


গান ছিল তাঁর প্রাণ। শুক্রবার বিকেলে সিঙ্গাপুরে নর্থইস্ট ফেস্টিভ্যালে পারফর্ম করার কথা ছিল জুবিন গর্গের। দুপুর নাগাদ স্কুবা ডাইভিংয়ে গিয়েছিলেন। নেহাৎই শখপূরণ। কিন্তু আর যে ফেরা হবে না, তা ভাবেননি তাঁর অগণিত অনুরাগী। সূত্রের খবর, শুক্রবার দুপুর দেড়টা নাগাদ স্কুবা ডাইভিং করতে নেমেছিলেন জুবিন। সমুদ্রের মধ্যেই শুরু হয় শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা। তাঁকে উদ্ধার করে সিঙ্গাপুর পুলিশ। তড়িঘড়ি নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। তবে ব্যর্থ হয় চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা। আইসিইউতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর প্রয়াণে শোকজ্ঞাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি লিখেছেন, ‘সঙ্গীতের প্রতি তাঁর অসাধারণ অবদান সকলে মনে রাখবেন।’
জুবিন জোর গলায় বলতে পারতেন, ‘আমি বলিউডকে পছন্দ করি না।’ মনে করতেন, মুম্বইয়ে থাকা মানেই অর্ধেক জীবন ট্রাফিক জ্যামেই চলে যাবে। কংক্রিটের জীবনের চেয়ে ঢের ভালো পাহাড়ে থাকা। নদীর গন্ধ, মাছের স্বাদ, মাটির কাছাকাছি থাকার সুযোগ তাঁর কাছে আশীর্বাদ। উত্তর পূর্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাঁর কণ্ঠে এক সময় মজেছিল বাংলা, গোটা দেশ। শুক্রবার দুপুরে সেই শিল্পীর আকস্মিক প্রয়াণের খবরে ভেঙে পড়েন অনুরাগীরা। বয়স হয়েছিল মাত্র ৫২ বছর। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, ‘অসমের বড় ক্ষতি। ও যে শূন্যস্থান রেখে গেল, তা অপূরণীয়।’
জন্ম মেঘালয়ের তুরাতে। ১৯৭২ সালে। পরে অসমে চলে আসেন পরিবারের সঙ্গে। গান ছিল তাঁর রক্তে। মা গায়িকা। বাবা গীতিকার, কবি। বড় হওয়া সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীত কন্ডাক্টর জুবিন মেহতার নামানুসারে নাম রাখা হয় তাঁর। জুবিনের একের পর এক গান শ্রোতা হৃদয়ে গেঁথে রয়েছে। তিনিই প্রথম শিল্পী যিনি উত্তর-পূর্বের প্রত্যেকটি রাজ্যের জন্য গেয়েছিলেন। ১২টি বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। ‘গ্যাংস্টার’ ছবির ‘ইয়া আলি’ গানটি জুবিনের কেরিয়ারে মাইলস্টোন। ‘কৃষ ৩’ ছবির ‘দিল তু হি বাতা’র মতো একাধিক গান মনে রাখবেন শ্রোতারা। বাংলাতেও তাঁর গানের সংখ্যা কম নয়। ‘পরাণ যায় জ্বলিয়া রে’, ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-র মতো একাধিক ছবির গান তাঁকে পরিচিতি দিয়েছে। ৪০টিরও বেশি ভাষায় জুবিন গান গেয়েছেন তিন দশকের কেরিয়ারে। কণ্ঠই তাঁকে ‘সাংস্কৃতিক আইকন’ হিসেবে জনপ্রিয়তা দিয়েছে। তবে কেবল গায়ক হিসেবেই নন, গীতিকার কম্পোজার, সঙ্গীত পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, কবি... নানা ভূমিকায় সমৃদ্ধ করেছেন ভারতীয় সংস্কৃতি জগৎকে। মানুষ হিসেবেও বড় মনের পরিচয় দিয়েছিলেন। করোনাকালে সাধারণের জন্য খুলে দিয়েছিলেন বাড়ির অন্দরমহল। সাফল্যের মাঝেও বিতর্ক জুবিনের পিছু ছাড়েনি। হেসে বলতেন, ‘আই অ্যাম আ ম্যান অব কন্ট্রোভার্সি’। এক অনুষ্ঠানে বেসামাল অবস্থায় গাইতে ওঠা নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। ২০১৬ সালে অসমে বিজেপির ক্ষমতায় আসার অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল তাঁর গান। সেই তিনিই ২০১৯ সালে এনআরসি-র বিরোধিতা করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘বিজেপিকে আমি যে ভোট দিয়েছিলাম, তা ফেরত দেওয়া হোক।’ ভারতরত্নদের অসম্মানের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে সে বছরই এফআইআর করেছিল বিজেপি সরকার। কামাখ্যা মন্দিরে বলি বন্ধের ডাক, বিহুর মঞ্চে হিন্দি গান... একের পর বিতর্কে জড়িয়েছিলেন তিনি। সওয়াল করতেন স্বাধীন শিল্পীদের জন্য। তাঁর স্বাধীনচেতা স্বভাবই মনে রাখবেন অগণিত ভক্ত।