শ্রীমদ্ভাগবতে শ্রুতিরা অর্থাৎ মূর্তিমান বৈদিক মন্ত্ররা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে বলছেন, “হে পরম প্রিয় ভগবান। দিব্যজ্ঞান লাভ করা অত্যন্ত কঠিন। এই অত্যন্ত কঠিন জ্ঞান দান করার জন্যই আপনি আপনার স্বরূপে এখানে অবতীর্ণ হয়েছেন। সেই জন্যই আপনার ভক্তরা পরমহংস আচার্যদের সঙ্গ লাভ করার জন্য গৃহসুখ ত্যাগ করেছেন। তাঁরা এখন ভক্তিযোগে সম্পূর্ণরূপে আপনার সেবায় যুক্ত হয়েছেন এবং তাই তাঁরা আর তথাকথিত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা করেন না।”এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে, আত্মজ্ঞান লাভ করার অর্থ হচ্ছে আত্মাকে জানা এবং পরমাত্মা বা ভগবানকে জানা। আত্মা ও পরমাত্মা গুণগতভাবে অভিন্ন এবং সেই জন্যই উভয়কে ব্রহ্ম বলে সম্বোধন করা হয়। সেই আত্মজ্ঞান লাভ করা অত্যন্ত কঠিন। কত বড় বড় দার্শনিকেরা আত্মাকে জানার চেষ্টা করছেন, কিন্তু সেই জ্ঞান লাভের পথে তাঁরা মোটেই অগ্রসর হতে পারছেন না। ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে, লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে কেবলমাত্র একজন এই জ্ঞান লাভের চেষ্টা করেন এবং এই রকম লক্ষ লক্ষ জ্ঞানলাভেচ্ছু মানুষের মধ্যে কেবল দুই-একজন মাত্র যথাযথভাবে ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে পারেন। তাই এই শ্লোকে বলা হয়েছে যে, আত্মজ্ঞান লাভ করা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু তা সহজলভ্য করার জন্য পরমেশ্বর ভগবান তাঁর কৃষ্ণস্বরূপে অবতীর্ণ হন, এবং ব্যক্তিগতভাবে অর্জুনের মতো পার্ষদকে এই জ্ঞান দান করেন, যাতে জনসাধারণ এই জ্ঞান লাভ করতে পারে। এই শ্লোকে আরও বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, মুক্তির অর্থ হচ্ছে সব রকম জড়-জাগতিক সুখভোগের স্পৃহা পরিত্যাগ করা। যারা নির্বিশেষবাদী তারা কেবল জড় পরিবেশ থেকে মুক্ত হয়েই সন্তুষ্ট থাকে, কিন্তু ভগবদ্ভক্ত অপ্রাকৃত স্তরে অধিষ্ঠিত হয়ে ভগবানের অপূর্ব মাধুর্যমণ্ডিত লীলা শ্রবণ ও কীর্তন করে দিব্য আনন্দে মগ্ন হন, তখন জড় বন্ধন থেকে অনায়াসে মুক্তি লাভ হয়।



