Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পুরানো অস্ত্রই শান!

ঘুসপেটিয়া, পুশব্যাক, ডিটেনশন ক্যাম্প— ভারত তথা বঙ্গবাসীর কাছে এগুলি এখন বহুচর্চিত, বহু পরিচিত শব্দ। সৌজন্যে মোদি সরকার

পুরানো অস্ত্রই শান!
  • ১০ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ঘুসপেটিয়া, পুশব্যাক, ডিটেনশন ক্যাম্প— ভারত তথা বঙ্গবাসীর কাছে এগুলি এখন বহুচর্চিত, বহু পরিচিত শব্দ। সৌজন্যে মোদি সরকার। এবারে বাংলা ও অসমের ভোটের ময়দানেও বিজেপির প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেই অনুপ্রবেশ ইস্যু। আর তাই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ থেকে শুরু করে বিজেপির সভাপতি নীতিন নবীন অনুপ্রবেশ ‘অস্ত্রেই’ শান দিচ্ছেন বারবার। মোদি থেকে শাহ প্রত্যেকের বক্তব্যে উঠে এসেছে অনুপ্রবেশকারীদের ধরে ধরে তাড়ানোর আস্ফালন। বিহার ঝাড়খণ্ডের নির্বাচনের আগেও বিজেপি নেতৃত্বের গলায় এমনই হম্বিতম্বি শোনা গিয়েছিল। এবার বাংলা ও অসমের পালা। বলাই বাহুল্য বাংলায় নির্বাচন এলেই দিল্লি থেকে উড়ে এসে অনুপ্রবেশতত্ত্ব নিয়ে হাজির হন বিজেপির তাবড় নেতারা। এবারও ব্যতিক্রম হচ্ছে না। সেই বাঁধাগতের বক্তব্য, বাংলায় নাকি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাঁদের ভাষায়, ‘ঘুসপেটিয়া’। পদ্মপার্টির দাবি, এই ‘ঘুসপেটিয়াদের’ আশ্রয় দিয়েছে তৃণমূল। এদিকে বাংলার এবং ডবল ইঞ্জিন শাসিত অসমে বিধানসভা নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। তাই বিজেপি চিরাচরিত ‘প্রথা’ মেনেই অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত রাজনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে চর্বিতচর্বণ শুরু করেছে। বাংলায় মালদহের সভাতেই প্রধানমন্ত্রী মোদি অনুপ্রবেশ ইস্যুর যে সুর বেঁধে দিয়ে গিয়েছেন তাতেই সংগত করে গিয়েছেন কোচবিহারে এসে নীতিন ও রায়দিঘিতে শাহ। বাংলা এবং অসমে প্রচারকালে ভোটার তালিকা থেকে কত নাম বাদ যেতে পারে তার ভবিষ্যদ্বাণী করতেও তাঁরা ছাড়েনি। প্রশ্ন হল, কীসের ভিত্তিতে তাঁরা এসব বলছেন? বাংলায় স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন অর্থাৎ এসআইআর-এর ভিত্তিতে একটি ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। যে অনুপ্রবেশকারী ইস্যু তুলে এত হইচই, তালিকা প্রকাশের পর কতজন রোহিঙ্গা, অনুপ্রবেশকারীর নাম বাদ গেল তা কিন্তু তাতে স্পষ্ট হয়নি। রোহিঙ্গা বা অনুপ্রবেশকারী কত নাম বাদ পড়েছে তা কি দেখাতে পেরেছে কমিশন? যদিও সুর সপ্তমে চড়িয়ে বিজেপি নেতৃত্ব এখনও প্রচার চালাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয় দিয়েছে ‘বঙ্গাল কা সরকার!’ কিন্তু প্রমাণ কই। সঙ্গত কারণেই বিজেপির হাজির করা অনুপ্রবেশ তত্ত্বকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল। 

Advertisement

একথা ঠিক, অবৈধ অনুপ্রবেশ ভারতের একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা যা সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলির জনসংখ্যা ও সংস্কৃতির উপর কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলে। নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত থাকে। কিন্তু সীমান্ত পাহারার দায়িত্বে থাকে বিএসএফ, যারা সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অধীন। সেক্ষেত্রে ওই সীমান্তরক্ষী বাহিনী ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছে কি না তা দেখভালের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবেই কেন্দ্রের। সেক্ষেত্রে অবৈধ অনুপ্রবেশ হলে তা আটকাতে ব্যর্থতার দায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর। তাই অনুপ্রবেশজনিত সমস্যার দায় রাজ্যের উপর ঠেলে দিয়ে কেন্দ্র দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে না। দীর্ঘদিনের এই সমস্যার সমাধানের পথে না হেঁটে ঠিক ভোটের আগে অনুপ্রবেশের জিগির তুলে যেভাবে প্রচারে নেমেছে বিজেপি নেতৃত্ব তাতে উদ্দেশ্য স্পষ্ট। প্রশ্ন হল, নরেন্দ্র মোদি জমানায় প্রায় বারো বছর ধরে ‘ঘুসপেটিয়া’ তাড়ানোর যে হুংকার প্রধানমন্ত্রী দিচ্ছেন তাতে কাজের কাজ কী হয়েছে? আসলে ভোটের আগে অনুপ্রবেশের ধুয়ো তুলে কিছু বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে বলে তৃণমূলের অভিযোগ। 
বাংলার না হয় আছে বিজেপি বিরোধী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। কিন্তু অসমে? সীমান্তবর্তী রাজ্য হওয়ায় ডবল ইঞ্জিনের অসমেও অনুপ্রবেশ একটি বড়ো সমস্যা। গত ২০ ফেব্রুয়ারি সেখানে গিয়ে অমিত শাহ নাম ধরে ধরে সাতটি জেলার উল্লেখ করে বলেন, সেখানে নাকি ৬৪ লক্ষ অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। তাদের শুধু ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদই নয়, সবগুলোকে দেশ থেকে তাড়াবেন। এর জন্যই সময় চাইলেন পাঁচ বছর। আশ্চর্যের বিষয় হল, দশ বছর আগেও অসমে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনতে একই হুংকার ছেড়েছিলেন তিনি! সময়ও চেয়েছিলেন। তারপর অনেক জল গড়িয়েছে। অসমে হয়েছে এনআরসি। সেখানে লক্ষ লক্ষ অনুপ্রবেশকারীকে রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল ডিটেনশন ক্যাম্প। অথচ এবছরও বিজেপির রাজনৈতিক বক্তব্যে অসমে লক্ষ লক্ষ অনুপ্রবেশকারীর কথা ফের উঠে এল! এখন দেখা যাচ্ছে, ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে সেখানে গড়ে ওঠা সর্ববৃহৎ ডিটেনশন ক্যাম্পেই রয়েছেন মাত্র ১১ জন বাংলাদেশি! প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, বাকি লক্ষ লক্ষ অনুপ্রবেশকারী তাহলে গেলেন কোথায়? উত্তর দেওয়ার দায় অবশ্য নেই বিজেপির! যে অনুপ্রবেশ ইস্যুকে হাতিয়ার করে অসমে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল দশ বছর পর আবারও সেই পুরানো কায়দাতেই একই ইস্যু তাদের হাতিয়ার! আসলে বাংলাই হোক বা অসম— ভোট বৈতরণি পেরনোর মরিয়া চেষ্টায় বিভাজনের রাজনীতিই গেরুয়া শিবিরের তুরুপের তাস, প্রধান নির্বাচনি হাতিয়ার। যদিও তাদের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবে মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ভোটে ফায়দা তুলতে একটা বিভাজন তৈরি করে মানুষের মনে ভয় সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। এ অনেকটা ঘোলা জলে মাছ ধরার চেষ্টার মতো। কিন্তু বারবার কুমির ছানা দেখানোর গল্পটা কিন্তু ভোটারদের অজানা নয়। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ