শ্যামল সেন, হলদিয়া: শিল্প দুর্ঘটনা এড়াতে অতি দাহ্য তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন বসানো এবং সুরক্ষার জন্য নতুন নিয়মনীতি তৈরি হচ্ছে হলদিয়া শিল্পাঞ্চলে। সমস্ত পেট্ররাসায়নিক শিল্প সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে হলদিয়ার প্রশাসন শিল্প সুরক্ষা ও বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর(এসওপি) তৈরি করছে। একাজে রেডার স্ক্যানারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে হলদিয়ার পাইপলাইন মানচিত্র। মঙ্গলবার হলদিয়ায় প্রশাসন ও শিল্প সংস্থাগুলির সমন্বয়ে গঠিত রাইট অব ওয়ে(আরওডব্লু) কমিটির মিটিংয়ে ওই সিদ্ধান্ত হয়েছে। হলদিয়া অগ্নিকাণ্ডের প্রেক্ষিতে জেলাশাসকের নির্দেশে তৈরি হয়েছে ওই কমিটি। গত ৩০ জুন হলদিয়ায় পাইপলাইনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২০ জন অগ্নিদগ্ধ হন। এদের মধ্যে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরপরই জরুরি ভিত্তিতে শিল্পাঞ্চলের ইমারজেন্সি অফসাইট প্ল্যান তৈরির জন্য জেলা ক্রাইসিস কমিটির মিটিং হয়। গত ৭ জুলাই ওই মিটিংয়ে আরওডব্লু কমিটি তৈরি হয়। ওই কমিটির মাথায় রয়েছেন হলদিয়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের(এইচডিএ) চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার বিবেক দত্তাত্রেয় ভস্মে। এদিন তাঁর নেতৃত্বে আরওডব্লু কমিটির প্রথম মিটিং হয়েছে।
ওই মিটিংয়ে মহকুমাশাসক সুরভি সিংলা, এসডিপিও অলোক কুমার, কমিটির সদস্য সচিব তথা অ্যাসিস্ট্যান্ট ডাইরেক্টর অব ফ্যাক্টরিজ দেবায়ন দে ও ১৬টি শিল্প সংস্থার আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। হলদিয়ায় এইচডিএ অফিসে ওই মিটিং হয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়া ও কোলাঘাটে শিল্প দুর্ঘটনা এড়াতে যে ইমারজেন্সি অফসাইট প্ল্যান তৈরি হচ্ছে, এদিনের সিদ্ধান্তগুলি তার প্রথম ধাপ বলে জানান আধিকারিকরা। তাঁরা বলেন, রাইট অব ওয়ে কমিটির কাজ হল শিল্পাঞ্চলের সুরক্ষা ও নিরাপত্তায় একটি অভিন্ন নীতি তৈরি করা। হলদিয়া রাজ্য তথা পূর্বভারতের বৃহত্তম পেট্রকেমিকেল হাব হিসেবে পরিচিত। অতিদাহ্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ হাইড্রো কার্বন জাতীয় পণ্য নিয়ে উৎপাদন ও সরবরাহের কাজ করে ১৬টি সরকারি ও বেসরকারি শিল্প সংস্থা। একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজ্যে এই প্রথম কোনো শিল্পাঞ্চলে এধরনের এসওপি তৈরি হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। হলদিয়ায় মূলত বন্দর, এইচডিএ ও পুরসভার জমির উপর দিয়ে বিভিন্ন শিল্প সংস্থার বাইরের পাইপলাইন বসানো হয়েছে।
এক আধিকারিক বলেন, প্রতিটি সংস্থা এতদিন পাইপলাইন বসানোর সময় আলাদা করে অনুমতি দিত। ওই লাইন কোথাও মাটির তলায় ৩ মিটার নীচে, কোথাও আবার দেড়-দু’ মিটার নীচে। এরফলে কোথায় কীভাবে লাইন রয়েছে তা সবার জানা থাকে না। তাছাড়া তেল ও গ্যাস সংস্থাগুলিকে কেন্দ্র সরকারের অয়েল ইন্ডাস্ট্রি সেফটি ডাইরেক্টরেট(ওআইএসডি) এবং পেসো›র অনুমোদন এবং নিয়ম মেনে ওই লাইন বসাতে হয়। প্রশাসনের কাছে ওই পাইপলাইন সংক্রান্ত কোনও নির্দিষ্ট মানচিত্র এতদিন ছিল না। ফলে গ্যাস লিকেজ বা অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা শুধু নয়, শহরে উন্নয়নের কাজের সময় কোথায় কোন পাইপলাইন রয়েছে তা নিয়ে সমস্যা হতো। বিভিন্ন শিল্প সংস্থা প্রায়ই একে অপরের বিরুদ্ধে লাইন নষ্ট হওয়া নিয়ে অভিযোগ করে। কোনো সংস্থার কাছে সঠিক পাইপলাইনের মানচিত্র না থাকায় সমস্যা হয় বলে জানান আধিকারিকরা। এইচডিএ চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার বলেন, আমাদের আরওডব্লু কমিটি একটি বিশেষজ্ঞ টিম তৈরি করছে। ওই টিম পাইপলাইন নিয়ে একটি একটি এসওপি বা আদর্শ নির্দেশিকা তৈরি করবে। ১৫দিনের মধ্যে ওই নির্দেশিকা তৈরির চেষ্টা চলছে। সেই এসওপি মেনেই আগামীদিনে হলদিয়ায় পাইপলাইন বসানো বা কাজকর্মের অনুমোদন দেবে। এজন্য শিল্প সংস্থাগুলি তাদের ক্রস কান্ট্রি বা কারখানার বাইরের পাইপলাইনগুলির ড্রয়িং জমা দিয়েছে। নতুন পাইপলাইন বসানোর জন্য নিয়ম যেমন কড়াকড়ি হচ্ছে, তেমন পুরনো পাইপলাইনে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।