নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: বাবা রিকশচালক। মা গৃহবধূ। মাটির বাড়ি। দু’টি মাত্র ঘর। রান্নাঘর অস্থায়ী। অনর্গল ধোঁয়া বেরয়। পড়াশোনা করা যায় না। তাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে নদীর ধারে গাছতলায় চলে যেত ছাত্রীটি। সেখানে পড়াশোনা করত। তার একজনও শিক্ষক ছিল না। অনলাইনে ‘টাস্ক’ করে চলত পড়াশোনা। তাই করতে করতে আজ হিঙ্গলগঞ্জের বিদিশা ধরের সামনে চিকিৎসক হওয়ার হাতছানি। চরম দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে ‘নিট’ উত্তীর্ণ করেছে। চিকিৎসক হওয়ার সর্বভারতীয় পরীক্ষা নিট। তাতে বিদিশার র্যাঙ্ক ৪২ হাজার ৮৫৪। তপশিলি কোটায় তা হয়েছে ১০১৮। নদীনালার দেশের ছাত্রীটি আজ তৈরি করেছে লড়াইয়ের এক অনবদ্য গল্প। তার স্বপ্নদেখার কাহিনি রূপকথা হয়ে ছড়িয়েছে হিঙ্গলগঞ্জে।
সুন্দরবনের হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকের বাঁশতলা গ্রামের বাসিন্দা বিদিশা বর। ২০২১ সালে মাধ্যমিকে পেয়েছিল ৬৫৫ নম্বর। ২০২৩ সালে বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক। পেয়েছিল ৪১০। দুই পরীক্ষাতেই সফল। পরিবারে আর্থিক প্রতিবন্ধকতার কারণে স্বরূপনগরে সম্পর্কিত এক দিদির বাড়ি থেকে পড়াশোনা চালাত বিদিশা। উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফলাফলের পর হিঙ্গলগঞ্জে ফেরে। মেধাবী ছাত্রীটির ছোট থেকেই ইচ্ছা ছিল চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত থাকা। ভেবেছিল নার্স হবে। কিন্তু তখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায় টাকার অভাব। তারপর মোবাইলের একটি অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইনে উচমাধ্যমিক দেওয়ার পর প্রস্তুতি শুরু করে। ইউটিউব ও অ্যাপের মাধ্যমে একাধিক শিক্ষকের ভিডিও দেখে নিট পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। রাতে ছোট আলো জ্বালিয়ে পড়াশোনা করত। বিদিশা বলে, ‘এখানে ইন্টারনেটের সংযোগ পেতে সমস্যা। তবে আমার টার্গেট ছিল সিলেবাস শেষ করা।’ সে জানিয়েছে, চিকিৎসার জন্য নদীনালা পেরিয়ে শহরে যেতে হয় সুন্দরবনের বাসিন্দাদের। শহরে হাসপাতালে পৌঁছনোর আগে অনেক রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে যায়। তা দেখেই চিকিৎসক হওয়ার সংকল্প।
বিদিশার বাবা মদন বর কলকাতার পার্কসার্কাস এলাকায় রিকশ চালান। মা প্রতিভা বর গৃহবধূ। অল্প টাকা রোজগার। তা সংসার চালাতেই শেষ হয়ে যায়। তবে হাল ছাড়েননি বিদিশা। তিনি বলেন, ‘আমার ফার্স্ট চয়েস ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজ। দ্বিতীয় এসএসকেএম। দেখা যাক কাউন্সেলিংয়ে কি হয়।’ বাবা ও মা তাঁদের মেয়ের সাফল্যে চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না। তাঁদের বক্তব্য, ‘মেয়ে গরিবের জন্য কাজ করুক। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’ -নিজস্ব চিত্র