প্রিয়ব্রত দত্ত: পরিচালক রোহন সেনের ছবি ‘শেষবেলা’র আউটডর শ্যুটিং চলছে। বাসন্তী হাইওয়ে সংলগ্ন নলবনে তখন ভরদুপুর। সবুজ ঘাসে মোড়া দিঘির পাড়ে তৈরি হয়েছে ছাদনাতলার সেট। বিয়ের উপকরণ সাজানো। শট রেডি। পরিচালক হাঁক পাড়লেন ‘আর্টিস্ট’। অল্পক্ষণ পরেই মেকআপ ভ্যান থেকে বেরিয়ে এলেন সত্যম ভট্টাচাৰ্য ও সুরঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়। লাল বেনারসিতে বধূবেশে সুরঙ্গনা। সত্যমের পরনে গরদের পাঞ্জাবি। বিয়ের আসরে বেশি লোকের ভিড় নেই। সামনে রাখা হোমকুণ্ডে আগুন জ্বালানো হল। পরিচালক ‘অ্যাকশন’ বলে উঠলেন। খই পোড়ানোর দৃশ্য। হোমের আগুন আর রোদের তাপে ছবির নায়ক-নায়িকার তখন গলদঘর্ম অবস্থা। তার মধ্যেই মালা বদল, শুভদৃষ্টি ইত্যাদি নানা বৈবাহিক উপাচার সম্পন্ন হতেই লাঞ্চ ব্রেক দিলেন পরিচালক। ছবির হিরো-হিরোইন দৌড়লেন ‘কস্টিউম’ বদল করতে।
ভরদুপুরে বিয়ের লগ্ন? হাসলেন রোহন। ‘এটাই তো সাসপেন্স। কারণটা এখন বলা যাবে না।’ প্রথমবার গ্রাম্য পটভূমির উপর ছবি তৈরি করছেন তিনি। কাহিনিকার আদিত্যনাথ মুখোপাধ্যায়। চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন কেশবানন্দ মুখোপাধ্যায়, অনুভব ঘোষ ও পরিচালক স্বয়ং। রোহনের দাবি, একটি না বলা প্রেমের গল্প চলচ্চিত্রায়িত করতে চলেছেন তিনি।
‘বল্লভপুরের রূপকথা’র পর বড়পর্দায় আবার জুটি বাঁধলেন সত্যম-সুরঙ্গনা। এবারের প্রেক্ষিত ভিন্ন। ‘শেষবেলা’য় কলেজ পড়ুয়া গ্রাম্য যুবতী স্বপ্নার চরিত্রে সুরঙ্গনা। সত্যম অভিনীত চরিত্রের নাম রূপক। শিক্ষিত ছেলেটির এখনও চাকরি জোটেনি। গ্রামেই গৃহশিক্ষকতা করে। স্বপ্নাকে পড়ায়। দরিদ্র, পারিবারিক নানা দুর্ঘটনায় বিব্রত স্বপ্নার অভিভাবকও বটে সে। রোহনের কথায়, ‘ওদের দু’জনের সম্পর্কে রসায়নটাই ছবির মূল উপজীব্য।’ সাম্প্রতিক সময়ে সাসপেন্স থ্রিলার বা মনস্তত্ত্ব নির্ভর বাংলা ছবির আবহে এমন প্রেমের উপাখ্যান কতটা জায়গা করে নিতে পারবে? রোহনের জবাব, ‘আমি সম্পর্কের গল্প বুনতে ভালোবাসি। গ্রামের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন টানাপোড়েনের গল্প বলার জন্যই এই ছবিটা করছি।’
লাঞ্চ ব্রেক শেষ। সুরঙ্গনা এবার আটপৌরে গ্রামীণ যুবতীর কস্টিউমে। নায়িকা বললেন, ‘একটি সাধারণ মেয়ের আত্মমর্যাদা রক্ষার লড়াই অনুপ্রাণিত করেছে বলেই চরিত্রটিতে অভিনয় করছি। আমি শহরে বড় হয়েছি। গ্রামের মানুষদের খুবই কম চিনি, জানি। তাই সারল্য আনতে গিয়ে যেন অতিরঞ্জিত কিছু না করে ফেলি, সেটা খেয়াল রাখি। স্টিরিওটাইপ যাতে না হয়ে যায়।’ আর রূপক কেমন? সত্যম ব্যাখ্যা করলেন, ‘প্রত্যেকের জীবনের শিকড়টা কোনও না কোনওভাবে গ্রাম জীবনের গভীরে রয়েই গিয়েছে। শহুরে দ্রুত ছবি দেখতে অভ্যস্ত আমাদের এই ধরনের ধীর লয়ের ছবিরও প্রয়োজন আছে।’
কথায়, কাজে তখন সত্যিই শেষবেলা। নদীর পাড়ে শট। দিঘিটাই তখন ক্যামেরার কায়দায় নদী। বাঁশ দিয়ে তৈরি ধাপ। ঘাটে কয়েক ধাপ নেমে জলে পা ডুবিয়ে জামা কাচতে বসেছে স্বপ্না। এমন সময় ঘাটের কাছে নিঃশব্দে একটি নৌকো এসে ভিড়ল। নৌকোয় টলমল পঞ্চায়েত প্রধানের মদ্যপ ছেলে। স্বপ্নাকে দেখে নৌকো থেকে লাফ দিয়ে ঘাটে নামতে গিয়ে জলে পড়ে যায় পঞ্চায়েত পুত্র দীপু (দুর্বার শর্মা)। ভয়ে, রাগে গ্রামের পথে দৌড় দেয় স্বপ্না। ‘কাট’ বলে উঠলেন রোহন।