কলি ঘোষ: অবৈধ সম্পর্ক এবং তার জেরে খুন। খুব একটা বিরল ঘটনা নয়। বর্তমান সমাজ জীবনে প্রায়ঃশই ঘটে। এর সঙ্গে অনেকেই কম বেশি পরিচিত। তবে ঘটনাটিকে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করে তোলা খুব একটা সহজ কাজ নয়। যে কাজটি সুনিপুনভাবে দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন নির্দেশক, অভিনেতা শুভ্রজিৎ লাহিড়ী।
সংশোধনাগাড়ে থাকা গ্রাম্য বধূ রূপসী নাটকের মহড়ার সময় হঠাৎ সংলাপ ভুলে চিৎকার করে বলতে থাকে 'আমি নিদোষ, আমি কোনও খুন করি নি জজ সাহেব'। এই বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং অচিরেই জ্ঞান হারিয়ে বেসামাল হয়ে যায়। অন্যান্য বন্দীরা তাকে চেয়ারে বসিয়ে চোখেমুখে জল দিলে সম্বিত ফিরে আসে তার। হঠাৎ তার মুখে বাস্তব জীবনের ঘটনা শুনে অবাক হয়ে যায় জেল সুপার, বিচারক সকলে। ১২ বছর ধরে সংশোধনাগাড়ে রয়েছে রূপসী। সেখানকার নানাধরণের প্রলোভন একাই মোকাবিলা করেছে। কোনওদিন তার মধ্যে তেমন কোনও বেচাল দেখা যায় নি, অথচ আজ হঠাৎ কি হল তার?
সংশোধনাগাড়ে থাকা বন্দীদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে তাদের দিয়ে নানা ধরণের কাজের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও যুক্ত করানো হয়। সেই কারণে তাদের দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প 'শাস্তি' নিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করতে উদ্যোগ নেয় কতৃপক্ষ। সকলে খুব উৎসাহ নিয়ে রিহার্সাল দিতে হাজির হয়। সেইমতো মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়। রিহার্সালের প্রথমদিনেই ঘটে অঘটন। ফ্ল্যাশব্যাকে রূপসীর জবানবন্দীতে তার বাস্তব জীবন সামনে আসে।
রূপসীর বিয়ে হয় যতীন মান্নার সঙ্গে। যতীন তার বিধবা বৌদি সতী রানীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত থাকে। তাদের সম্পর্কের কথা জানতে পেরে রূপসী তার স্বামীকে স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে আসতে এবং সুস্থভাবে তার সঙ্গে সংসার করতে অনুরোধ করে। যতীন সে কথায় রাজি হলেও বৌদির সঙ্গে একইরকম সম্পর্ক বজায় রাখে। এরমধ্যে হঠাৎ একদিন রাতে খুন হয়ে যায় তার বৌদি। যেহেতু যতীনের স্ত্রীর সঙ্গে আগে থেকেই বৌদির সম্পর্কটা খারাপ ছিল তাই তাকে খুনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তথ্য প্রমাণ রূপসীর বিরুদ্ধেই যায়, তাই জেল হয় তার।
মহাশ্বেতা দেবীর ছোট গল্প রূপসী মান্না অবলম্বণে নাটক 'রূপসী' মঞ্চস্থ হল গিরিশ মঞ্চে। ক্যালকাটা কোরাস থিয়েটার প্রযোজিত নাটকটির অসাধারণ বুনোট ও টান টান চিত্রনাট্য দর্শকদের উপভোগ্য করে তোলে। রূপসীর চরিত্রে নবাঙ্কিতা ঘোষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণবন্ত, সাবলীল অভিনয় দীর্ঘদিন মনে থাকবে। যতীনরূপী শুভ্রজিৎ লাহিড়ীও বেশ স্বচ্ছন্দ, নজরকাড়া। পার্শ্বচরিত্রগুলোর মধ্যে জেল সুপারকে বেশ ভালো লাগে। সঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের খুব সুন্দর আবহ, দেবারতী ব্যানার্জির গাওয়া রবীন্দ্র সঙ্গীতের সামঞ্জসাপূর্ণ ব্যবহার ও বিষয় উপযোগী মঞ্চসজ্জা, নাটকটিকে বাস্তাব রূপ দিতে সাহায্য করে। অন্যান্য চরিত্রে রয়েছেন সীতেশ হালদার, গোপাল বিশ্বাস, রব, অঞ্জনা ঘোষ, রূপা দত্তচৌধুরী, কনা মোদক, সুপর্ণা ভট্টাচার্য, অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়, রূপা চ্যাটার্জি, গৌরব সেন, প্রসেনজিৎ মন্ডল। প্রযোজনা নিয়ন্ত্রন সিদ্ধার্থ বিশ্বাস।