Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / বিনোদন

স্মৃতির সরণিতে শর্মিলা ঠাকুর

কেমন আছ, মা? সুদূর কোনও এক শহর থেকে টেলিফোনে উড়ে আসে প্রশ্ন।

স্মৃতির সরণিতে  শর্মিলা ঠাকুর
  • ১১ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সৌম্য নিয়োগী: কেমন আছ, মা? সুদূর কোনও এক শহর থেকে টেলিফোনে উড়ে আসে প্রশ্ন। উত্তর তো জানাই থাকে, তবু...! আমরা যাঁরা আজকের আধুনিক ইঁদুর দৌড়ে নাম লিখিয়েছি, ভালো থাকার আশায় এক শহর থেকে অন্য শহরে হন্যে হয়ে ঘুরে মরছি, তাঁদের কাছে এ প্রশ্ন বহু পুরনো। সেই কবে বাড়ি ছেড়ে আসার পর থেকেই রুটিনের মতো নিয়মিত। রুটিনকে পাশ কাটিয়ে জীবন এগিয়ে যায় বছর বছর। পিছনে পড়ে থাকে ‘পুরাতন’ যত কিছু আর... মা!

Advertisement

ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় এ সিনেমা। পর্দায় কলকাতার যত জীর্ণ ইমারত, গলি, বাতিল রেডিও, টিভি, ঘড়ি, অ্যান্টিকের দোকান, ফেলে আসা অতীতের সাদাকালো ছবি বেয়ে পরিচালক ঢুকে পড়েন এক পুরনো অট্টালিকায়। গঙ্গার ধারে সে বাড়িতে সময় থমকে গিয়েছে কবেই। বাসিন্দা মাত্র দু’জন। পুরাতন স্মৃতিকে যত্নে আগলে রাখা এক মা (শর্মিলা ঠাকুর) আর সর্বক্ষণের পরিচারিকা হীরা (বৃষ্টি রায়)। বিকেল নেমে আসে। ঠিক তখনই বহু দূরে অন্য এক শহরে অফিসের ক্লান্ত যাপন শেষে ফিরে আসে মেয়ে ঋতিকা (ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত)। ব্যক্তিগত জীবনের ওঠাপড়া, যন্ত্রণায় ভারাক্রান্ত। তবু মায়ের জন্মদিন তাঁকে টেনে আনে কোন্নগরে। ভাঙা সম্পর্কের বোঝা বুকে চেপে সঙ্গী হওয়ার জন্য রাজি করিয়ে ফেলে রাজীবকেও (ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত)। তারপর তিনজনের গল্পে শুরু হয় লুকোচুরি, পুরাতন-নূতনের! ফিরে ফিরে আসে মেঘালয়ের এক প্রাগৈতিহাসিক গুহা।
আসলে তো ‘পুরাতন’ যা কিছু, সেটাই এ নশ্বর জীবনের একমাত্র সম্বল। কারও কাছে তা আবর্জনা, কারও কাছে আলিবাবার গুহার গুপ্তধন। সেই দোলাচলে পর্দায় সার্থক এক ছোটগল্প বুনেছেন পরিচালক সুমন ঘোষ। সে ছোটগল্পের মহীরুহ একজনই, শর্মিলা ঠাকুর। দেড় দশক বাদে বাংলা ছবিতে সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’-এর নায়িকা। সম্ভবত এটাই টলিউডে তাঁর শেষ সিনেমা। রবি কিরণ আয়াগিরির ক্যামেরায় প্রায় প্রতিটা ফ্রেমজুড়ে শুধু তিনিই। কখনও সশরীরে, কখনও চরিত্রদের গল্পে। সযত্নে তাঁর পুরাতন স্মৃতিকে পর্দায় বেঁধেছেন পরিচালক। যদিও স্পষ্ট করেননি কী সেই অসুখ, সাধারণ স্মৃতিভ্রংশ, অ্যালঝাইমার্স নাকি রাজীবের ভাষায় ‘ফিউচারোফোবিয়া’। হদিশ মেলে না শর্মিলা ঠাকুরের জীবনের পুরাতন কিছু রহস্যের। কিন্তু তাঁর মুখের প্রতিটা বলিরেখা আটকে রাখে দর্শককে। তাঁর পাশে ঋতুপর্ণার চরিত্র আমাদের বড় চেনা। নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন তিনি। যেমন দানা বাঁধেনি ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফার ধৃতিমান মুখোপাধ্যায়ের ছায়ায় ইন্দ্রনীলের চরিত্রটিও। মুখে বারবার ঋতিকার মায়ের সঙ্গে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ সম্পর্কের কথা বললেও, সেই টান কোথাও চোখে পড়ে না। সাইকিয়াট্রিস্টের ছোট্ট চরিত্রে একাবলী খান্নার অবশ্য তেমন কিছু করার ছিল না। পরিচারিকার চরিত্রে বৃষ্টির যেমন আর একটু পরিসর দরকার ছিল। যদিও সেসব খামতি পুষিয়ে দিয়েছে ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ খ্যাত পরিচালক আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তের সম্পাদনা। পুরনো দেওয়ালে ইটের গা বেয়ে ওঠা বট-অশ্বত্থের শিকড়ের জালের মতো এ গল্পকে বেঁধে রেখেছে অলকানন্দা দাশগুপ্তের আবহসঙ্গীত এবং শ্রেয়া ঘোষালের গানও।
দু’টি মুহূর্ত এ সিনেমা শেষেও রয়ে যায়। জন্মদিনের সমস্ত উদযাপন শেষের খারাপ লাগা যখন ঘিরে ধরছে মা-মেয়েকে, তখনও একটাই কথা উচ্চারণ করেন শর্মিলা, ‘আমি ভালো আছি!’ আর তারপর ইন্দ্রনীল যখন অনুরোধ করেন তাঁকে গান গাইতে, এক লহমায় মনে পড়ে যায় ‘অমর প্রেম’ ছবির সেই দৃশ্য—গান বন্ধ করেছেন শর্মিলা। রাজেশ খান্নার অনুনয়... ‘গাও না’!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ