Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / ম্যাগাজিন

সাধারণ ভেষজেই নিয়ন্ত্রণে থাক সুগার

সাধারণ ভেষজেই নিয়ন্ত্রণে থাক সুগার
  • ৩০ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
ডাঃ প্রদ্যোৎবিকাশ কর মহাপাত্র: আজকাল সাধারণ মানুষও জানেন রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি হলে বুঝতে হয় ডায়াবেটিস হয়েছে। কবিরাজিতে এই অসুখের নাম মধুমেহ। মধুমেহ মানে রোগীর রক্ত হয়ে যায় মধুর মতো। তবে মানুষের জীবনটা হয়ে যায় তিক্ত। মডার্ন মেডিসিনে এই অসুখকে ডায়াবেটিস মেলিটাস বা টাইপ ২ ডায়াবেটিস বলে। আয়ুর্বেদশাস্ত্রে আবার ডায়াবেটিসকে প্রমেহ অসুখ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রমেহ অসুখের কুড়িটি ভাগ রয়েছে। এর মধ্যে বাতজ প্রমেহ ৪ রকমের, পিত্তজ প্রমেহ ছ’রকমের আর কফজ প্রমেহ ১০ রকমের। এইভাবে মোট কুড়ি ধরনের প্রমেহ আছে।
Advertisement
আয়ু্র্বেদশাস্ত্র অনুসারে কফজ প্রমেহ হল রোগীর মেহ রোগের প্রাথমিক অবস্থা। এই পর্যায়ে ফ্যাট মেটাবলিজম সঠিকভাবে হয় না। আয়ুর্বেদশাস্ত্র বিশারদরা এই পর্যায়কে প্রি -ডায়াবেটিসের সঙ্গে তুলনা করেন। এরপরেই আসে পিত্তজ প্রমেহ। পিত্তজ প্রমেহর ক্ষেত্র ফ্যাট এবং প্রোটিন দুটি খাদ্য উপাদানের বিপাকেই গণ্ডগোল হয়।
কফজ এবং পিত্তজ প্রমেহ যদি উপেক্ষিত হয় অর্থাত্‍ প্রথমেই যদি এই ধরনের সমস্যার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে বাতজ প্রমেহ দেখা দিতে পারে।
আবার সব পর্যায়ের প্রমেহই যদি উপেক্ষিত হয় এবং সঠিকভাবে চিকিত্সা সময়মতো না করা হয়, তাহলে দেখা দেয় মধুমেহ বা ক্ষৌদ্রমেহ। 
সুতরাং মধুমেহকে বলা যেতে পারে নানাবিধ শারীরিক জটিলতা সহ ডায়াবেটিস। কফজ প্রমেহকে বলা যায় প্রি- ডায়াবেটিক কন্ডিশন। পিত্তজ প্রমেহকে বলা যায় ডায়াবেটিস আর বাতজ প্রমেহ হল নানা ধরনের জটিলতার সঙ্গে  ডায়াবেটিসের সমস্যা।
আয়ুর্বেদ মতে তিনটে অবস্থাতেই নেওয়া যায় ব্যবস্থা। যদি দেখা যায় কোনও ব্যক্তির পাচকাগ্নি  সঠিকভাবে ক্ষরিত না হয় তাহলে দেখা দেয় অগ্নিমান্দ্যকর পরিস্থিতি। প্রশ্ন হল পাচকাগ্নি কী? 
পাচকাগ্নি বলতে এক্ষেত্রে পাকস্থলীর খাদ্য পাচকরস যেমন হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড, লিভার ও প্যাংক্রিয়াস থেকে ক্ষরিত হওয়া নানা এনজাইমের কথা বলা হচ্ছে। এনজাইম সহ আরও কিছু হরমোনের ক্ষরণ সঠিকভাবে না হলেই শুরু হয় বিভিন্ন ধরনের জটিলতা। তা কেমন? আমাদের খাদ্যপাচন তন্ত্রের অন্তর্গত একটি বিশেষ অঙ্গ হল প্যাংক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয়। সেই প্যাংক্রিয়াসের মধ্যে থাকে আইলেটস অব ল্যাঙ্গারহ্যানস নামে কোষ, যে কোষ থেকে ক্ষরিত হয় ইনসুলিন। ওই কোষ থেকে যদি প্রয়োজনের তুলনায় কম ইনসুলিন নির্গত হয়, তাহলেও রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ে। কারণ খাদ্য নানা প্রক্রিয়ায় ভেঙে যখন শর্করার কণা হিসেবে রক্তে মেশে, শর্করার সেই কণাকে রক্ত থেকে কোষে প্রবেশ করানোর কাজটি করে ইনসুলিন। 
টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্যাংক্রিয়াস থেকে ইনসুলিন কম বেরচ্ছে। ফলে কোষে কোষে শর্করা প্রবেশ করছে না। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে এও দেখা যায় যে ইনসুলিনকেই শরীর প্রতিরোধ করছে। অর্থাত্‍ ইনসুলিন শরীরের কোনও কাজে আসছে না। এমন ক্ষেত্রে দেখা দেয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্ট ডায়াবেটিস। উপরিউক্ত দুটি কারণে শরীরের কোষ আর কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে না। রক্তে ঘুরে বেড়ায় শর্করা। 
কাদের হয় ডায়াবেটিস? 
যাঁরা অতিমাত্রায় ভোজন পছন্দ করেন, যাঁরা দুগ্ধবিকার বা দুগ্ধজাত নানা খাদ্য যেমন ঘি, মাখন, ক্ষীর ইত্যাদি বেশি খান কিংবা যাঁরা ইক্ষুজাত খাদ্য যেমন চিনি, গুড়, সন্দেশ বেশি খান, অতিরিক্ত মাত্রায় পান করেন আখের রস, মিষ্টি জল (সফট ড্রিংকস), আলস্যে দিন কাটান, দিবানিদ্রা বেশি উপভোগ করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রমেহ রোগ বেশি হয়। মোদ্দা বিষয়টা হল, এদের সবার ক্ষেত্রেই অগ্নিবিকৃতি ঘটে যায়। অর্থাত্‍ অগ্নি সঠিকভাবে ক্ষরিত হয় না। ফলে একজন ব্যক্তির তেজ কমে যায়। সঠিকভাবে খাদ্যের পরিপাক হয় না। এর ফলে দেহে ওই খাদ্যের অপক্ক অন্নরস বা আম তৈরি হয়। এই আম শরীরের বিভিন্ন স্থানে জমে যায়। 
দেখা গিয়েছে খুব স্থূলকায়, শুয়ে-বসে দিন কাটায় এমন ব্যক্তি, বংশগত অসুখ রয়েছে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও ডায়াবেটিস বা প্রমেহ হতে পারে। আবার কারও কারও প্যাংক্রিয়াস সঠিকভাবে কাজ করে না, এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও দেখা দিতে পারে এই সব জটিলতা। এমন একাধিক কারণ আছে।
আয়ু্র্বেদ মতে করণীয় হল, অগ্নির বিকার থেকেই যেহেতু এমন হচ্ছে তাই ডায়াবেটিসের রোগীকে কিছু বিষয় বর্জন করতে হয়। প্রথমত একসঙ্গে অনেকটা খেয়ে ফেলার অভ্যেস ত্যাগ করতে হয়। অনেকেই আছেন যাঁরা একসঙ্গে কেজি দুয়েক মাংস, এক বালতি ভাত, খান পঞ্চাশেক রসগোল্লা খেয়ে ফেলতে পারেন বলে ভারী গর্ব বোধ করেন। এমন ব্যক্তিদেরই পরবর্তীকালে  মধুমেহ দেখা দিতে পারে। এমন ক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হল, ওজন বুঝে করুন ভোজন। মোট কথা পেটে খিদে রেখে খাবার খান। এই কারণে পাকস্থলীকে তিন ভাগে ভাগ করা হয় ও বলা হয় খাদ্যগ্রহণের সময় তিনভাগের মধ্যে দুই ভাগ পূরণ করতে হবে ও একভাগ রাখতে হবে ফাঁকা। কিন্তু আমি বলব যাঁরা প্রি-ডায়াবেটিক বা প্রো- ডায়াবেটিক তাঁদের ক্ষেত্রে পাকস্থলীকে আরও খানিকটা ফাঁকা রাখতে হবে। এখন পেটে খিদে রেখে খেলে দ্রুত খিদে পেয়ে যাবে। তাই তাঁদের উচিত প্রতি চারঘণ্টা অন্তর খাদ্যগ্রহণ করা। তবে একসঙ্গে বেশি খাওয়া উচিত নয়। মোট কথা অল্প খাবেন তবে বার বার খাবেন।
কেমন খাদ্য খাবেন?
• ডায়াবেটিস হলে শুধু কার্বোহাইড্রেট নয়, তার সঙ্গে  ফ্যাট এবং প্রোটিন মেটাবলিজমেও সমস্যা হয়। ফলে তিন ধরনের খাদ্যগ্রহণেই সংযম দেখাতে হয়। 
• কফকর খাদ্য, যেমন — দই, মাখন, পায়েস, স্নেহজ খাদ্য এগুলি বেশি খাওয়া কখনওই উচিত নয়। ফ্যাটপ্রধান খাদ্য যেমন — নারকেল, বাদাম, ঘি, মাখন, আমন্ড, কাজু, আখরোট এই ধরনের খাদ্যও কম খেতে বলা হয়।
• খাওয়া যাবে না জলজ প্রাণী বা পক্ষী যেমন কচ্ছপের মাংস। খাওয়া যাবে না মাত্রাতিরিক্ত সামুদ্রিক মাছ।
• বড় পাঁঠা বা বড় খাসির মাংস খাওয়া কোনওমতেই উচিত হবে না।
• আঙুর, কলা, আম, কাঁঠালের মতো খাদ্য খেতে নিষেধ করা হয়। বরং খেতে বলা হয় জাম, মুসাম্বি লেবু, পেয়ারা, কচকচে আপেল, সফেদা।
• কিছু কিছু মাটির তলার সব্জি খাওয়া একেবারেই উচিত হবে না। উদাহরণ হিসেবে আলু, ওল, কচু ইত্যাদি সব্জির কথা বলা যায়। এই ধরনের  মূলজাতীয় সব্জি নিজের মধ্যে প্রচুর শক্তি  সঞ্চয় করে রাখে। এমন সব্জি বেশি খেলে শরীরে প্রচুর এনার্জি একসঙ্গে প্রবেশ করে। এই এত পরিমাণ এনার্জি শরীরে প্রবেশ করার পর তা শরীর সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে সমস্যা দেখা দেয়।
কী খাবেন? 
• এমন খাবার খেতে হবে যা পেট ভরাবে তবে শরীরে একসঙ্গে প্রচুর এনার্জি প্রবেশ করাবে না। এগুলি হল সব ধরনের সবুজ শাকসব্জি। সবুজ শাকসব্জি নিশ্চিন্তে খেতে পারেন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি। প্রতিদিন ২৫০ গ্রাম করে সব্জি খাওয়ার কথা বলা যায়।
• দই খাওয়া যায় না ঠিকই তবে ঘোল খেতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ঘোল অগ্নিগুণ বাড়ায়। তবে ঘোল খেতে হবে তিনভাগ জল একভাগ দই মিশিয়ে।
• ডায়াবেটিসের রোগীকে পুষ্টির জন্য সামান্য ছানা দেওয়া যায়।
সুগার কমাতে দারুণ কার্যকরী কী কী ভেষজ?
• কফকর নয় অথচ অগ্নিবর্ধক এমন খাদ্য সেবন করার কথাও বলা হয়। উদাহরণ হিসেবে তেতো খাদ্যের কথা বলা যায়। নিয়মিত খেলেও লাভ হয়।
• রান্নাঘরে থাকা মেথিচূর্ণ, জামবীজের চূর্ণ প্রতিদিন ৩ থেকে ৬ গ্রাম খাওয়া যেতে পারে।
• খাওয়া যায় আমলকী চূর্ণ ২ থেকে ৪ গ্রাম দিনে দু’বার।
• তেলাকুচা পাতার রসও সুগার কমাতে বিশেষ কার্যকরী। ২ চা চামচ রস সকালে খালি পেটে খেতে পারেন। 
• সুগার নিয়ন্ত্রণে গুড়ুচি বা গুলঞ্চের রস অত্যন্ত উপযোগী। ২ চামচ রস দু-বার বা শুকনো গুলঞ্চের চূর্ণ ২ থেকে ৪ গ্রাম দিনে দু-বার খাওয়া যায়। 
• খাওয়া যায় কালমেঘ, হলুদের গুঁড়ো ২ থেকে ৪ গ্রাম মাত্রায়। 
• নিশা আমলকী (হলুদ ও আমলকী গুঁড়ো) প্রতিদিন  ৩ গ্রাম করে দু-বার সেবনেও কমে রক্তে শর্করার মাত্রা।
• দারুচিনিও আমাদের পাচক রসকে ভালো মাত্রায় বার করতে সাহায্য করে, ৫০০ মি.গ্রা থেকে ১ গ্রাম মাত্রায় দিনে দু-বার খেতে পারেন। 
ওজন কমান
আমরা সাধারণত দু-ধরনের রোগী দেখি— স্থূলমেহী এবং কৃশমেহী।
স্থূলমেহীদের ডায়াবেটিসের সঙ্গে স্থূলত্ব থাকে। স্থূলত্ব থাকলে কঠোরভাবে খাদ্যগ্রহণে যেমন রাশ টানতে পারা যাবে তেমনই এক্সারসাইজ দরকার। দেখা গিয়েছে ওজন কমালে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ হয়ে যায়।
তবে কৃশমেহীদের কিছু কিছু পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করতেই হয়। 
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারাদিনে কী খেলে ভালো হয় তা একটি ছড়ার মাধ্যমে সহজে মনে রাখা যেতে পারে—
‘প্রাতরাশে মুড়ি, সাথে অঙ্কুরিত ছোলা/জামবীজ মেথিচূর্ণ, খান দুই বেলা,/ দ্বিপ্রহরে রুটি সাথে, অল্প কিছু ভাত/ বাটি ভর্তি ডাল রবে, সব্জি ভরতি পাত/ করলার সেদ্ধ, সাথে টম্যাটো ও শসা/ছোট মৎস্য লঘু ঝোলে রাখিবে যে খাসা/ সন্ধ্যায় শসা মুড়ি সাথে থাক ছানা/ দুধ চিনি ছাড়া চায়ে নাই আছে মানা,/রাত্রির আহারে রুটি, সাথে তরকারি/ বেগুনের পোড়া নিন বড় উপকারী/ প্রাতে সাঁঝে ছোটাছুটি দেয় উপকার/ সকালে চিরতা জল কমায় সুগার/ হরিদ্রা স্বরস সাথে গুলঞ্চের জল/ সুগারের উপশমে দর্শায় সুফল।’
সুতরাং, এককথায় বলা যায় আমরা সকালে, দুপুরে রাতে রোগী কী খাবেন তা যদি স্থির করে ফেলতে পারি, তাহলে একজন রোগীর ডায়াবেটিস হোক, প্রি-ডায়াবেটিস হোক, জটিলতা থাক আর নাই থাক— সমাধান সম্ভব।
অবশ্য পালনীয় কিছু কর্তব্য
• ডায়াবেটিসের রোগীর ফুট কেয়ার নেওয়ার খুব দরকার। ডায়াবেটিসে আক্রান্তর ডায়াবেটিস আলসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে আঙুলের ফাঁক,  পায়ের পাতা ভালো করে পরীক্ষা করে দেখুন। কোনও ফোসকা, ছত্রাক সংক্রমণ, ঘা, ছেঁড়া থাকলে সতর্ক হন। চিকিৎসা করান।
• দুধ সবসময় হলুদের গুঁড়ো মিশিয়ে খাবেন।
• আতপ চালের ভাত খাওয়া চলবে না।
• দুপুরবেলা কোনওভাবেই ঘুমনো যাবে না।
• এছাড়া যাঁরা শুয়ে বসে দিন কাটাচ্ছেন, কম্পিউটারের সামনে সারাদিন বসে আছেন, ওয়ার্ক ফ্রম হোম হচ্ছে তাঁদের প্রতিদিন হালকা এক্সারসাইজ করতেই হবে।
পরামর্শদাতা ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট আয়ুর্বেদিক এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের প্রাক্তন অধ্যাপক।
লিখেছেন সুপ্রিয় নায়েক
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ