বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতিমদের শতবর্ষ উদযাপন। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁদের ছবির রেট্রোস্পেক্টিভ দেখা যাবে। উৎসব শুরুর আগে ফিরে দেখা কিংবদন্তিদের। সলিল চৌধুরীকে নিয়ে লিখছেন সোমনাথ বসু।
বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতিমদের শতবর্ষ উদযাপন। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁদের ছবির রেট্রোস্পেক্টিভ দেখা যাবে। উৎসব শুরুর আগে ফিরে দেখা কিংবদন্তিদের। সলিল চৌধুরীকে নিয়ে লিখছেন সোমনাথ বসু।
সলিল শব্দের মানে জল। স্বচ্ছ অথচ গভীর। এবং তাঁর মিউজিক নামের সঙ্গে যথেষ্ট সঙ্গতিপূর্ণ। মূলত পিয়ানো অ্যাকোর্ডিয়ান, ভায়োলিন, ম্যান্ডোলিন, বাঁশি ও এস্রাজের ব্যবহারে তিনি অতুলনীয়। নিজে কবি বা গীতিকার ছিলেন বলেই হয়তো গান কম্পোজের সময় সুরের চলনের পাশাপাশি একইভাবে প্রাধান্য পেত লিরিক্স। মাটি এবং মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগই সলিলের ইউএসপি। গান কম্পোজের সময় তিনি বারবার নিজেকে ভেঙেছেন। আর এটাই শিল্পের অন্যতম সংজ্ঞা। শতবর্ষের আলোয় আলোকিত এই কম্পোজার আমাদের সুরের ঝরনায় ভাসিয়ে দিয়েছেন।
১৯২৫’এর ১৯ নভেম্বর দক্ষিণ ২৪ পরগনার গাজিপুরে জন্ম। শৈশব কেটেছে অসমের কাজিরাঙায়। সবুজে ঘেরা চা-বাগানের মধ্যে শ্রমিকদের জীবনযাপনের মধ্যেই তাঁর বড় হয়ে ওঠা। শোনা যায়, অসমের বিশেষ বাঁশি ‘বনহি’ সেই সময় ছিল সলিলের প্রিয় যন্ত্র। পরে কলকাতায় ফিরে স্কুল ও কলেজ সম্পূর্ণ করেন তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ করার সময় আইপিটিএ’র প্রেমে পড়া। তাঁর সৃষ্টি ‘বিচারপতি’, ‘রানার’, ‘অবাক পৃথিবী’ তখন লোকের মুখে মুখে ফিরছে। কিন্তু গণনাট্য সংঘের যে সবকিছুই তাঁর ভালো লাগত, এমনটা নয়। প্রতিবাদের জন্য বেছে নিয়েছিলেন প্রিয় সঙ্গী গানকেই। ‘পথ হারাবো বলেই এবার পথে নেমেছি’ গানটা এই কারণেই লেখা এবং সুর করা। ‘নিষেধের পাহারাতে ছিলেম রেখে ঢেকে...’ মধ্যে দিয়ে সলিল বলতে চেয়েছেন পদে পদে সিনিয়রদের বারণের কথা। নিজের মুখে বলেওছেন সেকথা, ‘এটা করবে না, ওটা করতে নেই, ওটা বুর্জোয়া— শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে যেত। রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া, নজরুলও তাই? তাহলে একমাত্র উদার তোমরাই না কমরেড’!
১৯৪৯- এ প্রথম বাংলা ছবির সুরকারের ভূমিকায় দেখা গেল তাঁকে। নাম, ‘পরিবর্তন’। বছর চারেক পর বোম্বে অধুনা মুম্বইয়ে তাঁর প্রথম ছবি ‘দো বিঘা জমিন’। সলিলের ‘রিকশাওয়ালা’ গল্পটি অনুবাদ করেছিলেন পরিচালক বিমল রায়। এই ছবির ‘ধরতি কহে পুকার কে’ গান ছড়িয়ে পড়ল আসমুদ্রহিমাচল। আর ভারতীয় বাণিজ্যিক সঙ্গীতের আকাশে জন্ম নিল এক তারা, সলিল চৌধুরী। এরপর তাঁকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। বাংলা, হিন্দি ছাড়া আরও ১১টি ভাষায় কাজ করেছেন তিনি। গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক এবং পরিচালকের ভূমিকায় তাঁর অবদান সোনার অক্ষরে লেখা রয়েছে। মাল্টি ট্যালেন্টেড বলতে যা বোঝায় সলিল ছিলেন ঠিক তাই। ৩১তম কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে তাঁকে বিশেষ শ্রদ্ধা জানাতে প্রদর্শিত হবে ‘দো বিঘা জমিন’।
বোম্বেয় নিজের বাড়িতে একবার কিশোর কুমারকে ডেকেছেন সলিল। সোফায় বসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান শোনাচ্ছেন ‘অন্নদাতা’ ছবির মিউজিক ডিরেক্টর। ‘গুজর যায়ে দিন দিন দিন/ কি হর পল গিন গিন গিন।’ হঠাৎই দুম করে সোফা থেকে মাটিতে পড়ে গেলেন কিশোর। বলে উঠলেন, ‘দাদা, এই গান আপনার সঙ্গে এক সোফায় বসে শোনা সম্ভব নয়। আপনি গেয়ে চলুন, আমি মাটিতে বসেই শুনছি।’ সাধে কি আর সলিলের মৃত্যুতে (৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫) নৌশাদ সাব বলেছিলেন, ‘ফ্রম আওয়ার সেভেন নোটস, ওয়ান ইজ নো মোর।’