Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / ম্যাগাজিন

রাসায়নিক সারে বাড়ছে ফসল! শরীরে ঢুকছে ভয়ঙ্কর শত্রু

রাসায়নিক সারে বাড়ছে ফসল! শরীরে ঢুকছে ভয়ঙ্কর শত্রু
  • ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
লিখেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি-বিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ডঃ বিভাষচন্দ্র মজুমদার। 
Advertisement
জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল রেখে মানুষের খাদ্যের জন্য ভারতে কৃষিজাত উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজন হয়ে পড়ছে। এ জন্য বিভিন্নরকম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যার মধ্যে অন্যতম হল কৃষিকার্যে রাসায়নিক পদার্থের প্রয়োগ। এই পদার্থগুলি ব্যবহার করা হয় প্রধানত সার হিসেবে ও কীটনাশক, রোগনাশক ও আগাছানাশক হিসেবে। 
বলা বাহুল্য, এইসব রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করার ফলে কৃষি উৎপাদন আমাদের দেশে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে ও পাচ্ছে। 
অপরপক্ষে, একথাও ঠিক যে, শস্যে রাসায়নিক প্রয়োগ করার ফলে, রাসায়নিকগুলির কিছু পরিমাণ শস্যে থেকে যায়। 
এই শস্য যখন মানুষ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে, তখন সেগুলি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, এইসব রাসায়নিক পদার্থ শরীরে প্রবেশ করলে নানারকম ক্ষতি হতে পারে। 
বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ শস্যে প্রয়োগ করার ফলে যে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি হয়, তার কিছু উদাহরণ নীচে দেওয়া হল। 
ক. কীটনাশক রাসায়নিক: শরীরে বেশি ক্ষতি হয় এই জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের ফলে। নীচে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হল। 
১. এন্ডোসালফান: এই রাসায়নিকটি খাদ্যের মধ্য দিয়ে খুব সামান্য পরিমাণ শরীরে প্রবেশ করলেও স্নায়ুতন্ত্রের ও প্রজননব্যবস্থার বিশেষ ক্ষতি হয়। 
নারীদেহে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় প্রবেশ করলে বিকলাঙ্গ সন্তানের জন্ম হতে পারে। শরীরে দীর্ঘদিন যাবৎ প্রবেশ করলে ক্যান্সারও হতে পারে। 
২. প্রক্সোভার: শরীরে এই রাসায়নিক প্রবেশ করলে হৃৎপিণ্ড ও রক্তবাহী শিরা ও ধমনীর কার্যকলাপে বাধার সৃষ্টি হয়। স্নায়ুরোগও হয়। দীর্ঘদিন যাবৎ প্রবেশ করলে শরীরে ক্যান্সারের আশঙ্কা থাকে। 
৩. ক্লোরপাইরিফস: রাসায়নিকটি খাদ্যের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে থাইরয়েড গ্রন্থি, লিভার, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকলাপে বাধাবিঘ্নের সৃষ্টি করে। 
৪. কারবারিল: শরীরে প্রবেশ করলে এই রাসায়নিকটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের (নার্ভাস সিস্টেমের) অত্যন্ত ক্ষতিসাধন করে। 
৫. ডাইক্লরভস: শরীরে প্রবেশ করলে রাসায়নিকটি পক্ষাঘাত ঘটাতে পারে বিশেষ কিছু অঙ্গে। এছাড়া চক্ষু রোগ, রক্তচাপ অতিরিক্ত মাত্রায় কম করা ও আন্ত্রিকের জন্যও এটি দায়ী। 
৬. কার্বোফুরান: রাসায়নিকটি খাদ্যের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে অন্তর্বর্তী গ্রন্থি (এন্ডোক্রিন গ্ল্যান্ড) বিশেষভাগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 
৭. প্যারাথিয়ন: স্নায়বিক দৌর্বল্যের জন্য রাসায়নিকটি বিশেষভাবে দায়ী। 
৮. মোনোক্রোটোফস: বেশি পরিমাণে এই রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করলে, পেশিজনিত রোগ ও অঙ্গের স্ফীতি ঘটায়। 
৯. ম্যালাথিয়ন: রাসায়নিকটি শরীরে প্রবেশ করে একটি রাসায়নিকের সৃষ্টি করে যা শরীরের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। 
১০. ফেনপ্রোপ্যাথ্রিন: শরীরে রাসায়নিকটি পার্কিনসনস রোগ ঘটাতে পারে। 
উপরিউক্ত রাসায়নিকগুলি ছাড়াও আরও বহু রকমের কীটনাশক রাসায়নিক, যেমন ডিডিটি, বিএইচসি, ডাইমেথয়েট, ইথিয়ন, অ্যালডিকার্ব, ফেনথিয়ন ইত্যাদি শরীরে খাদ্যের মাধ্যমে প্রবেশ করলে, বিভিন্নভাবে শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিশেষত দীর্ঘদিন যাবৎ শরীরে প্রবেশ করলে। 
খ. ছত্রাক রোগনাশক রাসায়নিক: এই শ্রেণির রাসায়নিকগুলির মধ্যে নীচের কয়েকটি বেশি ক্ষতিকারক। 
১. ফারবাম: শরীরে প্রবেশ করলে রাসায়নিক যৌগটি লিভারের সমস্যা ঘটায়। চক্ষুর প্রদাহ এবং চর্মরোগের জন্যও এটি দায়ী। 
২. জিরাম: রাসায়নিকটি বেশি মাত্রায় শরীরে প্রবেশ করলে, পার্কিনসনস ডিজিজ ঘটাতে পারে। গর্ভাবস্থায় নারীশরীরে প্রবেশ করলে বিকলাঙ্গ সন্তানের জন্ম হতে পারে। শস্যে প্রয়োগ করা হয় এমন রোগনাশক অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থও শরীরে প্রবেশ করে ক্ষতি করে। 
এগুলির মধ্যে নাম করা যায় কার্বামিক অ্যাসিড, থায়াবেনডাজল মেথিল, কার্বেনডাজিম ইত্যাদির। 
গ. আগাছা নাশক রাসায়নিক: ফসলের পাশাপাশি চাষের জমিতে প্রচুর আগাছা জন্মায়। 
এই আগাছাগুলি চাষের ফসলের ক্ষতি করে। এই ধরনের আগাছা নষ্ট করার জন্য বেশ কিছু রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয় চাষের জমিতে।
এমন কয়েকটি রাসায়নিক কৃষিজমিতে প্রয়োগ করলে এবং সেই রাসায়নিক খাদ্যশস্যের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে ক্ষতির প্রবল আশঙ্কা থাকে। 
১. ২, ৪-ডি: বেশিমাত্রায় রাসায়নিকটি শরীরে প্রবেশ করলে ক্যান্সার ও লিউকোমিয়া অবধি হতে পারে। 
২. প্যারাকুয়াট: রাসায়নিকটি শরীরে প্রবেশ করে বিস্মৃতিরোগ ঘটায়। 
৩. ট্রাইঅ্যাজিন: নারীর স্তনের ক্যান্সার সৃষ্টি করে এই রাসায়নিক। 
৪. গ্লাইফোসেট: এই রাসায়নিকটি শরীরে প্রবেশ করলে ব্রেন ক্যান্সার, স্নায়বিক রোগ ও থাইরয়েড গ্রন্থির রোগ ঘটায়। 
ঘ. রাসায়নিক সার: নাইট্রোজেনজনিত সার প্রয়োগ করার পর নাইট্রাইট যৌগে রূপান্তরিত হয়। 
এই রাসায়নিকটি শরীরে বেশিমাত্রায় খাদ্যের মাধ্যমে প্রবেশ করলে মেথেমোগ্লবিনিমিয়া নামে একটি রোগ হয়। এর ফলে রক্তে এক ধরনের লোহিত কণিকা (মেথেমোগ্লিবিন) বেড়ে যায়। 
শরীরের কোষে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং শরীর নীলাভ হয়ে যায়। শস্যে অতিরিক্ত পটাশিয়াম সার প্রয়োগ করা হলে এবং সেই শস্য খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করার ফলে, স্নায়বিক দৌর্বল্য, হৃৎপিণ্ডের রোগ ও আন্ত্রিক হয়। 
উপসংহার
খাদ্যশস্যের উৎপাদনে রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগে যে শারীরিক ক্ষতি হয়, তা নিবারণ করার জন্য নীচের কয়েকটি পদক্ষেপ অনুমোদন করা হয়। 
১. যেসব রাসায়নিকের ব্যবহার সরকার থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেগুলি একেবারেই শস্যে প্রয়োগ করা উচিত নয়। 
২. যে মাত্রায় রাসায়নিক পদার্থগুলি সরকার থেকে অনুমোদন করা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি মাত্রায় প্রয়োগ করা উচিত নয়। 
৩. শস্য কাটা বা সংগ্রহের অন্তত ১ মাসের মধ্যে কোনও রাসায়নিক ব্যবহার করা উচিত নয়। 
৪. রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈবিক সার বেশি প্রয়োগ করা উচিত। 
৫. বিকিরণ প্রক্রিয়ায় কীটের আক্রমণ প্রতিহত করা যায় কি না যথেষ্ট গবেষণার প্রয়োজন। 
৬. ফেরোমোনজাতীয় রাসায়নিক ব্যবহারের ওপর গবেষণার প্রয়োজন। 
৭. খাদ্যশস্য ব্যবহারের আগে বেশ ভালোভাবে সেগুলি জলে ধুয়ে নেওয়ার প্রয়োজন। 
৮. জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতার প্রয়োজন। 
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ