ডাঃ আশিস মিত্র: লবণ বা নুন : নুন বা লবণ কী? নুন হল একধরনের ইলেক্ট্রোলাইট। সোডিয়াম ও ক্লোরাইড দিয়ে তৈরি একটি রাসায়নিক যৌগ। সাধারণভাবে খাদ্য সংরক্ষণ ও স্বাদ বাড়ানোর জন্য নুন ব্যবহার করা হয়। এছাড়া আমাদের শরীরে রোজ যে সোডিয়াম প্রবেশ করে তার প্রধান উত্সই হল নুন।
Advertisement
তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, শরীর সুস্থ রাখার জন্য সামান্য মাত্রায় সোডিয়াম গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সোডিয়াম শরীরে রক্ত, কোষ, কলায় তরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। মুশকিল হল, বহু লোকই প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি মাত্রায় সোডিয়াম খেয়ে ফেলেন। সেক্ষেত্রে কিডনিকে বেশি কাজ করতে হয় এবং শরীর থেকে মূত্রের মাধ্যমে সোডিয়াম বের করে দিতে হয়। অর্থাত্ কিডনি হল শরীরে সোডিয়ামের মাত্রার প্রধান নিয়ন্ত্রক। অতিরিক্ত সোডিয়াম উচ্চ রক্তচাপ এবং অন্যান্য অনেক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে। এই কারণেই মাত্রাতিরিক্ত নুন খেতে নিষেধ করা হয় বেশিরভাগ ব্যক্তিকে।
উচ্চ সোডিয়াম গ্রহণ ও রক্তচাপ: লবণে থাকে সোডিয়াম। আর বেশি মাত্রায় সোডিয়াম গ্রহণের সঙ্গে রক্তচাপের মধ্যে যে সুসম্পর্ক রয়েছে তা আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। নানা সমীক্ষাতেই দেখা গিয়েছে, যে জনগোষ্ঠী উচ্চ মাত্রায় লবণ খান, তাঁদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপে ভোগা ব্যক্তির সংখ্যাও বেশি।
উচ্চ রক্তচাপ সম্পূর্ণরূপে নন কমিউনেকেবল ডিজিজ। নন কমিউনেকেবল ডিজিজ-এর মধ্যে রয়েছে ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরলের সমস্যাও! দেখা গিয়েছে কোনও ব্যক্তির একটি কমিউনেকেবল ডিজিজ থাকলে ও তা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অন্যান্য নন কমিউনেকেবল ডিজিজও শরীরে হানা দেয়। অর্থাত্ উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলে তা অন্যান্য অসুখকেও ডেকে আনতে পারে। আবার এও দেখা গিয়েছে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর একাংশ স্থূলত্বের সমস্যাতেও ভুগছেন। মনে রাখতে হবে, স্থূলত্ব প্রায় সব ধরনের নন কমিউনেকেবল ডিজিজকেই ডেকে আনে। এও দেখা গিয়েছে যে, স্থূলকায় ব্যক্তিরা মিষ্টি, নোনতা এবং ভাজা খাদ্য বেশি খান। প্রচুর মাত্রায় এই ধরনের খাদ্য একদিকে যেমন শরীরে মেদের মাত্রা বাড়ায় তেমনই নন কমিউনেকেবল ডিজিজকে আমন্ত্রণও জানায়।
বেশি মাত্রায় নুন গ্রহণ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা
অতিরিক্ত নুন খাওয়ার অর্থ হল মাত্রাতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ। মাত্রাতিরিক্ত সোডিয়াম ডেকে আনে অন্যান্য রোগ যেমন— হার্ট ফেলিওর / কিডনি সমস্যা এবং কিডনি স্টোন / ইডিমা বা শরীরে জল জমা। / স্ট্রোক / পাকস্থলীর ক্যান্সার / ভেন্ট্রিকুলার হাইপারট্রফি / অস্টিওপোরোসিস
সুস্থ থাকতে খাবারে লবণের মাত্রা কমান: ডাল, মাংস এবং দুগ্ধজাত খাদ্যে এমনিতেই সোডিয়াম থাকে। তবে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বা প্যাকেটজাত খাদ্যে অনেক বেশি মাত্রায় লবণ যোগ করা হয়। এই ধরনের খাদ্য খেলে শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে এবং তার সঙ্গে শরীরে হানা দিতে পারে নন কমিউনেকেবল ডিজিজ।
কী করবেন? প্রথমেই বলি, নুন খাওয়া কমিয়ে দিন। পাতেও কাঁচা নুন নেবেন না। চিন্তা করবেন না, কয়েকদিনের মধ্যে স্বাদকোরকগুলি অভ্যস্ত হয়ে যাবে। এখন অনেকে বলবেন, নুন পুরো ছেড়ে দিলে খাবারে স্বাদই থাকবে না! খাবার কীভাবে খাবেন? এক্ষেত্রে অন্যান্য মশলার উপর ভরসা করতে পারেন—
রান্নায় স্বাদ যোগ করার জন্য পার্সলে, অরিগ্যানোর মতো ভেষজ ব্যবহার করতে পারেন। রসুন, আদা ও মরিচের মতো মশলা এবং অন্যান্য স্বাদ বাড়ানো উপাদানও ব্যবহার করা যায়। স্বাদ বাড়ানোর দুর্দান্ত উপাদান হল লেবু! মাংস রান্নার আগে ম্যারিনেট করার জন্য লেবুর রস ব্যবহার করুন। স্বাদও বাড়বে, মাংস নরম আর তুলতুলে হবে। ফাস্ট ফুড এবং টেকওয়ে খাবার এড়িয়ে চলুন। এই ধরনের খাদ্যে থাকে প্রচুর নুন। রেস্তরাঁয় খেতে গেলে অনুরোধ করুন যাতে খাবারে কম লবণ মেশানো হয়।
•নোনতা বিস্কুট, চিপস, খাবেন না।
•চিজ, মাখন খাওয়ার অভ্যেস থাকলে কমিয়ে ফেলুন।
•খাবার নির্বাচনের আগে সতর্ক হন।
আমাদের খাদ্যতালিকার প্রায় ৭৫ শতাংশ লবণ প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে আসে। এই খাবারগুলিতে যোগ করা লবণ আলাদা করে চোখে দেখা যায় না। অর্থাত্ আমরা জানিই না যে কত পরিমাণ লবণ খাচ্ছি। মোদ্দা কথা, এমন বহু খাদ্য থাকে যার মধ্যে লুকনো লবণ থাকে। বিশেষ করে প্যাকেটজাত নানা খাদ্যেই লুকনো লবণ থাকে। তাই—
পণ্যের গায়ে বা প্যাকেটের গায়ে থাকা লেবেল পরীক্ষা করুন। প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যে সোডিয়ামের মাত্রা কত তাও দেখুন। প্যাকেটজাত রেডি টু ইট নাগেটস বা সংরক্ষিত মাংসের তুলনায় তাজা মাছ, মাংসে ভরসা রাখুন।
চানাচুর, ঝুরিভাজা বা এমন কুড়মুড়ে স্ন্যাক্স খাওয়া এড়িয়ে চলুন। অধিকাংশ ‘ফাস্টফুড’ যেমন পিত্জা, হ্যামবার্গার, চিপসেই থাকে লুকনো নুন যা আগেও বলা হয়েছে।
ইনস্ট্যান্ট পাস্তা, নুডলস বা স্যুপেও থাকে লুকনো নুন।
কতটুকু নুন খাওয়া যেতে পারে: সাধারণভাবে সারাদিনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ৫ গ্রামের বেশি নুন খাওয়া উচিত নয়। এই নুন কাঁচা অবস্থায় খাওয়া যাবে না। অর্থাত্ রান্নার সঙ্গে মেশানো থাকবে। এখন কোনও ব্যক্তি বুঝবেন কীভাবে যে রান্নার মাধ্যমে তিনি ৫ গ্রাম নুনই খেলেন? খুব সোজা। বাড়িতে ৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য থাকলে সারাদিনের রান্নার জন্য মাত্র ২০ গ্রাম নুন ব্যবহার করুন। গড়ে তাহলে সকলেই ৫ গ্রাম করে নুন খাবেন! এমনকী এই মাত্রার চাইতেও কম নুন রান্নায় ব্যবহার করলে সমস্যা নেই। কেননা নুন ছাড়াও একাধিক খাদ্য রয়েছে যার মধ্যে সোডিয়াম আছে। শিশুদের ক্ষেত্রে বলা যায়, প্রথম ছয় মাস নুন খাওয়ার প্রশ্ন নেই। তার পরেও ১ বছর পর্যন্ত নুন না দিলেও কিছু যাবে আসবে না। এরপর একচিমটে মাত্রায় নুন দেওয়া যায় স্বাদের জন্য। সমস্যা হল মোটামুটি এই বয়স থেকেই বাচ্চারা চিপস, নানা ধরনের বাজারচলতি প্যাকেটজাত ক্রাঞ্চি ভাজা খাদ্যবস্তু খেতে থাকে। তাই আজকাল অল্প বয়স থেকেই শিশুরা নোনতা খাবারের প্রতি বড় বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। টিনএজারদেরও মোটমুটি সারাদিনে ২ গ্রাম বা তার আশপাশে নুন খেলে চলে। অথচ দেখা যায় নানাভাবে তারা নোনতা খাদ্য খাচ্ছে। ফলে নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি নুন তারা খেয়ে ফেলছে অজান্তেই। পরবর্তীকালে যা উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার পিছনে জোগাচ্ছে ইন্ধন।
শরীরে সোডিয়াম ও জলের ভারসাম্যহীনতা : নুন বা লবণ সবসময় খারাপ এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। লবণের অভাবে হাইপোনেট্রেমিয়া দেখা দিতে পারে। খুব বেশি ডায়ারিয়া হলে শরীরে লবণের অভাব হতে পারে। লবণের অভাবে রোগীর শক, কোমায় চলে যাওযা এবং প্রাণহানি পর্যন্ত ঘটতে পারে। তাই এই ধরনের সমস্যা হলে অবশ্যই ওআরএস পান করতে হবে বা তার অভাবে পান করতে হবে নুন ও চিনি জল।
রক সল্ট খাওয়া যায়? সব ধরনের নুনের মূল উপাদান সোডিয়াম ও ক্লোরাইড। তাই অন্য নুন খেয়ে বিশেষ লাভ হবে না।
নুন এবং আয়োডিন
থাইরয়েড গ্রন্থি এবং আমাদের বিপাক নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন স্বাভাবিকভাবে কাজ করার জন্য আয়োডিন প্রয়োজন। এছাড়া
সন্তানসম্ভবা ও সন্তানকে ব্রেস্ট ফিডিং করাচ্ছেন এমন মহিলারও দরকার আয়োডিন। সন্তানের মস্তিষ্কের বিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে আয়োডিনের অভাব। আমাদের দেশে আয়োডিন যুক্ত নুন খাওয়া এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে বলে অনেকের দাবি। তবে বিকল্প হিসেবে দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য খাওয়া যায়।
খোলায় ভাজা নুন : নুন খোলায় ভেজে খেয়েও লাভ নেই। কারণ তাতে সোডিয়াম নুন থেকে উবে যায় না। সোডিয়াম উবে যাওয়ার জন্য যে পরিমাণ তাপমাত্রার প্রয়োজন তার আয়োজন গৃহস্থ বাড়িতে করা সম্ভব নয়। তাই নুন কম খাওয়াই ভালো।
অসুখ ও নুন : উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির অসুখ থাকলে চিকিত্সকের পরামর্শমতোই নুন খেতে হবে।
চিনি
চিনি বা সুগার হল একটি ধরনের শর্করা। অন্যান্য কার্বোহাইড্রেটের মতো, চিনিও আমাদের রোজকার কাজ চালানোর জন্য শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।
মানবদেহ কার্বোহাইড্রেটকে গ্লুকোজের মতো সরল শর্করায় ভেঙে দেয়। শরীরে গ্লুকোজকে সহজেই ব্যবহার করতে পারে।
সরল শর্করা এমন এক ধরনের কার্বোহাইড্রেট যার খুব স্বল্প মাত্রার মধ্যেও প্রচুর পরিমাণে এনার্জি থাকে। তাই মাত্রাতিরিক্ত চিনি বা চিনি মেশানো খাবার খেলে এবং উপযুক্ত কায়িক শ্রম না করলে অচিরেই স্থূলত্ব, ডায়াবেটিস এবং দাঁতের ক্ষয়ের মতো স্বাস্থ্য সমস্যা আক্রমণ করতে পারে। এছাড়া সরল শর্করায় ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের মতো অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকে না।
চিনি ও গ্লাইসেমিক ইনডেক্স : একটি খাদ্যের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) বলতে বোঝায়, ওই খাদ্যের মধ্যে থাকা কার্বোহাইড্রেট কত দ্রুত ভেঙে রক্তপ্রবাহে সুগারের মাত্রা বাড়ায়! সাধারণভাবে বলা যায় উচ্চ জিআই খাদ্য ‘নিম্ন জিআই’ খাদ্যের তুলনায় দ্রুত রক্তপ্রবাহে সুগারের মাত্রা বৃদ্ধি করে। জিআই যত কম হবে, খাবার গ্রহণের পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা তত ধীরে বাড়বে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সেদ্ধ আলুর জিআই প্রায় ৯০-এর কাছাকাছি। আবার মুসুর ডালের জিআই ৪০-এরও নীচে। মোটামুটি ৫০ –এর নীচে জিআই খাদ্যগুলি সবক্ষেত্রেই নিরাপদ। প্রশ্ন চিনির কত জিআই? হিসেব মতো ৬০-এর অনেক উপরে। বোঝাই যাচ্ছে চিনি হল উচ্চ জিআই যুক্ত খাদ্য।
সাম্প্রতিক বেশ কিছু গবেষণায় উচ্চ জিআই যুক্ত খাদ্যের সঙ্গে নিম্নলিখিত কিছু অবস্থার মধ্যে সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে— • পেটের অব্যবস্থা • টাইপ ২ ডায়াবেটিস • উচ্চ কোলেস্টেরল • হাইপারটেনশন (উচ্চ রক্তচাপ) • হৃদরোগ।
প্রশ্ন হল কীভাবে অসুখগুলি হতে পারে
চিনি ও স্থূলত্ব : চিনি মানেই সরল শর্করা এবং সরল শর্করা মানেই শরীরে এনার্জির মাত্রা বৃদ্ধি। সুতরাং বেশি মাত্রায় চিনি খেলে শরীরে প্রবেশ করে প্রচুর এনার্জি। শরীরচর্চা না করলে এই এনার্জি খরচ হবে না। বা বলা ভালো শরীর ওই বাড়তি শর্করাকে খরচ করতে না পেরে তাকে চর্বি হিসেবে দেহে সঞ্চয় করবে। বাড়তে থাকবে ওজন। এছাড়া বাড়ে রক্তে লিপিডের মাত্রাও। লিপিডের মাত্রা বাড়লে তা আবার হার্টের সমস্যাকেও আমন্ত্রণ জানায়।
চিনি ও ডায়াবেটিস: শরীর কার্বোহাইড্রেটকে ভেঙে গ্লুকোজ নামক একটি সহজ শর্করায় রূপান্তরিত করে। রক্তের মধ্যে গ্লুকোজ মেশে। অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামক একটি হরমোন বেরয় যা রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে। কীভাবে? ইনসুলিন গ্লুকোজকে শরীরের কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। ইনসুলিন যকৃতে অতিরিক্ত গ্লুকোজ সঞ্চয়েও সাহায্য করে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমতে শুরু করলে তখন যকৃত সেই ঘাটতি পূরণ করে। দেখা গিয়েছে মাত্রাতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট পূর্ণ খাদ্য খেলে স্থূলত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। দেখা দেয় টাইপ ২ ডায়াবেটিস। ডায়াবেটিস রোগীর জন্য সামান্য মাত্রার চিনিও নিরাপদ নয়। কারণ চিনি উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাদ্য। এই ধরনের রোগীকে খেতে হবে নিম্ন জিআইযুক্ত খাদ্য বা যে সমস্ত খাদ্য থেকে গ্লুকোজ ধীরে ধীরে শোষিত হয় এমন খাদ্য। কারণ কম জিআই যুক্ত খাদ্য রক্তে খুব ধীরে ধীরে শর্করা নিঃসরণ করে।
চিনি মেশানো খাবার এবং বাঙালি বাড়ি: সাধারণভাবে বাঙালি বাড়িতে চায়ে চিনি মিশিয়ে খাওয়া হয়। একবার বা দু’বার নয়, কিছু কিছু বাড়িতে বার দশেকও চা পান করার রেওয়াজ আছে। অনেক বাড়িতে আবার রান্নাতে চিনি মেশানো হয়। এভাবেও শরীরে প্রচুর পরিমাণে শর্করা প্রবেশ করে। বহরে বাড়ে চর্বির পরিমাণ। তবে এই চিনি আমরা চোখে দেখতে পাই। জানলে অবাক হবেন, সারাদিনে আমরা এমন বহু খাবার খাই যার মধ্যে লুকনো থাকে চিনি! পরিমাণ না বুঝে খাই বলে শরীরে অজান্তেই প্রবেশ করে প্রচুর পরিমাণে সুগার। এই ধরনের খাদ্যগুলিকেও চিহ্নিত করা দরকার।
বাজার চলতি মিষ্টি পানীয়ে ব্যাপকভাবে চিনি মেশানো হয়। এমনকী সরাসরি চিনি মেশানো না হলেও অন্য ধরনের সরল শর্করা মেশানো হয় যা চিনি খাওয়ারই শামিল হয়।
চকোলেট, বিস্কুট, কুকিজ, কেকের মতো খাবারেও প্রচুর চিনি মেশানো হয়। তাই অনেকে ডায়েট করার পর ভুল করে একাধিক বিস্কিট খেয়ে ফেলেন ফলে ওজন কমতে চায় না।
দাঁতের ক্ষয় ও চিনি: দাঁতের ক্ষয় এবং চিনির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ডেন্টাল প্লাক হল খাদ্য কণা, ব্যাকটেরিয়া এবং শ্লেষ্মা দিয়ে তৈরি একটি আঠালো উপাদান। প্লাকের ব্যাকটেরিয়া চিনিকে অ্যাসিড উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করে, যা দাঁতের উপরের নিরাপত্তাদায়ক পর্দা বা এনামেলকে ভেঙে ফেলে এবং দাঁতের ক্ষয় শুরু করে। সফট ড্রিঙ্কসে বিরাট মাত্রার চিনি থাকে যা দাঁতের ক্ষয়ের জন্য সবচেয়ে বিরাট অবদান রাখে। তাই মিষ্টি জাতীয় যে কোনও খাবার খাওয়ার পর অবশ্যই জল দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন।
কতটা চিনি খাবেন? চিনি খাওয়ারই দরকার নেই। রোজকার খাবার থেকে যেটুকু শর্করা আমরা পাই সেটুকুই যথেষ্ট।
ময়দা
আটা রিফাইন করে তৈরি হয় মিহি ময়দা। ময়দায় ক্যালোরির পরিমাণ বেশি তবে পুষ্টিগুণ খুবই কম। পিত্জা, রুটি, পুরি, গুজিয়া, শিঙাড়া, কচুরি, পুরি, কেক এবং বিস্কুট তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ময়দা। শুদ্ধ আটা বা ময়দার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স আটার চেয়ে অনেকগুণ বেশি। মাঝেমধ্যে ময়দা খাওয়া যায় তবে, অতিরিক্ত ময়দা খাওয়া অভ্যেস মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ এবং পাচনতন্ত্রের প্রভূত ক্ষতি করে।
ময়দা কেন স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ : ময়দা সরল শর্করাজাতীয় খাদ্য। অল্প পরিমাণ ময়দায় থাকে প্রচুর পরিমাণে ক্যালোরি। তবে ফাইবার, প্রোটিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ থাকে সামান্য! অন্যদিকে, পুরো আটা হল জটিল শর্করাজাতীয় খাদ্য যার মধ্যে থাকে পর্যাপ্ত মাত্রায় প্রোটিন, ফাইবার, ভিটামিন বি১, বি২, রাইবোফ্ল্যাভিন এবং ফোলেট। আমরা জানি মাত্রাতিরিক্ত ময়দার তৈরি খাদ্য খাওয়ার অভ্যেস ডায়াবেটিস, পিসিওডি এবং স্থূলত্বের মতো অসুখের দিকে আমাদের টেনে নিয়ে যায়।
একনজরে কী কী ক্ষতি হয়: • দ্রুত ওজন বাড়ায়। • বাড়ায় ডায়াবেটিসের আশঙ্কা। • হজমের সমস্যা দেখা দেয়। প্রতিদিন আটার তৈরি খাদ্য খাওয়ার অভ্যেস কোষ্ঠকাঠিন্য ডেকে আনে। • পর্যাপ্ত মাত্রায় পুষ্টিগুণ থাকে না। তাই নিয়মিত খেলে অপুষ্টি দেখা দিতে পারে। • ময়দা অম্লধর্মী। ফলে নিয়মিত খেলে শরীরে প্রদাহের মাত্রা বাড়ে।
সাবধান হন এখনই: বেশিরভাগ ময়দার খাবারই হয় ভাজা। উদাহরণ হিসেবে লুচি, পরোটা, শিঙাড়া, পুরির কথা বলা যায়। সুতরাং সহজ হিসেব কষলেই বোঝা যায়, ময়দার তৈরি যে কোনও ভাজা খাদ্যেই প্রচুর ক্যালোরি থাকে। কারণ একদিকে ময়দার সরল শর্করায় যেমন থাকে প্রচুর ক্যালোরি তেমনই তেলে ভাজা হয় বলে তার মধ্যে প্রচুর তেল ঢোকে। তেলের সঙ্গে ঢোকে ক্যালোরি। একটি শিঙাড়ায় থাকে প্রায় ২০০ ক্যালোরি এনার্জি! এই পরিমাণ এনার্জি ক্ষয় করতে হলে একজন ব্যক্তিকে কমপক্ষে আধ ঘণ্টা ধরে দৌড়াতে হবে বা ঘণ্টা দু’য়েক হাঁটতে হবে। সেটা কেউ করে বলে মনে হয় না। কী করবেন: ময়দা দিয়ে তৈরি খাবার খাওয়া কমিয়ে দিন। আটা দিয়ে তৈরি খাবার খান। মিল্ক ব্রেড নয়, বরং খান ব্রাউন ব্রেড। স্যান্ডুইচ তৈরির সময়েও ব্রাউন ব্রেড ব্যবহার করুন। ব্রাউন ব্রেড তৈরি হয় আটা দিয়ে। এছাড়া লুচি পরোটাও খান আটা দিয়ে। রুটি তৈরির সময় আটা, বাজরা, রাগি ব্যবহার করতে পারেন। মনে রাখবেন, একান্তই ময়দা খেতে হলে অবশ্যই সঙ্গে ভালো মাত্রায় ফাইবার যু্ক্ত খাদ্য খান। অর্থাত্ পাস্তা খেলে প্রচুর পরিমাণে গাজর, টম্যাটো, বিনস, ক্যাপসিকাম, শসা যোগ করুন। নুডলস খেলেও তাই করুন। এখন অবশ্য আটার পাস্তা, নুডলস চলে এসেছে বাজারে। তাও খেতে পারেন। মোট কথা সুস্থ থাকা আপনার হাতে।
উচ্চ সোডিয়াম গ্রহণ ও রক্তচাপ: লবণে থাকে সোডিয়াম। আর বেশি মাত্রায় সোডিয়াম গ্রহণের সঙ্গে রক্তচাপের মধ্যে যে সুসম্পর্ক রয়েছে তা আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। নানা সমীক্ষাতেই দেখা গিয়েছে, যে জনগোষ্ঠী উচ্চ মাত্রায় লবণ খান, তাঁদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপে ভোগা ব্যক্তির সংখ্যাও বেশি।
উচ্চ রক্তচাপ সম্পূর্ণরূপে নন কমিউনেকেবল ডিজিজ। নন কমিউনেকেবল ডিজিজ-এর মধ্যে রয়েছে ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরলের সমস্যাও! দেখা গিয়েছে কোনও ব্যক্তির একটি কমিউনেকেবল ডিজিজ থাকলে ও তা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অন্যান্য নন কমিউনেকেবল ডিজিজও শরীরে হানা দেয়। অর্থাত্ উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলে তা অন্যান্য অসুখকেও ডেকে আনতে পারে। আবার এও দেখা গিয়েছে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর একাংশ স্থূলত্বের সমস্যাতেও ভুগছেন। মনে রাখতে হবে, স্থূলত্ব প্রায় সব ধরনের নন কমিউনেকেবল ডিজিজকেই ডেকে আনে। এও দেখা গিয়েছে যে, স্থূলকায় ব্যক্তিরা মিষ্টি, নোনতা এবং ভাজা খাদ্য বেশি খান। প্রচুর মাত্রায় এই ধরনের খাদ্য একদিকে যেমন শরীরে মেদের মাত্রা বাড়ায় তেমনই নন কমিউনেকেবল ডিজিজকে আমন্ত্রণও জানায়।
বেশি মাত্রায় নুন গ্রহণ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা
অতিরিক্ত নুন খাওয়ার অর্থ হল মাত্রাতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ। মাত্রাতিরিক্ত সোডিয়াম ডেকে আনে অন্যান্য রোগ যেমন— হার্ট ফেলিওর / কিডনি সমস্যা এবং কিডনি স্টোন / ইডিমা বা শরীরে জল জমা। / স্ট্রোক / পাকস্থলীর ক্যান্সার / ভেন্ট্রিকুলার হাইপারট্রফি / অস্টিওপোরোসিস
সুস্থ থাকতে খাবারে লবণের মাত্রা কমান: ডাল, মাংস এবং দুগ্ধজাত খাদ্যে এমনিতেই সোডিয়াম থাকে। তবে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বা প্যাকেটজাত খাদ্যে অনেক বেশি মাত্রায় লবণ যোগ করা হয়। এই ধরনের খাদ্য খেলে শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে এবং তার সঙ্গে শরীরে হানা দিতে পারে নন কমিউনেকেবল ডিজিজ।
কী করবেন? প্রথমেই বলি, নুন খাওয়া কমিয়ে দিন। পাতেও কাঁচা নুন নেবেন না। চিন্তা করবেন না, কয়েকদিনের মধ্যে স্বাদকোরকগুলি অভ্যস্ত হয়ে যাবে। এখন অনেকে বলবেন, নুন পুরো ছেড়ে দিলে খাবারে স্বাদই থাকবে না! খাবার কীভাবে খাবেন? এক্ষেত্রে অন্যান্য মশলার উপর ভরসা করতে পারেন—
রান্নায় স্বাদ যোগ করার জন্য পার্সলে, অরিগ্যানোর মতো ভেষজ ব্যবহার করতে পারেন। রসুন, আদা ও মরিচের মতো মশলা এবং অন্যান্য স্বাদ বাড়ানো উপাদানও ব্যবহার করা যায়। স্বাদ বাড়ানোর দুর্দান্ত উপাদান হল লেবু! মাংস রান্নার আগে ম্যারিনেট করার জন্য লেবুর রস ব্যবহার করুন। স্বাদও বাড়বে, মাংস নরম আর তুলতুলে হবে। ফাস্ট ফুড এবং টেকওয়ে খাবার এড়িয়ে চলুন। এই ধরনের খাদ্যে থাকে প্রচুর নুন। রেস্তরাঁয় খেতে গেলে অনুরোধ করুন যাতে খাবারে কম লবণ মেশানো হয়।
•নোনতা বিস্কুট, চিপস, খাবেন না।
•চিজ, মাখন খাওয়ার অভ্যেস থাকলে কমিয়ে ফেলুন।
•খাবার নির্বাচনের আগে সতর্ক হন।
আমাদের খাদ্যতালিকার প্রায় ৭৫ শতাংশ লবণ প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে আসে। এই খাবারগুলিতে যোগ করা লবণ আলাদা করে চোখে দেখা যায় না। অর্থাত্ আমরা জানিই না যে কত পরিমাণ লবণ খাচ্ছি। মোদ্দা কথা, এমন বহু খাদ্য থাকে যার মধ্যে লুকনো লবণ থাকে। বিশেষ করে প্যাকেটজাত নানা খাদ্যেই লুকনো লবণ থাকে। তাই—
পণ্যের গায়ে বা প্যাকেটের গায়ে থাকা লেবেল পরীক্ষা করুন। প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যে সোডিয়ামের মাত্রা কত তাও দেখুন। প্যাকেটজাত রেডি টু ইট নাগেটস বা সংরক্ষিত মাংসের তুলনায় তাজা মাছ, মাংসে ভরসা রাখুন।
চানাচুর, ঝুরিভাজা বা এমন কুড়মুড়ে স্ন্যাক্স খাওয়া এড়িয়ে চলুন। অধিকাংশ ‘ফাস্টফুড’ যেমন পিত্জা, হ্যামবার্গার, চিপসেই থাকে লুকনো নুন যা আগেও বলা হয়েছে।
ইনস্ট্যান্ট পাস্তা, নুডলস বা স্যুপেও থাকে লুকনো নুন।
কতটুকু নুন খাওয়া যেতে পারে: সাধারণভাবে সারাদিনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ৫ গ্রামের বেশি নুন খাওয়া উচিত নয়। এই নুন কাঁচা অবস্থায় খাওয়া যাবে না। অর্থাত্ রান্নার সঙ্গে মেশানো থাকবে। এখন কোনও ব্যক্তি বুঝবেন কীভাবে যে রান্নার মাধ্যমে তিনি ৫ গ্রাম নুনই খেলেন? খুব সোজা। বাড়িতে ৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য থাকলে সারাদিনের রান্নার জন্য মাত্র ২০ গ্রাম নুন ব্যবহার করুন। গড়ে তাহলে সকলেই ৫ গ্রাম করে নুন খাবেন! এমনকী এই মাত্রার চাইতেও কম নুন রান্নায় ব্যবহার করলে সমস্যা নেই। কেননা নুন ছাড়াও একাধিক খাদ্য রয়েছে যার মধ্যে সোডিয়াম আছে। শিশুদের ক্ষেত্রে বলা যায়, প্রথম ছয় মাস নুন খাওয়ার প্রশ্ন নেই। তার পরেও ১ বছর পর্যন্ত নুন না দিলেও কিছু যাবে আসবে না। এরপর একচিমটে মাত্রায় নুন দেওয়া যায় স্বাদের জন্য। সমস্যা হল মোটামুটি এই বয়স থেকেই বাচ্চারা চিপস, নানা ধরনের বাজারচলতি প্যাকেটজাত ক্রাঞ্চি ভাজা খাদ্যবস্তু খেতে থাকে। তাই আজকাল অল্প বয়স থেকেই শিশুরা নোনতা খাবারের প্রতি বড় বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। টিনএজারদেরও মোটমুটি সারাদিনে ২ গ্রাম বা তার আশপাশে নুন খেলে চলে। অথচ দেখা যায় নানাভাবে তারা নোনতা খাদ্য খাচ্ছে। ফলে নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি নুন তারা খেয়ে ফেলছে অজান্তেই। পরবর্তীকালে যা উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার পিছনে জোগাচ্ছে ইন্ধন।
শরীরে সোডিয়াম ও জলের ভারসাম্যহীনতা : নুন বা লবণ সবসময় খারাপ এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। লবণের অভাবে হাইপোনেট্রেমিয়া দেখা দিতে পারে। খুব বেশি ডায়ারিয়া হলে শরীরে লবণের অভাব হতে পারে। লবণের অভাবে রোগীর শক, কোমায় চলে যাওযা এবং প্রাণহানি পর্যন্ত ঘটতে পারে। তাই এই ধরনের সমস্যা হলে অবশ্যই ওআরএস পান করতে হবে বা তার অভাবে পান করতে হবে নুন ও চিনি জল।
রক সল্ট খাওয়া যায়? সব ধরনের নুনের মূল উপাদান সোডিয়াম ও ক্লোরাইড। তাই অন্য নুন খেয়ে বিশেষ লাভ হবে না।
নুন এবং আয়োডিন
থাইরয়েড গ্রন্থি এবং আমাদের বিপাক নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন স্বাভাবিকভাবে কাজ করার জন্য আয়োডিন প্রয়োজন। এছাড়া
সন্তানসম্ভবা ও সন্তানকে ব্রেস্ট ফিডিং করাচ্ছেন এমন মহিলারও দরকার আয়োডিন। সন্তানের মস্তিষ্কের বিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে আয়োডিনের অভাব। আমাদের দেশে আয়োডিন যুক্ত নুন খাওয়া এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে বলে অনেকের দাবি। তবে বিকল্প হিসেবে দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য খাওয়া যায়।
খোলায় ভাজা নুন : নুন খোলায় ভেজে খেয়েও লাভ নেই। কারণ তাতে সোডিয়াম নুন থেকে উবে যায় না। সোডিয়াম উবে যাওয়ার জন্য যে পরিমাণ তাপমাত্রার প্রয়োজন তার আয়োজন গৃহস্থ বাড়িতে করা সম্ভব নয়। তাই নুন কম খাওয়াই ভালো।
অসুখ ও নুন : উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির অসুখ থাকলে চিকিত্সকের পরামর্শমতোই নুন খেতে হবে।
চিনি
চিনি বা সুগার হল একটি ধরনের শর্করা। অন্যান্য কার্বোহাইড্রেটের মতো, চিনিও আমাদের রোজকার কাজ চালানোর জন্য শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।
মানবদেহ কার্বোহাইড্রেটকে গ্লুকোজের মতো সরল শর্করায় ভেঙে দেয়। শরীরে গ্লুকোজকে সহজেই ব্যবহার করতে পারে।
সরল শর্করা এমন এক ধরনের কার্বোহাইড্রেট যার খুব স্বল্প মাত্রার মধ্যেও প্রচুর পরিমাণে এনার্জি থাকে। তাই মাত্রাতিরিক্ত চিনি বা চিনি মেশানো খাবার খেলে এবং উপযুক্ত কায়িক শ্রম না করলে অচিরেই স্থূলত্ব, ডায়াবেটিস এবং দাঁতের ক্ষয়ের মতো স্বাস্থ্য সমস্যা আক্রমণ করতে পারে। এছাড়া সরল শর্করায় ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের মতো অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকে না।
চিনি ও গ্লাইসেমিক ইনডেক্স : একটি খাদ্যের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) বলতে বোঝায়, ওই খাদ্যের মধ্যে থাকা কার্বোহাইড্রেট কত দ্রুত ভেঙে রক্তপ্রবাহে সুগারের মাত্রা বাড়ায়! সাধারণভাবে বলা যায় উচ্চ জিআই খাদ্য ‘নিম্ন জিআই’ খাদ্যের তুলনায় দ্রুত রক্তপ্রবাহে সুগারের মাত্রা বৃদ্ধি করে। জিআই যত কম হবে, খাবার গ্রহণের পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা তত ধীরে বাড়বে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সেদ্ধ আলুর জিআই প্রায় ৯০-এর কাছাকাছি। আবার মুসুর ডালের জিআই ৪০-এরও নীচে। মোটামুটি ৫০ –এর নীচে জিআই খাদ্যগুলি সবক্ষেত্রেই নিরাপদ। প্রশ্ন চিনির কত জিআই? হিসেব মতো ৬০-এর অনেক উপরে। বোঝাই যাচ্ছে চিনি হল উচ্চ জিআই যুক্ত খাদ্য।
সাম্প্রতিক বেশ কিছু গবেষণায় উচ্চ জিআই যুক্ত খাদ্যের সঙ্গে নিম্নলিখিত কিছু অবস্থার মধ্যে সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে— • পেটের অব্যবস্থা • টাইপ ২ ডায়াবেটিস • উচ্চ কোলেস্টেরল • হাইপারটেনশন (উচ্চ রক্তচাপ) • হৃদরোগ।
প্রশ্ন হল কীভাবে অসুখগুলি হতে পারে
চিনি ও স্থূলত্ব : চিনি মানেই সরল শর্করা এবং সরল শর্করা মানেই শরীরে এনার্জির মাত্রা বৃদ্ধি। সুতরাং বেশি মাত্রায় চিনি খেলে শরীরে প্রবেশ করে প্রচুর এনার্জি। শরীরচর্চা না করলে এই এনার্জি খরচ হবে না। বা বলা ভালো শরীর ওই বাড়তি শর্করাকে খরচ করতে না পেরে তাকে চর্বি হিসেবে দেহে সঞ্চয় করবে। বাড়তে থাকবে ওজন। এছাড়া বাড়ে রক্তে লিপিডের মাত্রাও। লিপিডের মাত্রা বাড়লে তা আবার হার্টের সমস্যাকেও আমন্ত্রণ জানায়।
চিনি ও ডায়াবেটিস: শরীর কার্বোহাইড্রেটকে ভেঙে গ্লুকোজ নামক একটি সহজ শর্করায় রূপান্তরিত করে। রক্তের মধ্যে গ্লুকোজ মেশে। অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামক একটি হরমোন বেরয় যা রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে। কীভাবে? ইনসুলিন গ্লুকোজকে শরীরের কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। ইনসুলিন যকৃতে অতিরিক্ত গ্লুকোজ সঞ্চয়েও সাহায্য করে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমতে শুরু করলে তখন যকৃত সেই ঘাটতি পূরণ করে। দেখা গিয়েছে মাত্রাতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট পূর্ণ খাদ্য খেলে স্থূলত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। দেখা দেয় টাইপ ২ ডায়াবেটিস। ডায়াবেটিস রোগীর জন্য সামান্য মাত্রার চিনিও নিরাপদ নয়। কারণ চিনি উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাদ্য। এই ধরনের রোগীকে খেতে হবে নিম্ন জিআইযুক্ত খাদ্য বা যে সমস্ত খাদ্য থেকে গ্লুকোজ ধীরে ধীরে শোষিত হয় এমন খাদ্য। কারণ কম জিআই যুক্ত খাদ্য রক্তে খুব ধীরে ধীরে শর্করা নিঃসরণ করে।
চিনি মেশানো খাবার এবং বাঙালি বাড়ি: সাধারণভাবে বাঙালি বাড়িতে চায়ে চিনি মিশিয়ে খাওয়া হয়। একবার বা দু’বার নয়, কিছু কিছু বাড়িতে বার দশেকও চা পান করার রেওয়াজ আছে। অনেক বাড়িতে আবার রান্নাতে চিনি মেশানো হয়। এভাবেও শরীরে প্রচুর পরিমাণে শর্করা প্রবেশ করে। বহরে বাড়ে চর্বির পরিমাণ। তবে এই চিনি আমরা চোখে দেখতে পাই। জানলে অবাক হবেন, সারাদিনে আমরা এমন বহু খাবার খাই যার মধ্যে লুকনো থাকে চিনি! পরিমাণ না বুঝে খাই বলে শরীরে অজান্তেই প্রবেশ করে প্রচুর পরিমাণে সুগার। এই ধরনের খাদ্যগুলিকেও চিহ্নিত করা দরকার।
বাজার চলতি মিষ্টি পানীয়ে ব্যাপকভাবে চিনি মেশানো হয়। এমনকী সরাসরি চিনি মেশানো না হলেও অন্য ধরনের সরল শর্করা মেশানো হয় যা চিনি খাওয়ারই শামিল হয়।
চকোলেট, বিস্কুট, কুকিজ, কেকের মতো খাবারেও প্রচুর চিনি মেশানো হয়। তাই অনেকে ডায়েট করার পর ভুল করে একাধিক বিস্কিট খেয়ে ফেলেন ফলে ওজন কমতে চায় না।
দাঁতের ক্ষয় ও চিনি: দাঁতের ক্ষয় এবং চিনির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ডেন্টাল প্লাক হল খাদ্য কণা, ব্যাকটেরিয়া এবং শ্লেষ্মা দিয়ে তৈরি একটি আঠালো উপাদান। প্লাকের ব্যাকটেরিয়া চিনিকে অ্যাসিড উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করে, যা দাঁতের উপরের নিরাপত্তাদায়ক পর্দা বা এনামেলকে ভেঙে ফেলে এবং দাঁতের ক্ষয় শুরু করে। সফট ড্রিঙ্কসে বিরাট মাত্রার চিনি থাকে যা দাঁতের ক্ষয়ের জন্য সবচেয়ে বিরাট অবদান রাখে। তাই মিষ্টি জাতীয় যে কোনও খাবার খাওয়ার পর অবশ্যই জল দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন।
কতটা চিনি খাবেন? চিনি খাওয়ারই দরকার নেই। রোজকার খাবার থেকে যেটুকু শর্করা আমরা পাই সেটুকুই যথেষ্ট।
ময়দা
আটা রিফাইন করে তৈরি হয় মিহি ময়দা। ময়দায় ক্যালোরির পরিমাণ বেশি তবে পুষ্টিগুণ খুবই কম। পিত্জা, রুটি, পুরি, গুজিয়া, শিঙাড়া, কচুরি, পুরি, কেক এবং বিস্কুট তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ময়দা। শুদ্ধ আটা বা ময়দার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স আটার চেয়ে অনেকগুণ বেশি। মাঝেমধ্যে ময়দা খাওয়া যায় তবে, অতিরিক্ত ময়দা খাওয়া অভ্যেস মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ এবং পাচনতন্ত্রের প্রভূত ক্ষতি করে।
ময়দা কেন স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ : ময়দা সরল শর্করাজাতীয় খাদ্য। অল্প পরিমাণ ময়দায় থাকে প্রচুর পরিমাণে ক্যালোরি। তবে ফাইবার, প্রোটিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ থাকে সামান্য! অন্যদিকে, পুরো আটা হল জটিল শর্করাজাতীয় খাদ্য যার মধ্যে থাকে পর্যাপ্ত মাত্রায় প্রোটিন, ফাইবার, ভিটামিন বি১, বি২, রাইবোফ্ল্যাভিন এবং ফোলেট। আমরা জানি মাত্রাতিরিক্ত ময়দার তৈরি খাদ্য খাওয়ার অভ্যেস ডায়াবেটিস, পিসিওডি এবং স্থূলত্বের মতো অসুখের দিকে আমাদের টেনে নিয়ে যায়।
একনজরে কী কী ক্ষতি হয়: • দ্রুত ওজন বাড়ায়। • বাড়ায় ডায়াবেটিসের আশঙ্কা। • হজমের সমস্যা দেখা দেয়। প্রতিদিন আটার তৈরি খাদ্য খাওয়ার অভ্যেস কোষ্ঠকাঠিন্য ডেকে আনে। • পর্যাপ্ত মাত্রায় পুষ্টিগুণ থাকে না। তাই নিয়মিত খেলে অপুষ্টি দেখা দিতে পারে। • ময়দা অম্লধর্মী। ফলে নিয়মিত খেলে শরীরে প্রদাহের মাত্রা বাড়ে।
সাবধান হন এখনই: বেশিরভাগ ময়দার খাবারই হয় ভাজা। উদাহরণ হিসেবে লুচি, পরোটা, শিঙাড়া, পুরির কথা বলা যায়। সুতরাং সহজ হিসেব কষলেই বোঝা যায়, ময়দার তৈরি যে কোনও ভাজা খাদ্যেই প্রচুর ক্যালোরি থাকে। কারণ একদিকে ময়দার সরল শর্করায় যেমন থাকে প্রচুর ক্যালোরি তেমনই তেলে ভাজা হয় বলে তার মধ্যে প্রচুর তেল ঢোকে। তেলের সঙ্গে ঢোকে ক্যালোরি। একটি শিঙাড়ায় থাকে প্রায় ২০০ ক্যালোরি এনার্জি! এই পরিমাণ এনার্জি ক্ষয় করতে হলে একজন ব্যক্তিকে কমপক্ষে আধ ঘণ্টা ধরে দৌড়াতে হবে বা ঘণ্টা দু’য়েক হাঁটতে হবে। সেটা কেউ করে বলে মনে হয় না। কী করবেন: ময়দা দিয়ে তৈরি খাবার খাওয়া কমিয়ে দিন। আটা দিয়ে তৈরি খাবার খান। মিল্ক ব্রেড নয়, বরং খান ব্রাউন ব্রেড। স্যান্ডুইচ তৈরির সময়েও ব্রাউন ব্রেড ব্যবহার করুন। ব্রাউন ব্রেড তৈরি হয় আটা দিয়ে। এছাড়া লুচি পরোটাও খান আটা দিয়ে। রুটি তৈরির সময় আটা, বাজরা, রাগি ব্যবহার করতে পারেন। মনে রাখবেন, একান্তই ময়দা খেতে হলে অবশ্যই সঙ্গে ভালো মাত্রায় ফাইবার যু্ক্ত খাদ্য খান। অর্থাত্ পাস্তা খেলে প্রচুর পরিমাণে গাজর, টম্যাটো, বিনস, ক্যাপসিকাম, শসা যোগ করুন। নুডলস খেলেও তাই করুন। এখন অবশ্য আটার পাস্তা, নুডলস চলে এসেছে বাজারে। তাও খেতে পারেন। মোট কথা সুস্থ থাকা আপনার হাতে।
অনুলিখন: সুপ্রিয় নায়েক



