মতো। কিন্তু বাস্তব। তার ফুটবল দক্ষতা চিনতে ভুল করেননি কোচ শান্তনু দেব। তিনিই গড়েপিটে দিয়েছিলেন এক দরিদ্র বালককে। বলেন, বরাবর পরিশ্রমের দর্শনে বিশ্বাসী সৌম্য। সেটাই তার সাফল্যের মূলকথা। তিন বছর আগে পাড়াগাঁয়ের ছেলে পরিশ্রমের জোরেই জায়গা করে নিয়েছিল এফসি মাদ্রাজে। তারপরেই তার উল্কাসম উত্থান। গত ১৫ আগস্ট জুনিয়র জাতীয় দলের ট্রায়ালের জন্য ডাক আসে এবং নির্বাচিত হয়। প্রথম থেকেই প্রথম একাদশে জায়গা পাকা করে নেয় শ্রীরামপুরের সৌম্যজিৎ। রবিবার ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপের তৃতীয় ম্যাচ দেখতে সাতঘড়ার অপরিসর ঘরে ভেঙে পড়েছিল ভিড়। মুগ্ধ চোখে জীবনে প্রথমবার ‘ভরা’ ঘর দেখছিলেন পুষ্পাঞ্জলি, জাতীয় খেলোয়াড়ের মা। থেকে থেকে শাড়ির খুঁট দিয়ে চোখ মুছছিলেন। তারপরেই মোবাইলের পর্দায় খুঁজছিলেন একটি পা, একটি সরল মুখ আর স্বপ্নমাখা চোখ দু’টিকে।