Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সময়ের দাবি

সময়ের দাবি
  • ২৬ নভেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবির পর তাদের সম্পর্কে বোধহয় আসল কথাটা বলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রাহুল গান্ধীর দলকে ‘পরজীবী’ আখ্যা দিয়ে তাঁর টিপ্পনি, কংগ্রেস নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আঞ্চলিক দলগুলিকে ব্যবহার করছে। গত এপ্রিল-মে মাস জুড়ে চলা লোকসভা ভোটে ৯৯টি আসন দখল করে (২০১৯-এ ছিল ৫২টি) সর্বভারতীয় এই দলটি বোঝাতে চাইছিল, বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটে তারাই ‘বস’। বিজেপি’র বিরুদ্ধে এই দলই একমাত্র শক্তি, যারা হিন্দুত্ববাদীদের গদি থেকে উৎখাত করতে পারে। কিন্তু তা যে নিতান্তই ভ্রম, অক্ষমের প্রলাপ, লোকসভার পর হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্র বিধানসভা ভোটের ফল তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। এবং আরও একবার এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হল যে, বিজেপি’র সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ের ময়দানে সর্বভারতীয় খ্যাত কংগ্রেস দল পায়ের নীচে জমি খুঁজে পাচ্ছে না। এই সময়ে জম্মু-কাশ্মীর, ঝাড়খণ্ড যেখানে যেটুকু প্রাপ্তি তার সবটাই এসেছে জোট শরিক আঞ্চলিক দলগুলির কাঁধে চেপে। এই বাস্তব ছবিকে সামনে রেখে বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরে আরও একবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উঠে এসেছে। ইতিহাসের পাতা উল্টানোর দরকার নেই, সাম্প্রতিক অতীতের যে কোনও নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকালেই দেখা যাবে, আরএসএস-বিজেপিকে রুখতে একশো শতাংশ সফল হয়েছেন মমতা। ২০২১-এর বিধানসভা অথবা ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে এ রাজ্যের শাসক মমতার দলকে হারাতে কার্যত ‘ডেলি প্যাসেঞ্জারি’ করেছেন নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরা। রাজনৈতিক কুৎসার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের টাকা আটকে রাজ্যকে ভাতে মারার চেষ্টা হয়েছে। এই সরকারকে বিপাকে ফেলতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবু সাত মন তেলও পোড়েনি রাধাও নাচেনি। বরং সদ্য অনুষ্ঠেয় উপ নির্বাচনে দেখা গেল বিজেপি আরও শক্তি খুইয়েছে। সঙ্গত কারণেই মমতাকে বিরোধী জোটের ‘মুখ’ করার দাবি উঠেছে। বিজেপিকে হারাতে ‘মমতা মডেল’ অনুসরণ করুক বিরোধীরা— এমনটা চাইছে তৃণমূলও।
Advertisement
প্রশ্ন উঠেছে, শুধুমাত্র সর্বভারতীয় দলের তকমা থাকায় কংগ্রেস কেন বিরোধী জোটের নেতৃত্বে থাকবে? সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাচনই শেষ কথা। ‘ইন্ডিয়া’ জোট তৈরি হয়েছেও সেই লক্ষ্যে। এ রাজ্যে কংগ্রেস বহুকাল ‘সাইনবোর্ডে’ পরিণত হয়েছে। কিন্তু গোটা দেশেও কি বলার মতো কোনও সাফল্য কংগ্রেসের আছে? গত লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের আসন বেড়েছে ঠিক কথা, কিন্তু সেটাও ৩০০-র বেশি আসনে লড়াই করে জুটেছে ৯৯টি আসন। এটাকে কংগ্রেস দল তাদের ‘সাফল্য’ হিসাবে দেখাতে চাইলেও ঘটনা হল, লোকসভার আগে পরে একাধিক রাজ্যের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেস সরকার গড়তে ব্যর্থ হয়েছে। রাজস্থান, ছত্তিশগড় দুটি রাজ্যই তাদের হাতছাড়া হয়েছে। মধ্যপ্রদেশে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে লড়ে মুখ পুড়েছে বিজেপি’র কাছে। লোকসভায় মোদি কোনওক্রমে সরকার গঠন করায় ধারণা করা হয়েছিল হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্র বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সাফল্য শুধু সময়ের অপেক্ষা। বিশেষত নানা কারণে মোদির দল ওই দুই রাজ্যে সুবিধা করতে পারবে না বলেই মনে করেছিল অনেকে। দুই রাজ্যে সাফল্যের ব্যাপারেও নিশ্চিত ছিল কংগ্রেস। কিন্তু ভোটের ফলাফলে দেখা গেল, ৯০ আসনের হরিয়ানা বিধানসভায় ৩৭টি আসন পেয়ে বিজেপি’র কাছে হেরেছে রাহুলের দল। আর ২৮৮টি আসনের মহারাষ্ট্র বিধানসভায় ১০১টিতে লড়ে কংগ্রেস জয় পেয়েছে মাত্র ১৬টি আসনে। যে বিদর্ভ কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত, সেখানে ৬২টি আসনে লড়ে কংগ্রেস জয় পেয়েছে মাত্র ৮টি আসনে। এই ফলাফলের পর আক্ষরিক অর্থেই কংগ্রেসের মুখ লুকানোর জায়গা নেই।
অন্যদিকে, ২০২১-এর বিধানসভা, ২০২২-এর পুরসভা, ২০২৩-এর পঞ্চায়েত, ২০২৪-এর লোকসভা এবং গত চার মাসে ১০টি কেন্দ্রের উপ নির্বাচন— সরাসরি লড়াইয়ে বিজেপিকে বলে বলে গোল দিয়েছে মমতার দল তৃণমূল। শেষ উপ নির্বাচনে ৬টি আসনের মধ্যে ২টিতে মোদির দলের জামানতও বাজেয়াপ্ত হয়েছে। শুধু এ রাজ্যেই নয়, জম্মু-কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্স, ঝাড়খণ্ডের জেএমএম, দিল্লি-পাঞ্জাবে আপ-ও বিজেপিকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়েনি। এর একটাই ব্যাখ্যা, তা হল বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের মূল শক্তি আসলে আঞ্চলিক দলগুলিই। বিজেপি’র বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কংগ্রেস নয়, আঞ্চলিক দলগুলি যে মোদি-শাহদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে তা প্রধানমন্ত্রীর ওই কথাতেই পরিষ্কার। এই সাফল্যের সবচেয়ে বড় দাবিদারের নাম অবশ্যই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধী জোটের নেতৃত্ব তাঁর চওড়া কাঁধেই সমর্পণ করা উচিত। তিনি একমাত্র যোগ্য বিকল্প হতে পারেন। এটাই আজকের সময়ের দাবি।
সম্পর্কিত সংবাদ