ইথিওপিয়া। বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র ২০টি দেশের তালিকায় থাকা আফ্রিকার স্থলবেষ্ঠিত এই দেশটির লোকসংখ্যা সাকুল্যে ১৪ কোটি। মাথাপিছু আয় বছরে এক হাজার মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। দেশটির ৪৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করেন। ৭২ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্রের শিকার। জনসংখ্যার অর্ধেকের কাছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, উন্নত জীবনের ন্যূনতম সুবিধা আজও অধরা। বাস্তুচ্যুত হয়ে অস্থায়ী শিবিরে দিন কাটান ৩৫ লক্ষের বেশি নাগরিক। এমন একটি অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া দেশের নাম এই ২০২৬-এ উঠে এসেছে ভারতের সঙ্গে। সৌজন্যে, মোদি সরকার। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের যে তালিকা সামনে এসেছে, তাতেই দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের ১২২টি দেশের মধ্যে ভারত ও ইথিওপিয়া রয়েছে ১০০তম স্থানে। দু’ দেশেরই স্কোর ২৪.১। প্রতিবেশী বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপালের মতো দেশগুলিও ভারতের থেকে এগিয়ে। তবে নরেন্দ্র মোদির একমাত্র সান্ত্বনা হয়তো হতে পারে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। কারণ এই দুই প্রতিবেশী দেশের নাম তালিকায় ভারতের পরে রয়েছে। তালিকায় ভারতের অবস্থানকে ‘গুরুতর’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। কেন্দ্রের সরকার এই তথ্য স্বীকার করুক বা না করুক এই হল ‘বিশ্বগুরুর’ বিকশিত ভারতের ছবি!
মূলত চারটি সূচকের মানদণ্ডের ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি হয়। এক, অপুষ্টি (জনসংখ্যার সেই অংশ যাদের ক্যালোরি গ্রহণ অপর্যাপ্ত)। দুই, শিশুর খর্বতা (পাঁচ বছরের কম বয়সি, যাদের বয়সের তুলনায় স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চতা কম)। তিন, কৃশতা (পাঁচ বছরের কম বয়সি, যাদের উচ্চতার তুলনায় ওজন কম)। চার, শিশু মৃত্যু (পঞ্চম জন্মদিনের আগেই যাদের মৃত্যু হয়)। এই নিক্তিতে ২০২৬-এ স্বঘোষিত ‘বিশ্বগুরু’র দেশের ছবিটা হল: ভারতে জনসংখ্যার ৯.৮ শতাংশ অপুষ্টিতে, শিশুদের মধ্যে ২৯.৩ শতাংশ খর্বকায়, ১৯ শতাংশ শিশু কৃশকায় এবং ২.৭ শতাংশের মৃত্যু হচ্ছে পাঁচ বছরের আগেই। তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, এই চার সূচক মিলিয়ে বিশ্বের স্কোর যেখানে ১৮.১ শতাংশ, দক্ষিণ এশিয়ার ২৩.৫ শতাংশ, ভারতের স্কোর সেখানে ২৪.১। এমন নয় যে, মোদি জমানায় এত বছর ভারত খুব ভালো অবস্থায় ছিল, এ বছরই দেশ পিছিয়ে পড়েছে। তথ্য বলছে, ২০০৬ সাল থেকে ক্রমতালিকায় ভারত প্রতি বছর উন্নতি করছিল। ২০১৪ সাল (প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদির অভিষেকের বছর) থেকে অবনতি ঘটতে শুরু করেছে। সে বছর ১২০টি দেশের মধ্যে ভারত ছিল ৪৫তম স্থানে। সর্বশেষ ২০২৫-এ ১২৩টি দেশের মধ্যে ভারত ছিল ১০২তম স্থানে। গত বারো-তেরো বছর ধরে মোদি সরকারের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা বুঝিয়ে দেয়, ভারত এখনও ক্ষুধা নিবৃত্তি, অপুষ্টি দূরীকরণের কাজে গুরুতর বা উদ্বেগজনক অবস্থার মধ্যে রয়েছে। এমন এক লজ্জাজনক ছবি উঠে এলেও দেশের ‘যশস্বী প্রধানমন্ত্রীর’ ‘জয়গান’ করতে ব্যস্ত তাঁর স্তাবককুল। প্রচারের ঢক্কানিনাদেরও এতটুকু খামতি নেই!
বিশ্বের দরবারে বছরের পর বছর এমন এক করুণ পরিণতির ছবি উঠে আসায় যথেষ্ট লজ্জিত হওয়ার কথা। তার বদলে ক্ষুধা সূচকের এই রিপোর্টকে ভারতের ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করার প্রচেষ্টা হিসাবে দেখছে কেন্দ্রীয় সরকার। দিল্লি মনে করে, এই রিপোর্ট গোলমেলে। ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে এই ছোটো নমুনা সমীক্ষা দেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। উলটে গগনভেদি প্রচার হল, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি হারে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধি হচ্ছে। পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে ধাবিত ভারত নাকি খুব শীঘ্র তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠবে। মোদির নেতৃত্বে ১৪০ কোটির এই দেশ নাকি এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে ভারতকে নাকি সবাই সমীহ করে চলেছে। যদিও বিশেষজ্ঞদের একটি বড়ো অংশের বক্তব্য, কেন্দ্রের এই দাবি প্রকৃত সত্যকে আড়াল করছে। মাথাপিছু আয়ের নিরিখে ভারত বহু দেশের পিছনে রয়েছে। সম্পদ সৃষ্টি হলেও তা কুক্ষিগত হয়ে রয়েছে সমাজের মুষ্টিমেয় এক শ্রেণির হাতে। সম্পদ বণ্টনে অসাম্যের যে ছবি দেখা যায়, তাতে স্পষ্ট, এ দেশে গরিব আরও গরিব হচ্ছে, মুষ্টিমেয় দিন দিন ধনী হয়ে উঠছে। আসলে ধর্মীয় উন্মাদনা থেকে উন্নয়নে খামতির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে যখনই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বা তথ্যসমৃদ্ধ রিপোর্ট শাসকের বিরুদ্ধে গিয়েছে, তখনই তার মধ্যে ভাবমূর্তি নষ্ট করা বা চক্রান্তের গন্ধ পেয়েছেন মোদি-শাহরা। কিন্তু এ দেশের বিভিন্ন সরকারি রিপোর্টেও মা-শিশুদের অপুষ্টি, ক্ষুধা, শিশু মৃত্যু নিয়ে ব্যর্থতার বহু তথ্য সামনে এসেছে বারবার। সুতরাং, সত্যকথনকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা না করে মা ও শিশুদের পুষ্টিকর খাদ্যসুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য কী ধরনের পরিবর্তন আনলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে, চীনের মতো ভারতও একদিন ক্ষুধামুক্ত দেশের তালিকায় নাম তুলতে পারে, সেই চেষ্টা করা উচিত। ভারত সরকার যাই দাবি করুক না কেন আম আদমির অভিজ্ঞতা কিন্তু ভালো নয়। দেশের বহু মানুষকে অতি কষ্টে দিনযাপন করতে হয়। আচ্ছে দিনের স্বপ্ন তাঁদের অধরা। প্রশ্ন হল, এই সত্যোপলব্ধি আদৌ কি হবে সরকারের? নাকি তুঘলকি আচরণ চলবে?


