পাপ্পা গুহ, উলুবেড়িয়া: বয়স ৮৬। হাঁটুতে ব্যথা। লাঠি হাতে হাঁটতে হয়। শাড়িতে পা জড়িয়ে যায়। তবে হাঁটা ছাড়েন না। প্রিয় দলের খেলা থাকলে তো কথাই নেই। সেদিন বাড়িতে বসে থাকবেন এমন ভাবনা ধাতে নেই। মোহনবাগান খেললে কালো লাঠিটি ঠুকঠুক করতে করতে খানিক হেঁটে খানিক বাসে পৌঁছে যান বউবাজার থেকে সোজা ম্যাচ গ্রাউন্ড। তখন খেলা দেখার উত্তেজনায় বয়সের ভার যায় কাবু হয়ে। অশীতিপর শরীরটি হয়ে ওঠে চাঙ্গা। এমন মহিলা সমর্থকের দেখা সচরাচর মেলে না। মোহনবাগান তাদের এই একনিষ্ঠ প্রবীণ সমর্থককে এবার পুরস্কৃত করল। ‘সেরা সমর্থক’ উপাধি পেলেন শান্তি চক্রবর্তী।
কলকাতার বউবাজারে থাকেন বৃদ্ধা শান্তিদেবী। মোহনবাগান সংক্রান্ত কোনও অনুষ্ঠান থাকলে হাজির হয়ে যান। রবিবার সকালে নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন ফুলেশ্বরের মনসাতলায়। সেখানে মোহনবাগানের অফিসিয়াল ফ্যান ক্লাব উলুবেড়িয়ার স্বপ্নের মোহন তরীর অনুষ্ঠান ছিল। উপস্থিত ছিলেন মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাবের সভাপতি দেবাশিস দত্ত, হাওড়া গ্রামীণ জেলার অতিরিক্তি পুলিস সুপার জন অ্যালেন জর্জ, উলুবেড়িয়ার মহকুমাশাসক মানসকুমার মণ্ডল, প্রাক্তন ফুটবলার দীপেন্দু বিশ্বাস প্রমুখ। আর ছিলেন শান্তিদেবী।
তাঁর যৌবনে মেয়েদের খেলা দেখা সহজ ছিল না। বৃদ্ধা জানান, ছোটবেলা থেকেই মোহনবাগানের প্রতি তাঁর ভালোবাসা। তিনি মাঠে গিয়ে খেলা দেখেন। জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ক্লাবে যান। ক্লাবকে নিয়ে কোথাও কোন অনুষ্ঠান হলে সেখানেও পৌছে যান। এখন হাঁটুর সমস্যা ভোগাচ্ছে। ফলে সবসময় যে মাঠে যেতে পারেন এমন নয়। তবে বাড়িতে টিভির সামনে বা মোবাইল নিয়ে বসে দলের খেলা দেখেন। আর তাঁর ভালোবাসা রয়েছে আর একটি দলের প্রতি। সেই দলটি হল ‘তৃণমুল’। শান্তিদেবী বলেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেসকে ভালোবাসি। দলের অনুষ্ঠানে যাই। কালীঘাটেও গিয়েছিলাম।’ মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত মোহনবাগন ক্লাব এবং তৃণমূলকে সমর্থন করে যাবেন, কথাটি গলা গম্ভীর করে বললেন। মোহনবাগানের সভাপতি দেবাশিস দত্ত বলেন, ‘মোহনবাগানের আসল শক্তি সমর্থকরা। তাঁদের স্বীকৃতি না দিলে প্রতিষ্ঠান এগতে পারবে না। সে কারণে সেরা খেলোয়াড়, সেরা কোচ, সেরা কর্মকর্তার পাশাপাশি সেরা সমর্থকদেরও পুরস্কৃত করা হচ্ছে।’
শান্তিদেবীকে নিয়ে অন্যান্য সমর্থকদের উচ্ছ্বাস কম নয়। যখন নিয়মিত মাঠে যেতেন তখন তাঁকে ঘিরে থাকত যুবক থেকে প্রবীণদের ভিড়। খেলা দেখতে দেখতে কোনও অভিজ্ঞ মন্তব্য করলে তা উঠে আসত সবার চর্চায়। যুগে যুগে খেলার উন্নতি অবনতি নিয়ে শান্তিদেবীর মতামত জানতে চাইতেন অন্যান্য সমর্থকরা। তা নিয়ে চলত কাটাছেঁড়া। নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি খুলে সেকাল-একালের গল্প শোনাতেন প্রবীণ মানুষটি। তা গোগ্রাসে গিলত আজকের প্রজন্ম। শান্তিদেবী এখনও সমর্থক হিসেবে শ্রদ্ধার পাত্র। আরও বহু বছর মাঠে আসুন তিনি, চান মোহনবাগানের সমর্থকরা। নিজস্ব চিত্র