‘‘অসীম অনন্ত ভাবসিন্ধু ভগবান নরলীলা করিতে পুনরায় জগৎমঞ্চে অবতীর্ণ হইয়াছেন। ... পুরুষোত্তম ভগবানের নরলীলা অভিনয়ে পরিকরগণ তাঁহার প্রধান অবলম্বন। একাকী খেলা জমে না। লীলারণে দরকার সাঙ্গোপাঙ্গ। তাঁহার শুদ্ধসত্ত্ব মানসপুত্র রাখালকে লইয়া যশোদারূপী শ্রীরামকৃষ্ণের লীলাবিলাসে বাৎসল্যরসের সম্ভোগ ঘটিয়াছে, অপরদিকে মাতাপুত্রের এই সুমধুর সম্পর্ক মাতৃভাব প্রবৃদ্ধ যুগধর্ম প্রবর্তনে সাহায্য করিয়াছে। শ্রীরামকৃষ্ণের মানসপুত্র রাখাল-রামকৃষ্ণসত্ত্বারই প্রতিফলন। শ্রীরামকৃষ্ণের আদরের ধন রাখাল চিরবালক— তিনি মুমুক্ষুজনের সদ্গুরু, তিনিই ত্রিতাপদগ্ধ সংসারবাসীর লোকগুরু, আবার তিনিই রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের কর্ণধার।’’
শ্রীরামকৃষ্ণের মানস-পুত্র এবং ভক্ত বলরামের পরিবারবর্গের পরম-আত্মীয় স্বামী ব্রহ্মানন্দের শুভ পদার্পণে কোঠার ধন্য হইয়াছে। তিনি কোঠারে একাধিকবার গমন করিয়া ও তথায় গভীর তপস্যায় নিরত থাকিয়া তাহাকে পুণ্যতীর্থে উত্তীর্ণ করিয়াছেন। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ২৮ নভেম্বর স্বামী ব্রহ্মানন্দ প্রথম কোঠারে আগমন করেন, কিন্তু কোঠারের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য সম্যক্ উপলব্ধি করিতে হইলে স্বামী বিবেকানন্দের মহাসমাধির পরবর্তী কালের ঘটনাবলি সংক্ষেপে স্মরণ করা আবশ্যক। প্রিয়তম গুরুভ্রাতা স্বামী বিবেকানন্দের তিরোধানেং বিয়োগব্যথা সম্বরণ করিতে যথেষ্ট আয়াস ও সময়ের প্রয়োজন ছিল সন্দেহ নাই, কিন্তু ক্রমবর্ধমান ধর্মসঙ্ঘের পরিচালনের কঠিন দায়িত্ব সঙ্ঘনায়কের অন্তরের সকল ব্যথা সাময়িকভাবে যেন দূরে ঠেলিয়া রাখিল। স্বামীজীর মহাপ্রয়াণের মর্মান্তিক সংবাদে দেশবিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত হইতে অসংখ্য শোকবাণী আসিতে লাগিল, নিকটদূর হইতে রামকৃষ্ণ-ভক্তবৃন্দ মঠে আসিলেন অন্তরের অশান্তি লাঘব করিবার জন্য, দেশের নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যক্তিগণ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিতে আসিলেন, সেইসঙ্গে শোকাগ্নিতে দগ্ধ অখণ্ডানন্দ, তুরীয়ানন্দ প্রভৃতি অন্তরঙ্গগণ দিশাহারা হইয়া ছুটিয়া আসিলেন। মহারাজ সমবেত সকলকে তাঁহার প্রশস্ত বক্ষে ঠাঁই দিলেন, অন্তরঙ্গদের দিলেন সান্ত্বনার বাণী, অকাতরে দান করিলেন সর্বরোগহর প্রেম। মঠবাসিগণ আশ্বস্ত হইলেন, ক্রমে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়া পাইলেন এবং স্বামীজীর আরব্ধ কার্যসূচি নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী পালনের সংকল্প গ্রহণ করিলেন। তাঁহাদের ভবিষ্যতের কর্মসূচি নিরূপণের জন্য তাঁহারা একে একে মহারাজের মুখাপেক্ষী হইলেন। ... জ্যেষ্ঠ পুত্রের অকাল-পরলোকগমনে শোকাহত স্বামীজীর জননীকে সান্ত্বনা দিবার কঠিন দায়িত্বও গ্রহণ করিলেন মহারাজ। ....কলিকাতার যুবকদের মধ্যে স্বামীজীর ভাবধারা প্রচারের জন্য ভগিনী নিবেদিতা কিছু সংখ্যক যুবকের মধ্যে কাজ করিতে ছিলেন। উৎসাহী যুবকদের লইয়া একটি অরাজনৈতিক সংস্থা গড়িয়া তুলিবার ইচ্ছা হইল স্বামী ব্রহ্মানন্দ ও সারদানন্দজীর।
স্বামী শিবপ্রদানন্দ সম্পাদিত ‘শ্রীমা সারদা ও তপোভূমি কোঠার’ থেকে