নিজস্ব প্রতিনিধি,বারাকপুর: বারাকপুর শিল্পাঞ্চলে গেরুয়া ঝড় বয়ে গেল। প্রতিটি কেন্দ্রই তৃণমূলের হাত থেকে দখল নিল বিজেপি। ভোটের দিন বারাকপুর শিল্পাঞ্চলে বড়ো গোলমাল না-হলেও গণনার দিন গণনাকেন্দ্রের মধ্যেই তৃণমূল প্রার্থী ও কর্মীদের আক্রান্ত হতে হল। সোমবার বারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ছয়টি বিধানসভা আসনের গণনা শুরু হয় ব্যারাকপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। গণনা খুবই স্লো হয়। পোস্টাল ব্যালটের পরে গণনা হয় ইভিএমে। বেলা গড়াতেই দেখা গেল ছয়টি আসনে লিড বাড়ছে বিজেপির।
এমন সময় জানা যায়, গণনা কেন্দ্রের ভিতরেই বীজপুর আসনের তৃণমূলের কয়েকজন এজেন্ট আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের রক্ষা করতে গিয়ে আক্রান্ত হন বীজপুরের তৃণমূল প্রার্থী সুবোধ অধিকারী। তাঁকেও ব্যাপক মারধর করা হয়। ছিঁড়ে দেওয়া হয় তাঁর জামা। এমনকি নোয়াপাড়া তৃণমূল প্রার্থী তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যকে দফায় দফায় আক্রান্ত হতে হয়। অভিযোগের তির বিজেপি কর্মীদের বিরুদ্ধে। তৃণাঙ্কুর বলেন, আমাদের এজেন্টদের মেরে বের করে দেওয়া হচ্ছিল, আমি তার প্রতিবাদ করেছি। তাই আমাকে মারধর করা হল। গণনায় একরকম ফলাফল হচ্ছে, লেখা হচ্ছে আরেকরকম। ভয়ংকর বিক্ষোভ দেখানো হল, জগদ্দল এর তৃণমূল প্রার্থী সোমনাথ শ্যামকে। গণনাকেন্দ্র থেকে বেরোনোর সময় তাঁকে লক্ষ্য করে ইটবৃষ্টি হয়। তাঁর ভাই সঞ্জয় শ্যামকে দেওয়া হয় ধাক্কা। বারাকপুরের বিধায়ক রাজ চক্রবর্তী গণনাকেন্দ্র ছাড়ার সময় তাঁর গায়ে কাদা ছিটিয়ে দেওয়া হয়। ‘চোর চোর’ স্লোগানও শুনতে হল তাঁকে।
কিন্তু দেখা গেল এই গোলমালের মধ্যেই রাজনৈতিক সৌজন্যের চূড়ান্ত নিদর্শন রাখলেন ভাটপাড়ার বিজেপি প্রার্থী পবনকুমার সিং। নির্বাচনে তাঁর মূল প্রতিপক্ষ তৃণমূলের প্রার্থী অমিত গুপ্তাকে আগলে রাখলেন। তাঁর সঙ্গে থাকা নিরাপত্তা কর্মীদের সাহায্য নিয়ে পবন ওই স্থান থেকে সরিয়ে নিয়ে যান ভাটপাড়ার তৃণমূল প্রার্থী অমিত গুপ্তাকে।
উল্লেখ্য, ভাটপাড়ার বেতাজ বাদশা অর্জুন সিংয়ের পুত্র পবনকুমার সিং ২০১৯ সালের উপনির্বাচন থেকে এই কেন্দ্রে জিতে আসছেন। এবারও তিনি জিতলেন প্রায় ২২,৮০৭ ভোটে। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণের হাত থেকে বাঁচালেন ঠান্ডা মাথায়। পরে ভাটপাড়ার তৃণমূল প্রার্থীও তা স্বীকার করে নিয়ে পবন সিংয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
অমিত গুপ্তা বলেন, ভাটপাড়া আমাদের ছিল না, আমরা এবার চেষ্টা করেছিলাম জেতার। আমাদের কাজ মানুষ হয়তো পছন্দ করেননি। তাঁরা হয়তো বিশ্বাস করেননি আমাদের প্রতিশ্রুতি। মানুষের রায় মাথা পেতে নেব। তবে বিজয়ী প্রার্থী বিজেপির পবন সিংকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ও আজ যে রাজনৈতিক সৌজন্য দেখাল সেটা মন ছুঁয়ে গেল। ভাটপাড়ার মানুষ ওকে আরো পাঁচবছর কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন, ও সেটা পালন করবে বলেই আশা করি।
অপর দিকে, অর্জুনপুত্র পবন সিং বলেন, আমি এবার জয়ের হ্যাটট্রিক করলাম, কিন্তু এবারের জয় আলাদা। আমরা সরকার গড়ছি, ফলে গত দুবার যেসব কাজ করতে পারিনি, এবার সেইসমস্ত কাজ করে দেখাব। গণনাকেন্দ্রের মধ্যেই বিজেপি কর্মীদের রোষের মুখ থেকে বিপক্ষ প্রার্থীকে রক্ষা করায় স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে পবন সিং সকলের প্রশংসা পাচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, শিক্ষণীয়।
বীজপুরের বিজেপি প্রার্থী সুদীপ্ত দাস ১৩১১২, নৈহাটির বিজেপি প্রার্থী সুমিত চট্টোপাধ্যায় ১০৪৩০, জগদ্দলের রাজেশ কুমার ১৫,৭৮৯, নোয়াপাড়ায় অর্জুন সিং ২৫৫৩১ এবং বারাকপুরে কৌস্তভ বাগচী ১৬,৬৮৭ ভোটে জয়ী হলেন। অর্জুন সিং জানালেন, তৃণমূলের বিরুদ্ধে মানুষের রায়। তাদের ঔদ্ধত্যের জবাব দিয়েছে মানুষ। অন্যদিকে, পার্থ ভৌমিক বলেন, মানুষের রায় মাথা পেতে নিলাম। তবে গণনাকেন্দ্রে তাণ্ডব না করলেই হত। তাঁর অভিযোগ, প্রত্যেকটা পার্টি অফিস দখল এবং ভাঙচুর করা হচ্ছে!



