সুরেন নামে এক যুবক তখন চাকরি ছেড়ে মাত্র কয়েকদিন মঠে এসে উঠেছেন। স্বামীজী তাঁকে এবং আরেকজন ব্রহ্মচারীকে স্বামী অখণ্ডানন্দের কাছে সারগাছিতে পাঠালেন। সুরেনকে বলে দিলেন, “তুই তো কেরানিগিরি করতিস, অফিসের কাজ তাই সব জানিস—স্টেটমেণ্ট লেখা, হিসাব রাখা প্রভৃতি সব অফিসের কাজকর্ম করতে পারবি।” সুরেনের তখনও ব্রহ্মচর্য নেওয়া হয়নি, মাত্র দিন পাঁচ-সাত চাকরি ছেড়ে মঠে এসেছে, একখানা গেরুয়া পরে এসে হাজির। তিনি একটানা এগারো মাস স্বামী অখণ্ডানন্দজীর কাছে থেকে রিলিফ ওয়ার্ক করেন। মুর্শিদাবাদের ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ই.ভি. লেভিঞ্জ এবং জজ প্যান্টন সাহেব প্রমুখের বহু সুখ্যাতি স্বামী অখণ্ডানন্দ করতেন। এইসব সাহেবের সহায়তায় রিলিফের কাজ বা আশ্রমের কাজকর্মের বহু সুবিধা নানা সময়ে হয়েছে। রিলিফের কাজ যখন হয়, তখন এই কাজে যুক্ত সাধুদের বাসস্থানে বা আশ্রমে রান্নাবান্না হতো না। এঁরা ভিক্ষা করেই পরের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া সেরে আসতেন। আমাদের দেশি লোকেদের চেয়ে সাহেবরা মিশন বা রিলিফ ওয়ার্ক—এসবের utility খুব বেশি appreciate করেন। স্বামী অখণ্ডানন্দ বলেন, “আর এই যে ভিক্ষা করে খেয়ে দিনরাত পরহিতের জন্য খাটা, এতে ওঁদের চমক লেগে যায়।” মহুলার রিলিফ ওয়ার্ক তখন প্রায় শেষ। একরকম শেষ মিটিং হয়ে গিয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট লেভিঞ্জ সাহেব নিজহাতে সেদিন কাপড় বিলি করলেন। বেলুড় মঠ থেকে প্রতিনিধি হিসাবে স্বামী ত্রিগুণাতীত এসেছেন এবং তিনিও সভায় প্রবন্ধ পাঠ করলেন। সেদিন ভাত, ডাল, দই, গুড় প্রভৃতি দুঃস্থদের খাওয়ানো হলো। সব যেন মধুরেণ সমাপয়েৎ। আর দু-এক সপ্তাহ ত্রাণের চাল প্রভৃতি বিতরণ করা হবে—এরকম ছোটখাটো কাজ বাকি আছে।
Advertisement
মুর্শিদাবাদের রিলিফ ওয়ার্ক শেষ হলো। রিলিফ কমিটির হিসাবপত্রও একরকম শেষ হয়ে গিয়েছে। এই জেলার কাজ শেষ করে উদ্বৃত্ত পাঁচ হাজার টাকা কলকাতায় কেন্দ্রীয় দুর্ভিক্ষ ভাণ্ডারে ফেরত দেওয়া হবে। রিলিফ কমিটির সেক্রেটারি কালেকটর সাহেব এবং ডেপুটি সেক্রেটারি নৃত্যগোপালবাবু প্রমুখ টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে সবকিছু ঠিক করে ফেলেছেন। এমন সময় অখণ্ডানন্দজী দু-চার দিনের জন্য জঙ্গিপুরে উকিল কালীবাবুর নিমন্ত্রণে তাঁর বাড়িতে গেলেন। সেখানে গিয়ে শুনলেন গঙ্গার ওপারে কান্দি মহকুমার নবগ্রাম থানা এলাকায় বহু লোকের চরম দুরবস্থা। অখণ্ডানন্দজী বহরমপুরে ফিরে রিলিফ কমিটির কাছে এই সংবাদ উত্থাপন করলেন। এদিকে রিলিফ বন্ধ করবার ব্যাপারে সব ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছে। কাজেই মহারাজের ঐ কথার অনুমোদন কেউ করলেন না। অখণ্ডানন্দজী তখন নিজেই কোনোরূপ হতাশ না হয়ে এই ব্যাপারে তদন্ত করতে পাঁচগাঁয় জমিদারের কাছারিতে গেলেন। গিয়ে দেখেন আশপাশের গ্রামের শ-তিনেক লোক সাহায্যপ্রার্থী। জমিদারের কাছারিতে অখণ্ডানন্দজীর সঙ্গে দেখা করতে এসেই তো দু-জন অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। মহারাজ যথাযথ অবস্থা দেখে ফিরে এলেন। তাঁর ফেরার সময় সেইসব দুঃস্থ লোক তাঁকে বললেন, “বাবা, আমাদের যেন ভুলে যেয়ো না।” অখণ্ডানন্দজীর কাছে সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে কালেকটর সাহেব অফিসিয়াল তদন্তের জন্য ভারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীর কাছে রিপোর্ট চাইলেন।
সরসীলাল সরকারের ‘অখণ্ডানন্দজীর স্মৃতি’ থেকে
সরসীলাল সরকারের ‘অখণ্ডানন্দজীর স্মৃতি’ থেকে


