ব্রতীন দাস, মেটেলি: নামেই চা বাগানের কোয়ার্টার। টিনের চাল ফুটো। বৃষ্টি নামলে ছেঁড়া পলিথিন মুড়ি দিয়ে বসে থাকতে হয় ঘরের ভিতর। দরজা-জানালার কপাট নেই। ঘরের ভিতর একটা তক্তাপোশ পর্যন্ত না থাকায় শুতে হয় মেঝেতেই। নতুন বউকে এভাবে কষ্ট করতে দেখে ভালো লাগত না শিবা ওরাওঁয়ের। স্ত্রীকে কথা দিয়েছিলেন, এবারের বর্ষা একটু কষ্ট করে কাটিয়ে দিতে পারলে আগামী শ্রাবণে আর ঘরের মধ্যে বসে কাকভেজা হতে হবে না। তার আগেই সারিয়ে ফেলবেন ভাঙা ঘর। সদ্য বিয়ে করা স্ত্রীকে দেওয়া কথা রাখতে সিকিমের নামচিতে এনএইচপিসির নির্মীয়মাণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে কাজে গিয়েছিলেন ২১ বছরের শিবা। ফোন করে নিয়মিত স্ত্রী মণিকার খোঁজ নিতেন। কিন্তু সোমবার সকালের পর স্ত্রীর মোবাইলে আর ফোন আসেনি মেটেলির কিলকট বাগানের ১১ নম্বর লাইনের বাসিন্দা শিবার। পরিবর্তে এসেছে এমন এক খবর, যা মুহূর্তে তছনছ করে দিয়ে দিয়েছে মণিকার সব স্বপ্ন। যে ঘর সারানোর টাকা জোগাড় করতে ভিনরাজ্যে কাজে যেতে হয়েছিল শিবাকে, সেই ঘরের দরজার সামনে বসেই স্বামীর নিথর দেহ ফেরার অপেক্ষায় সদ্য বিবাহিতা তরুণী।
শিবার বাড়ি থেকে কয়েকটা ঘর পরেই বিকেসর ওরাওঁয়ের লেবার কোয়ার্টার। বাড়ির সামনে জটলা। সরকারি আধিকারিক। নেতা-নেত্রীদের ভিড়। এসবে ভ্রূক্ষেপ নেই একরত্তি নায়রার। মাকে সে সমানে বলে চলেছে, বাবা কেন এখনও ফোন করছে না? আমরা কি রথের মেলায় যাব না? বাবা কি আমার খেলনা কেনার জন্য মোবাইলে টাকা পাঠিয়েছে? বাবা যে বলেছিল পাঠাবে! মেয়ের এই প্রশ্নের কী জবাব দেবেন জানেন না দেবীকা। কিলকট চা বাগানের ১১ নম্বর লাইনের বাসিন্দা গ্যাব্রিয়েল টিগ্গারও মৃত্যু হয়েছে অভিশপ্ত টানেলে মিথেন গ্যাস বিস্ফোরণে।
মণিকা বলেন, আমার যাতে কষ্ট না হয়, সেকারণে ভাঙা ঘর সারানোর টাকা জোগাড়ে রথের পরদিন সিকিমে টানেলে কাজে যায়। বলেছিল, মাসে ২২ হাজার টাকা মাইনে দেবে। ভেবেছিলাম, হয়তো সুদিন ফিরবে আমাদের। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।
অন্যদিকে, বিকেসরের স্ত্রী দেবীকা ওরাওঁ বলেন, স্বামী কিলকট বাগানের স্থায়ী কর্মী ছিলেন। আমি কুমাই বাগানে কাজ করি। কিন্তু কিলকটে ঠিকমতো মজুরি মিলছে না। তিন ছেলেমেয়ে। ওদের পড়াশোনা শেখানো, সংসার চালানোর খরচ জোগাড় করতেই তিন সপ্তাহ আগে সিকিমে টানেলে কাজে গিয়েছিল স্বামী। ওর কাছে স্মার্ট ফোন নেই। কি-প্যাড মোবাইল থেকে ফোন করত রোজ। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলত। তিনমাস পর বাড়ি আসবে বলেছিল। আগেই ফিরছে। তবে নিথর দেহ। • শিবার দেহ ফেরার অপেক্ষায় পরিবার। - নিজস্ব চিত্র।