


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ভোটারদের আবেদন ‘রোল ব্যাক’ করেছেন মাইক্রো অবজার্ভাররা। তার সঙ্গে ইআরও সহমত হলে ‘অসুবিধা নেই’। চূড়ান্ত তালিকা থেকে নাম বাদ। কিন্তু সহমত না হলে? সরাসরি ‘বিচারাধীন’। এসআইআর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাজ্য সরকারি আধিকারিকদের থেকে এমনই বিস্ফোরক তথ্য জানা যাচ্ছে। আর এই কলকাঠিতে কমিশনের অস্ত্র? প্রযুক্তি। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সফটওয়্যার।
রাজনৈতিক মহল বলছে, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ব্যাপারে বিজেপি একটা বিষয় বিলক্ষণ বুঝেছে—হয় এবার, না হলে নেভার। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তায় এতটুকু ঘাটতি পড়েনি। উপরন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ও যুবসাথী প্রকল্পের জোড়া ফলায় বিজেপির বিভাজনের রাজনীতি ঠান্ডাঘরে চলে গিয়েছে। সংগঠনও নেই। সেক্ষেত্রে উপায় একটাই—কমিশনকে কাজে লাগানো। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তো সরাসরি দাবি করেছেন, বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছে নির্বাচন কমিশন। ভোটার তালিকা থেকে বেছে বেছে এক কোটির উপর নাম বাদ দেওয়া প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল গেরুয়া শিবিরের। সেটা হয়নি। এক কোটি রোহিঙ্গা-বাংলাদেশিও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই শেষ লগ্নে পৌঁছে মাইক্রো অবজার্ভারদের মাধ্যমে মরণ কামড় বসিয়েছে গেরুয়া ব্রিগেড।
ইআরওরা দাবি করছেন, ৬০ লক্ষ নাম ‘অ্যাডজুডিকেশন লিস্টে’ যাওয়ার কথাই ছিল না। শুনানির নোটিস পাওয়া বাংলার দেড় কোটি ভোটারের তথ্য ইআরও এবং ডিইও যাচাই করার পরও পাঠাতে হয়েছে মাইক্রো অবজার্ভারদের। তার মধ্যে প্রায় ৬ লক্ষ নাম স্রেফ বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে বহু ভোটার জীবিত হওয়া সত্ত্বেও মৃত বলে ‘ডিলিট’ হয়ে গিয়েছেন। ২০ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট জুডিশিয়াল অফিসার নিয়োগ করে বাকি এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে, আর সেই অর্ডার হাতে পাওয়া পর্যন্ত ‘বিচারাধীন’ ভোটারের সংখ্যা সীমা ছাপিয়ে গিয়েছে। গোটা আয়োজনই হয়েছে ১৪ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের অর্ডার কপি হাতে আসা পর্যন্ত। কমিশন হলফনামায় আদালতে জানিয়েছিল, ৫০ লক্ষের তথ্য নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় দেখা গেল, সংখ্যাটা ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫। কীভাবে এই কয়েকদিনেই বিচার হয়েছে ‘অ্যাডজুডিকেশন’ লিস্টের? ইআরওরা বলছেন, ফেরত পাঠানো আবেদনপত্রে মাইক্রো অবজার্ভারদের সঙ্গে ‘এগ্রি’ করলে সরাসরি নাম বাদ। আর ‘ডিসএগ্রি’ করলে সেই ভোটারের নামের পাশে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ পড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ সেই ভোটার চলে যাচ্ছেন বিচারাধীন তালিকায়। রাজ্যের আধিকারিকরা বলছেন, এই পুরোটাই এআই দিয়ে হয়েছে। আগে থেকে প্রোগ্রাম না করা থাকলে কীভাবে ‘ডিসএগ্রি’ করা মাত্র তার পাশে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ পড়ে যায়? কীভাবেই বা সেই ভোটারের নাম সরাসরি ‘বিচারাধীন’ তালিকায় ঢুকে যায়? উপরন্তু মাইক্রো অবজার্ভারদের সঙ্গে সহমত না হলে অনধিক ৫০০ শব্দে তার ব্যাখ্যা লিখে পাঠাতে হয়েছে কেন্দ্রীয় ওই অফিসারদের কাছে। রাজ্য সরকারি আধিকারিকরা বলছেন, এভাবে প্রায় ৪৫ লক্ষ নাম ঠেলে দেওয়া হয়েছে ‘অ্যাডজুডিকেশন’ লিস্টে।
তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘এত কারচুপির পরও চক্ষুলজ্জার বালাই নেই! ৬৪ লক্ষ নাম ইতিমধ্যে বাদ দিয়েছে। এই ৬০ লক্ষের মধ্যে ৪০ লক্ষ ভোটারের নামও যদি কাটা পড়ে, তাহলে মোট বাদের অঙ্কটা সেই এক কোটিই ছাড়িয়ে যাবে। গেরুয়া ছকও সফল।’