Bartaman Logo
১৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শুদ্ধ ভক্ত

শুদ্ধ ভক্ত
  • ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
Prefer us on Google
শুদ্ধ ভক্তের সংসর্গে কৃষ্ণভাবনার প্রতি এই রকম আকর্ষণ পরম সৌভাগ্যসূচক। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলে গেছেন, ‘গুরু-কৃষ্ণ-প্রসাদে পায় ভক্তিলতা-বীজ। অর্থাৎ কোন মহা ভাগ্যবান জীবই কেবল সদ্‌গুরু ও শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় ভক্তিরূপ লতার বীজ প্রাপ্ত হন। এই সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভাগবতে উদ্ধবকে বলছেন, “হে উদ্ধব, দুর্লভ সৌভাগ্যের প্রভাবেই শুধু মানুষ আমার প্রতি আকৃষ্ট হয়। যদি সে সকাম কর্ম থেকে পূর্ণরূপে বিরক্ত না হয়, অথবা ভক্তির প্রতি পূর্ণরূপে আসক্ত না হয়, তা হলেও আমার এই সেবার প্রভাবে সে অচিরেই সুফল লাভ করে।”
Advertisement
ভগবদ্ভক্তদের তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। প্রথম বা উত্তম ভক্তের বর্ণনা করে বলা হয়েছে—তিনি শাস্ত্রে পারঙ্গত এবং তদনুকূল তর্কে নিপুণ এবং যুক্তির দ্বারা প্রতিপাদন করতে অত্যন্ত দক্ষ। তিনি পূর্ণরূপে উপলব্ধি করেছেন যে, জীবনের পরম উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রেমভক্তি লাভ করা, এবং তিনি জানেন যে, শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন পরম প্রেমাস্পদ এবং পরম আরাধ্য। উত্তম ভক্ত তিনিই হতে পারেন, যিনি সদ্‌গুরুর তত্ত্বাবধানে ঐকান্তিক দৃঢ়তার সঙ্গে বিধি-নিষেধের অনুশীলন করেছেন এবং শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে তাঁর সমস্ত আদেশ যথাযথভাবে পালন করেছেন। এইভাবে ভগবানের বাণী প্রচার করে গুরু হওয়ার শিক্ষা লাভ করে, তিনি উত্তম ভক্ত বলে গণ্য হন। উত্তম ভক্ত কখনও পূর্বতন আচার্যদের সিদ্ধান্ত থেকে বিচলিত হন না এবং সম্পূর্ণ যুক্তি ও তর্কের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত উপলব্ধি করে দৃঢ় শ্রদ্ধা অর্জন করেন। এখানে যে যুক্তি-তর্কের উল্লেখ করা হয়েছে, তা বৈদিক শাস্ত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত যুক্তি-তর্ক। উত্তম ভক্ত কখনই সময়ের অপব্যয়কারী শুষ্ক মনোধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন না। পক্ষান্তরে বলা যায়, ভগবদ্ভক্তিতে যাঁর দৃঢ় নিষ্ঠা জন্মেছে, তিনিই উত্তম ভক্ত। দ্বিতীয় শ্রেণীর ভক্ত বা মধ্যম অধিকারী ভক্তের বর্ণনা করে বলা হয়েছে—তিনি শাস্ত্র-সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তর্ক করতে ততটা নিপুণ নন, কিন্তু ভগবদ্ভক্তিতে দৃঢ় শ্রদ্ধা রয়েছে। অর্থাৎ, মধ্যম অধিকারী ভক্তের কৃষ্ণভক্তিই যে জীবনের পরম লক্ষ্য, সেই সম্বন্ধে সুদৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। তিনি কখনও কখনও শাস্ত্রের যুক্ত ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিরোধী পক্ষকে পরাজিত করতে অসমর্থ হতে পারেন, কিন্তু তা হলেও পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সেবা করাই যে জীবনের পরম লক্ষ্য, সেই সম্বন্ধে তাঁর মনে কোন সংশয়ের উদয় হয় না।
তৃতীয় শ্রেণী বা কনিষ্ঠ অধিকারী ভক্ত হচ্ছেন তিনি, যাঁর বিশ্বাস দৃঢ় হয়নি, এবং সেই সঙ্গে শাস্ত্র-সিদ্ধান্তের প্রতিও যথার্থ শ্রদ্ধা নেই। কনিষ্ঠ অধিকারী ভক্ত শ্রদ্ধা-বিরুদ্ধ সিদ্ধান্ত সমন্বিত দৃঢ় যুক্তির প্রভাবে বিচলিত হতে পারেন। মধ্যম ভক্তের মতো তিনিও শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করার জন্য তর্ক করতে এবং প্রমাণ করতে পারেন না, কিন্তু মধ্যম অধিকারী ভক্তের মতো অবিচলিত শ্রদ্ধা তাঁর নেই। তাই তাঁকে কনিষ্ঠ অধিকারী ভক্ত বলা হয়।
কনিষ্ঠ অধিকারী ভক্ত সম্বন্ধে আরও বিশদ বিবরণ ভগবদ্‌গীতায় রয়েছে। সেখানে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আর্ত, অর্থার্থী, জিজ্ঞাসু এবং জ্ঞানী—এই চার ধরনের মানুষ তাঁদের ইন্দ্রিয় তৃপ্তির জন্য ভগবদ্ভক্তি আচরণ করতে শুরু করেন এবং ভগবৎ-মুখী হন। তিনি কোন মন্দিরে গিয়ে ভগবানের কাছে কষ্ট নিবারণ, অর্থপ্রাপ্তি অথবা জিজ্ঞাসা নিবৃত্তির জন্য প্রার্থনা করেন। শুধুমাত্র ভগবানের মহিমা সম্বন্ধে অবগত জ্ঞানও কনিষ্ঠ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু শুদ্ধ ভক্তের সঙ্গ করার ফলে তাঁরা মধ্যম অথবা উত্তম ভক্তে পরিণত হতে পারেন।
শ্রীল রূপ গোস্বামী বিরচিত ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’ থেকে
 
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ