Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

ঘুমিয়ে আছেন নির্জনে

প্রয়াগরাজে মহাকুম্ভে যাচ্ছিলাম গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড অর্থাৎ বর্তমানের উনিশ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে

ঘুমিয়ে আছেন নির্জনে
  • ১৭ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত: প্রয়াগরাজে মহাকুম্ভে যাচ্ছিলাম গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড অর্থাৎ বর্তমানের উনিশ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে। যাত্রাপথে যে জায়গাতে বেশ কয়েক ঘণ্টা জ্যামে আটকে পড়েছিলাম সে জায়গা হল বিহারের সাসারাম। সে জায়গায় পৌঁছে আমার বারবারই মনে হচ্ছিল, এ জায়গার একটি বিশেষ স্থান মাহাত্ম্য আছে। তবে সেটা যে কী তা জানা থাকলেও তা সে সময় কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না। হয়তো বা দীর্ঘক্ষণ ধরে তপ্ত দুপুরে গাড়ির মধ্যে বসে থাকা, জ্যাম কখন খুলবে, সঠিক সময় প্রয়াগরাজে পৌঁছতে পারব কি না এবং আমার ভ্রাতৃসম চালক বন্ধু সুপ্রিয় শর্মার অবিশ্রান্ত, উৎকণ্ঠিত কথা, এসব মিলিয়ে মিশিয়ে আমার মাথার ভিতরে জট পাকিয়ে গিয়েছিল। জানা জিনিসটাও আমার ঠিক মনে পড়ছিল না। কার যেন নাম জড়িয়ে আছে এ জায়গার সঙ্গে?

Advertisement

শেষ পর্যন্ত অবশ্য নির্দিষ্ট সময়েই আমরা প্রয়াগরাজে পৌঁছতে পেরেছিলাম। অবগাহন করতে পেরেছিলাম মহাকুম্ভে। তারপর একদিন বেনারসে কাটিয়ে পরদিন আবার যাত্রা শুরু করেছিলাম একই পথ ধরে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ধরে ফেরার জন্য। শরীরে কিছুটা ক্লান্তি থাকলেও মানসিকভাবে আমরা সবাই উৎফুল্ল আমাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে বলে। সাসারামের কিছুটা আগে রাস্তার পাশে একটা ধাবায় চা-পান করতে দাঁড়িয়েছি। সেখানে একটা মাইল ফলকে দেখলাম লেখা আছে সাসারামের দূরত্ব দশ কিলোমিটার। ধাবাটা অনেক পুরনো। তার বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সাইনবোর্ডে আরও একটা লেখা দেখতে পেলাম— ‘গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড’। যে ব্যাপারটা কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না, সেটা মুহূর্তেই মনে করিয়ে দিল ইতিহাস বইতে পড়া একটা নাম— ‘শেরশাহ সুরি’। গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডের সংস্কার সাধন সহ নানা প্রজাকল্যাণকর কাজ করেছিলেন তাঁর রাজত্বকালে। যাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হুমায়ুনও যে কারণে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবনত হয়ে বলেছিলেন, ‘সম্রাট শেরশাহ ছিলেন সম্রাটদের শিক্ষক। প্রজাকল্যাণের জন্য প্রত্যেক সম্রাটেরই শেরশাহর কাজকে অনুসরণ করা উচিত।’ চিরশত্রুর কাছ থেকে এমন প্রশংসাসূচক বাক্য খুব কম রাজা-সম্রাটের ভাগ্যেই জুটেছিল। হ্যাঁ, তিনি সম্রাট শেরশাহ। আর তিনি ঘুমিয়ে আছেন এই সাসারামেই। সাসারামেই তাঁর সমাধিসৌধ।
ব্যাপারটা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হল ইতিহাস স্পর্শ করার সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। একটু ইতস্তত করে সুপ্রিয়কে কথাটা বলতেই সে সাগ্রহে রাজি হয়ে গেল। বলল, ‘কোনও চিন্তা নেই। এত কাছে যখন এসেছি, তখন নিশ্চই সে জায়গা অবশ্যই দেখে যাব। যে রাস্তা ধরে আমরা মহাকুম্ভ দর্শন করে এলাম তার নির্মাতাকে অবশ্যই একবার শ্রদ্ধা জানিয়ে আসব।’
গাড়ি এগতে শুরু করল বর্তমান উনিশ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে। যার চলতি নাম গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড। পৃথিবীর প্রাচীনতম রাস্তাগুলির মধ্যে এটি একটি। একসময় এ রাস্তা পরিচিত ছিল ‘উত্তরাপথ’ নামে। প্রায় হাজার বছরের প্রাচীন রাস্তা। মায়ানমার থেকে শুরু করে যে পথ ভারতের নানা জনপদকে অতিক্রম করে অধুনা পাকিস্তান হয়ে কাবুল, কান্দাহার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। একসময় উত্তরাপথ পথ ধরে রথচক্রতে চলেছিলেন সম্রাট অশোক। তাঁরও আগে এই উত্তরাপথে ভিক্ষাপাত্র হাতে পরিক্রমা করতেন গৌতম বুদ্ধ। সে অর্থে শেরশাহ সুরিকে এ রাস্তার নির্মাণ কর্তা বলা যায় না। সম্রাট হিসাবে তাঁর রাজত্বকালের আয়ুই তো ছিল মাত্র পাঁচ বছর। তিনি যে কাজটি করেছিলেন, তা হল এ পথের সংস্কার সাধন। এ পথের বেশ কিছু অংশ অব্যবহারের ফলে জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়েছিল, বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল অন্য অংশের সঙ্গে। শেরশাহ সে সব স্থানকে জঙ্গলমুক্ত করে এই প্রাচীন পথের সংস্কার সাধন করেন, স্থানে স্থানে পাকা সড়ক নির্মাণ করান, পথচারীদের পানীয় জলের সমস্যা সমাধানের জন্য কূপ খনন করান, মাথা গোঁজার জন্য রাত্রিবাসের স্থান নির্মাণ করান। দস্যু-তস্করদের হাত থেকে পথচারীদের রক্ষা করার জন্য স্থানে স্থানে সৈন্যবাহিনী মোতায়ন করেন। তিনি গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডের নির্মাতা নন। কিন্তু আধুনিক এই জাতীয় সড়কের মূল ভাবনা তাঁরই মস্তিষ্ক প্রসূত ছিল। তাঁর এ অবদান ভোলার নয়। একসময় যে পথ ধরে চলাচল করত অশ্বরোহী, হস্তী বাহন বা পালকি, 
কালের নিয়মে আজ সে পথ ধরে ছুটে চলেছে আমাদের যান্ত্রিক গাড়ি। পথ কিন্তু একই আছে।
আধঘণ্টা সময়ও লাগল না সাসারাম হাইওয়ে ক্রসিং-এ পৌঁছতে। বুদ্ধগয়া সহ নানা দিকে পথ গিয়েছে সে জায়গা থেকে। টোল প্লাজাও আছে সাসারামের প্রবেশপথে। সাসারামে প্রবেশ করার আগে টোল প্লাজা অতিক্রম করার পর স্থানীয় কিছু মানুষকে শেরশাহের সৌধ কোথায় জিজ্ঞেস করায় তাঁরা হদিশ দিতে পারল না। এ ব্যাপারটা আগেও অনেক জায়গায় খেয়াল করে দেখেছি যে, অনেক ঐতিহাসিক স্থান স্থানীয় মানুষজনের কাছে অপরিচিত, অজানা, গুরুত্বহীন হয়ে থাকে। যদি না তা পর্যটন ক্ষেত্র হিসাবে পরিচিতি লাভ করে বা আয়ের উৎসস্থল হয়। না, শেরশাহর সমাধিক্ষেত্র তেমন কোনও জায়গা নয়।
টোলপ্লাজা অতিক্রম করে সাসারামে প্রবেশ করে লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে করতে কয়েক কিলোমিটার এগিয়ে অবশেষে একজনের কাছ থেকে জায়গাটার অবস্থান জানতে পারলাম। নীল আকাশের তলে বেশ খানিকটা দূরে আকাশের বুকে জেগে থাকা একটা গম্বুজ দেখিয়ে লোকটা জানাল সেটাই হচ্ছে শেরশাহের মকবরা বা সমাধিক্ষেত্র। জাতীয় সড়ক থেকেই দৃশ্যমান সেটা। হয়তো বা প্রয়াগরাজ যাবার পথেও সেটা আমাদের চোখে পড়েছিল। না জানার কারণে আমরা গুরত্ব দিইনি। দীর্ঘ যাত্রাপথের দু’ভাগে এমন কত গম্বুজ, মন্দির, মসজিদই তো চোখে পড়েছে আমাদের। জাতীয় সড়ক থেকে সরাসরি দূরত্ব মাপলে সম্রাটের সমাধিসৌধর দূরত্ব এক কিলোমিটারও হবে না। তবে সেই লোকের মুখে জানলাম, জাতীয় সড়ক থেকে সেই সৌধ দৃশ্যমান হলেও সরাসরি সে জায়গায় যাওয়ার কোনও রাস্তা নেই। সার্ভিস রোড ধরে প্রথমে সাসারাম শহরে প্রবেশ করে তারপর সম্রাটের সমাধিক্ষেত্রে যেতে হবে।
লোকটার কথামতো একটু এগিয়েই সার্ভিস রোড পেয়ে গেলাম আমরা। জাতীয় সড়ক ছেড়ে আমরা সে পথ দিয়ে প্রবেশ করলাম সাসারাম শহরে। এই প্রাচীন শহর বেশ ঘিঞ্জি ও জন সমাগম পূর্ণ। আধুনিক স্থাপত্য, দোকান, শপিংমলের আড়াল থেকে ক্ষয়িষ্ণু, জীর্ণ কিছু প্রাচীন ইসলামিক স্থাপত্যও চোখে পড়ে। একজায়গায় ক’টা ঘোড়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমার একটা মজার ব্যাপার মনে পড়ে গেল। সম্রাট শেরশাহ ডাক ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের জন্য ‘ঘোড়ার ডাকে’র প্রচলন করেছিলেন। যাতে দ্রুত চিঠিপত্র একস্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছনো যায়। আর ছেলেবেলায় এই ব্যাপারটার কারণেই মজা করে লোক ঠকানো প্রশ্ন করা হতো ‘ঘোড়ার ডাক কে শিখিয়েছিলেন?’
শহরে প্রবেশ করার জন্য অবশ্য বেশি পথ এগতে হল না আমাদের। একটা ছোট চৌমাথায় দেখলাম সাইনবোর্ডে পথে নির্দেশ করা আছে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছনোর জন্য। বড় রাস্তা ধরে গলিপথ বেয়ে পৌঁছে গেলাম নির্দিষ্ট স্থানে। সাসারাম শহরের জন কোলাহল এ জায়গাকে স্পর্শ করছে না। সময় এখানে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। একপাশে বিরাট চতুষ্কোণ জলাশয়ের ঠিক মধ্যবর্তী স্থানে উঁচু ভিত্তি প্রস্তরের উপর দাঁড়িয়ে আছে সম্রাট শেরশাহের সমাধিসৌধ। যখন এটি নির্মিত হয় সে আমলে এর চাইতে বড় সমাধিসৌধ ভারত উপমহাদেশে একটিও ছিল না।
সরু রাস্তার একপাশে সরোবর, সমাধি মন্দির আর অন্য পাশে একটি বেশ প্রশস্ত চত্বর যেখানে আছে সৌধে প্রবেশের জন্য টিকিট কাউন্টার এবং কারপার্কিংয়ের জন্য জায়গা। বেশ শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। স্থানীয় কয়েকজন লোক ছাড়া কোনও ট্যুরিস্টের ভিড় নেই সেখানে। গাড়ি পার্ক করে টিকিট কেটে রাস্তা পেরিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম প্রাকার ঘেরা জলাশয়ের সামনে স্মৃতি স্মারকের অভ্যন্তরে। প্রবেশপথের মুখেই পিতলের ফলকে সম্রাট শেরশাহের সংক্ষিপ্ত জীবনী ও তাঁর সমাধিক্ষেত্রের সংক্ষিপ্ত পরিচয় লেখা আছে। এই আফগান বংশোদ্ভূত সম্রাট প্রথম জীবনে মুঘল শাসন ব্যবস্থার অধীনে একজন সেনাপতি হিসাবে বাংলা সলতানিয়তের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে বিহারের শাসনকর্তা হন। ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত ও বিতাড়িত করে দিল্লির সিংহাসন দখল করেন। দশ বছর বিহারের শাসক হিসাবে নিয়োজিত থাকার পর মাত্র পাঁচ বছরের সম্রাট জীবনে, অতি স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ভারতবর্ষে তাঁর অধীনস্থ স্থানে শাসন ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি ও সংস্কার সাধন করে। তিনি ‘রুপিয়া’ নামক মুদ্রার প্রচলন করেন। যে রুপি নামক শব্দটা আজও আমাদের দেশ সহ বেশকিছু দেশে টাকার সমার্থক শব্দ হিসাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট শেরশাহ চান্দেল রাজপুত্রদের রাজধানী কালিঞ্জর অভিযানে যান। তিনমাস কালিঞ্জর দুর্গ অবরোধ করার পরও যখন তিনি দুর্গে প্রবেশ করতে অসমর্থ হন, তখন বারুদ দিয়ে দুর্গ প্রাকারে ছিদ্র করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য সেই বারুদ বিস্ফোরণেই তিনি প্রচণ্ড আহত হন এবং কয়েকদিন পর তাঁর মৃত্যু হয়। কোনও কোনও ঐতিহাসিক আবার দাবি করেন যে, কামানের গোলা ফেটে তাঁর মৃত্যু হয়। যাইহোক শেষপর্যন্ত কালিঞ্জর জয় করে তাঁর সেনাপতিরা সম্রাটের মৃতদেহ নিয়ে সাসারামে ফিরে আসে ও তাঁর শেষ ইচ্ছামতো ওই সৌধেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। এই সৌধ নির্মাণের কাজ তিনি নিজের জীবনকালেই শুরু করেছিলেন। কিন্তু তা সমাপ্ত হয় সম্রাটের মৃত্যুর তিন মাস পর।
সরোবরের মধ্যে তাঁর সমাধিসৌধের সঙ্গে পাড়ের সংযোগ রক্ষা করছে একটি পাথরের সেতু। কয়েক ধাপ সিঁড়ি অতিক্রম করে একটি ছোট পাথুরে কক্ষের ভিতর দিয়ে এগিয়ে পা রাখতে হয় সেতুতে। সেই কক্ষের ভিতরও একটি কবর আছে। তার সঠিক পরিচয় জানা যায় না। কেউ বলেন সেটা শেরশাহের সেনাপতির কবর। আবার কেউ বলেন, এটি স্থপতি আলওয়াল খানের কবর। সে কক্ষ অতিক্রম করে এগলাম পাথর নির্মিত সাঁকো ধরে মূল সমাধিসৌধের দিকে। কজওয়ে দু’পাশে সুন্দর কয়ারি করা গাছ। জলাশয়ের বুকে সমাধিসৌধের প্রতিলিপি। নির্জন দুপুরে মাছরাঙা কখনও জল ছুঁয়ে উঠে যাচ্ছে। তারপাশে অপরিসীম নিস্তব্ধতা।
কজওয়ে দিয়ে গিয়ে সিঁড়ির বেশ কয়েকটা ধাপ অতিক্রম করে স্থাপত্য 
বেদির ওপরে উঠতে হয়। তারপর আবারও সিঁড়ি অতিক্রম করে উঠে আসতে হয় আরও ওপরে।
উঠে এলাম যে জায়গায় যেখানে বিশাল চত্বরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অষ্টভুজাকৃতি মাথায় গম্বুজওলা স্মৃতিসৌধ। ইন্দো-ইসলামিক আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে আফগানি স্থাপত্যের এক আশ্চর্য নিদর্শন। মূল সমাধিকক্ষের বাইরেটা অলিন্দ দিয়ে ঘেরা। ইসলামিক স্থাপত্যরীতি অনুসারে সার সার খিলান যেখানে। সমাধিসৌধ ও চত্বরটা লাল বেলেপাথর দ্বারা নির্মিত। চত্বরের চার কোনায় চারটি চৈত্য আছে। ছায়াময় সেই চৈত্যতে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায় চারপাশের জলাশয়ের সৌন্দর্য, অনুভব করা যায় শান্তিময় এক নিস্তব্ধতা। ওপর থেকে চোখে পড়ে অনতিদূরে শেরশাহের গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডও। ও পথ ধরেই শেরশাহ একদিন রওনা হয়েছিলেন দিল্লির দিকে ভারত সম্রাটের মুকুট মাথায় পরার জন্য। আবার ও পথ দিয়েই হাতির পিঠে তাঁর কফিন বন্দি নিথর দেহ ফিরে এসেছিল এই সমাধিসৌধে তাঁর প্রিয় স্থান সাসারামে। ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি যেমন উজ্জ্বল, তেমনই আবার নির্মমও বটে। তবে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও রয়ে গিয়েছে সাসারামের এই স্থান। সময় বেশ খানিকটা থাবা বসিয়েছে এই সৌধের ওপর। খিলানের পাথরের কারুকাজগুলো স্থানে স্থানে ভেঙে গিয়েছে। সৌধর গায়ের রঙিন টাইলস বা পাথরের টুকরোগুলোর অস্তিত্ব খুব সামান্যই অবশিষ্ট আছে। একসময় এই সমাধি স্মারকটি কী রঙে রাঙানো ছিল তা বলা কঠিন। তবে সম্ভবত গম্বুজটিতে একসময় সাদা রঙের প্রলেপ ছিল। স্থানে স্থানে তার চিহ্ন কয়েক জায়গায় জেগে আছে। অলিন্দ থেকে একটি ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে গম্বুজের মাথায় ওঠার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে তা এখন লোহার গরাদ দিয়ে বন্ধ করা। অবশেষে এসে দাঁড়ালাম সমাধিকক্ষের সামনে। যার ঠিক মাথার ওপর রয়েছে বিশালাকৃতির গম্বুজ। বিশাল সেই সমাধিক্ষেত্রের বাইরের দেওয়ালের গায়ে গবাক্ষে বসানো আছে পাথরের কারুকাজ করা জাফরি। প্রাচীন শিল্পকলার আশ্চর্য সুন্দর এক নিদর্শন। সমাধিকক্ষে প্রবেশপথে রয়েছে লোহার গরাদওয়ালা বিশাল দরজা। বিশাল হল ঘরের মতো জায়গাটাতে বাইরে থেকেই বেশ কিছু পাথরের কবর দেখা যাচ্ছে। একজন দ্বাররক্ষীর দেখা মিলল। সে জানাল, এই কবরগুলির মধ্যে সেটির ওপর সবুজ চাদর ঢাকা আছে ওটাই শেরশাহর কবর। জুতো খুলে ভিতরে প্রবেশ করলাম। এক অপরিসীম নিস্তব্ধতা আর শীতলতা বিরাজ করছে সমাধিক্ষেত্রটিতে। সময় যেন থেমে আছে এ জায়গায়। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে এ জায়গার যেন কোনও সম্পর্ক নেই। মাথার অনেক ওপরে গম্বুজের ছাদ। তার স্থানে স্থানে পলেস্তরা খসে গিয়েছে।
পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম সবুজ চাদর ঢাকা কবরটার সামনে। আলো-আঁধারি খেলা করছে চারপাশে। চাদরের আড়াল থেকে কবরের যতটুকু অংশ দৃশ্যমান, তা দেখে মনে হল নিতান্তই সাদামাটা একটা কবর। কিন্তু এই কবরের নীচেই পাঁচশো বছর ধরে শেষ শয্যায় শায়িত আছেন ভারতবর্ষের ইতিহাসের এক মহানায়ক শেরশাহ সুরি। একদিন যাঁর মাথায় উঠে ছিল দিল্লির সম্রাটের তাজ। তবে শুধু সে কারণের জন্য নয়, শেরশাহ অমর হয়ে আছেন তাঁর জনহিতকর কাজের জন্য যা পরবর্তীকালে অনুসরণ করেছিলেন মুঘল সম্রাটরা। এখানেই নিভৃত-শান্তিতে শায়িত আছেন ‘সম্রাটদের শিক্ষক’ শেরশাহ সুরি। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। মাথার ওপর দ্বিপ্রহরের প্রখর রোদ। দূরে দেখা যাচ্ছে শেরশাহের গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড। ওই রাস্তাই আমাদের ইতিহাস ছোঁয়ায় পর ফিরিয়ে নিয়ে যাবে ঘরে ফেরার জন্য।  

সম্পর্কিত সংবাদ