জয়ন্ত ঘোষাল: ১৯৮৪ সাল। কাচের একটা ছোট্ট ঘরে উনি উপবিষ্ট। অর্ধবৃত্তাকার একটি কাঠের টেবিল। ঠোঁটের কোণে পাইপ। নির্গত ধূম্রকুণ্ডলী। তামাকের মিষ্টি সুবাস। উনি লিখছেন। খসখস করে নিউজপ্রিন্টের হলদেটে সাধারণ একটা প্যাডে। বল পেন দিয়ে। এই মুহূর্তে তিনি কলকাতার এন্টালির জোড়া গির্জার উল্টোদিকে বর্তমান কাগজের আদি বাড়ির দোতলায় তাঁর ঘরটিতে বসে আছেন। গুরুগম্ভীর অবয়ব। শীতকাল। ডিসেম্বরের এক সন্ধ্যা। আমি দুরুদুরু বুকে তাঁর ঘরের সামনে দণ্ডায়মান। আমার হাতে স্বরচিত একটা স্টোরি। মানে এক্সক্লুসিভ খবর। আমি তখন একুশ-বাইশ বছরের এক তরুণ। ওই লেখায় আছে তরুণের স্বপ্ন। প্রকাশক অরুণ সিনহা আর চিফ রিপোর্টার সুধীন ঘোষ যুগপৎ এই বান্দাকে হাজির হতে বলেছেন ওইরকম এক আপাতগম্ভীর বর্তমান কাগজের তৎকালীন শাহেন শাহের সামনে। বরুণ সেনগুপ্ত চোখ তুলে তাকালেন। তারপর ইশারায় ভিতরে আসতে বললেন। আমি টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে। নিমেষে পড়ে লেখাটি ফেরত দিলেন। তারপর আমাকে বললেন, ‘শোনো হে, কপিটা বাংলায় লিখে নিয়ে এসো। মাথা চুলকে বললাম, কিন্তু স্যার, এটা তো বাংলাতেই লিখেছিলাম।’—এত তৎসম শব্দ! এত সংস্কৃত? এ ভাষায় কি তুমি কথা বল? যে ভাষাতে কথা বল, সেই ভাষায় লেখ। মনে রাখবে, কাল তোমার লেখা আলুওয়ালা, পটলওয়ালা, মাছওয়ালারাও পড়বে। ওরা যদি বুঝতে না পারে, তাহলে কমিউনিকেশন বা সংযোগ হবে কী করে? বরুণবাবু বোঝাতে চাইতেন কোদালকে কোদাল বলতে হবে। ভাষার ক্ষেত্রে অহেতুক জটিলতা বাড়ানোর কোনও মানে হয় না। আবার রিপোর্টিংয়ের বিষয়বস্তু ও স্টাইল হবে একদম ‘ম্যাটার অব ফ্যাক্ট’। সেই সময়ের একটা মজার ঘটনা বলি। এক প্রবীণ সাংবাদিক জ্যোতিবাবুর আমলে রাইটার্স বিল্ডিংস-এর এক মন্ত্রীর ঘরের সামনে এক পিওনকে কাঠের বেঞ্চিতে বসে বর্তমান পড়তে দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি বর্তমান পড়েন কেন? অন্য কাগজ পড়তে অসুবিধা কোথায়?’ ওই পিওন জবাব দেন, অন্য কাগজ বড্ড শক্ত। কাগজ পড়তে হলে জল দিয়ে কাগজটা আগে ভিজিয়ে নরম করে নিতে হবে। সহজ করে কইতে কথা কহ যে। সহজ কথা যায় না কওয়া সহজে! বরুণদা বলতেন পাত্রাধার তৈল না তৈলাধার পাত্র? আজও সমাজে-সাহিত্যে এরা বিরাজমান। তাঁরা নব নব রূপে প্রাণে আসেন।



