


হাতে আর কয়েক দিন! তারপরেই হালখাতা, নতুন বাংলা ক্যালেন্ডার আর মিষ্টির বাক্সে ভরে উঠবে বাঙালির ঘর। বছর শেষ হলেও হাতের কাছে লম্বা ছুটি এখনই নেই। বিরামহীন নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় সপ্তাহান্তে দুটো দিন যদি মেলে, তাহলেও শান্তি! মন বলে কোথাও ঘুরে এলে হয়! আপনার ডেস্টিনেশন হতে পারে কলকাতার কাছাকাছি দুই রাজবাড়ি ও পুরনো কলকাতার গন্ধমাখা একটি বাংলো।
ইটাচুনা রাজবাড়ি
প্রথমটি হুগলি জেলার খন্যানে। ছেলেবেলার ছড়াটার কথা মনে পড়ে? ‘খোকা ঘুমাল, পাড়া জুড়াল, বর্গি এল দেশে’! সেই বর্গি রাজাদেরই কীর্তি এই রাজবাড়ি। ইট অর চুনের ব্যবসা করে সেখানকার বর্গিরা প্রচুর অর্থ রোজগার করতে শুরু করে। লুঠপাট ছেড়ে নগরবাসী হয়ে গ্রামের লোকজনের সুখ সুবিধে দেখার কাজ তাদের বেশ পছন্দ হয়। এই বর্গি রাজারা কিন্তু মারাঠি। চৌথ কর আদায়ের জন্য বহু মারাঠা বর্গি বাংলায় আসত। লুঠপাট চালাত। কেউ কেউ আবার ফিরে না গিয়ে এখানেই স্থায়ী বাস শুরু করত। ইটাচুনার বর্গিরাও তেমনই। গ্রামের মানুষের মন জয় করে স্থানীয় রাজা হয়ে উঠতে এদের সময় লাগেনি। খন্যানের এই রাজবাড়ি তারাই তৈরি করে। ইট ও চুনের ব্যবসা থেকে এই জায়গার আরেক নাম হয় ‘ইটাচুনা’।
কেন যাবেন
এ বাড়ির অন্দরমহল ও বারমহল আলাদা। বাইরের কাছারি ঘর, হিসেবপত্রের ঘর, খাজাঞ্চি মশাইয়ের কেজো ঘর পেরিয়ে অন্দরমহলে পা। দাবার ছককাটা মেঝেয় এখনও আটকে রাজআভিজাত্য। এ বাড়ির দোতলায় রয়েছে রাজ পরিবারের বর্তমান উত্তরাধিকারীর নানা আত্মীয়-পরিজনদের ঘর। সেসব ঘরের নামও তেমন। বড়ো পিসি, ছোটো পিসি, বড়ো বউদি, ছোটো বউদি, ঠাকুরমা, কাকবাবু, জ্যাঠামশাই ইত্যাদি নানা নামেই সেসব ঘর পরিচিত। পর্যটকদের সেসব ঘরেই থাকতে দেওয়া হয়। এছাড়াও মাড কটেজে থাকার বন্দোবস্তও রয়েছে।
সকাল সকাল পৌঁছে চারপাশটা দেখতে বেরিয়ে পড়ুন। একটা টোটো ভাড়া করে নিন। চলে যান ১২ কিমি দূরের পাণ্ডুয়াতে। সেখানে ইতিহাস প্রসিদ্ধ এক মিনার ও মসজিদের ধ্বংসাবশেষ দেখে নিন। ফেরার পথে দেখবেন বেশ বেলা গড়িয়েছে। খিদেও পাচ্ছে। তখনই রাজবাড়ির রাজকীয় মধ্যাহ্নভোজ আপনার জন্য অপেক্ষা করবে। ঘি, গয়নাবড়ি, পাঁচরকম ভাজা, মাছ, মাংস সহযোগে এলাহি ভোজ। দুপুরের খাওয়া ও বিশ্রামের পর ঠিক বিকেল ৫টায় শুরু হবে রাজবাড়ি ট্যুর। দেখে নিন রাজাদের পালকি, কামান, তরবারি সহ নানা ঘর। বাদ দেবেন না গুমঘরটিও। ঘড়িতে সাড়ে ছ’টা বাজলেই শুরু হবে রাজমন্দিরে সন্ধ্যারতি। সেসব দেখে চা ও স্ন্যাক্স খেতে খেতে অন্যান্য অতিথিদের সঙ্গে আড্ডাটা সেরে নিন। নৈশভোজ অর্ডার করতে হবে সন্ধেবেলা। সেই অনুযায়ী রাজবাড়ির বিরাট পাকশালে শুরু হবে রান্নার তোড়জোড়। গ্রামের মেয়ে বউরাই এই রান্নাঘরের দায়িত্বে। দিনের দিনও ঘুরে আসতে পারেন এই রাজবাড়ি থেকে। যখনই যান আগে থেকে বুকিং করে যেতে হবে। বুক করতে পারেন রাজবাড়ির নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকেও।
কীভাবে যাবেন
চলে আসুন হাওড়া স্টেশনে। সেখান থেকে মেইন লাইনের বর্ধমান বা পাণ্ডুয়া লোকালে উঠে পড়ুন। নামবেন খন্যান স্টেশনে। স্টেশন চত্বরে থেকে টোটো ঠিক করে পৌঁছে যান রাজবাড়ি। গাড়ি নিয়ে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে টানা যেতে পারেন। সময় লাগবে ঘণ্টা দুই।
বাওয়ালি রাজবাড়ি
ইটাচুনা ছেড়ে এবার গঙ্গার তীরে আর এক রাজপ্রাসাদে ঘুরে আসি চলুন! এও কলকাতা থেকে ঘণ্টা দুইয়ের পথ। জায়গার নাম বাওয়ালি। বজবজের এই বাওয়ালি রাজবাড়ি তৈরি হয়েছিল রাজার এক সেনাপতির হাতে। রাজারাম মণ্ডল ছিলেন হিজলির রাজার সেনাপতি। বীরত্বের জন্য তাঁকে ৫০ বিঘা জমি আর বিস্তর ধনদৌলত প্রদান করেন রাজা। সে দৌলত তখনকার দিনে তাঁকে স্থানীয় রাজার মর্যাদা এনে দিয়েছিল। তাঁর হাতেই গড়ে ওঠে বাওয়ালি রাজবাড়ি। বর্তমানে এই রাজবাড়ির কর্ণধার রাজবাড়িটিকে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করে হেরিটেজ রিসর্টের রূপ দিয়েছেন। পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে এই রাজবাড়ি। বিয়ে ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং হিসেবেও বাওয়ালি রাজবাড়ি বেশ জনপ্রিয়।
কেন যাবেন
বাওয়ালি রাজবাড়ির বিশালতা মুগ্ধ করবে ঢোকার মুখেই। গথিক স্থাপত্যের বড়ো বড়ো থাম, সিঁড়ি, দীর্ঘ উঠোন, বারান্দা মুহূর্তে নিয়ে যাবে প্রাচীন বাংলার রাজকীয় পরিবেশে। তারপর যখন ঘরে গিয়ে উঠবেন, সেখানেও অবাক হওয়ার পালা। এ যেন ইতিহাসের সঙ্গেই দিনযাপন। খাট পালঙ্ক থেকে শুরু করে আসবাব সবেতেই রাজকীয় আবেশ। সকাল সকাল পৌঁছে আগে ফ্রেশ হয়ে নিন। তারপর পায়ে পায়ে হেঁটে বা টোটো ভাড়া করে দেখে নিন চারপাশের এলাকা ও দর্শনীয় জায়গাগুলি। চাইলে রাজবাড়ি থেকেও অটো বা টোটো ঠিক করে দেওয়া হবে। একটু দূরেই রয়েছে বাওয়ালি ফার্ম হাউজ। সেটিও একটি আলাদা পর্যটনস্থল। এছাড়া রয়েছে পোড়ামাটির গোপীনাথ মন্দির, রাধামাধব মন্দির, দ্বাদশ শিবমন্দির। প্রায় ৩৫০ বছরের পুরনো এই মন্দিরগুলি বাওয়ালির ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’ নামেও পরিচিত। এখনকার অন্যতম আকর্ষণ হ্রদের মধ্যে তৈরি করা রাজাদের গ্রীষ্মাবাস। যার পোশাকি নাম জলটুঙি। সারা সকাল রাজবাড়িতে এক মনোরম বাঁশির সুর ভেসে বেড়ায়। চকিতে যেন গায়ে কাঁটা দেয়! রোদ্দুর খুব বিট্রে না করলে সকালেই দেখে নিন ভাগীরথীর ধার। সকলে গঙ্গা বলেই ডাকে। ইতিমধ্যেই মধ্যাহ্নভোজের ডাক পাবেন। সেখানেও রাজকীয় আতিথেয়তা। কাঁসার বাসনে খাঁটি বাঙালি ভোজ। রেস্তরাঁর মেনু থেকে রাজকীয় জমিদার থালি সহ নানা ধরনের থালি ও আ লা কার্টে অর্ডার করতে পারেন। মধ্যাহ্নভোজের শেষে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে নিন। তারপর সময় রাখুন রাজবাড়িটা ঘুরে দেখার জন্য। এখানেই শ্যুট হয়েছিল সাহেব বিবি গোলাম, বুলবুল, গোপাল ভাঁড়, চোখের বালি সহ নানা ভারতীয় ছবির। দিনের দিন ঘুরে আসা যেমন সম্ভব, তেমনই এখানে রাত্রিবাস করার অভিজ্ঞতাও আকর্ষণীয়। রাজবাড়ি ট্যুরে বিস্মিত হবেন তৎকালীন রাজাদের স্বভাববৈচিত্র, শখ ও দিনযাপনের টুকরো প্রমাণের সামনে দাঁড়িয়ে। সপ্তাহান্তে একটি বা দু’টি দিনের জন্য এখানে এলে ঠকবেন না মোটেও।
কীভাবে যাবেন
শিয়ালদহ স্টেশন থেকে কোমাগাতা মারু বজবজ লোকাল ধরুন। সেখানে পৌঁছে টোটো বা অটো ভাড়া করলেই রাজবাড়ির মূল ফটক! গাড়িতে গেলে ঠাকুরপুকুর বিবিরহাট ধরে বাটানগরের রাস্তা হয়ে পৌঁছে যেতে পারেন বাওয়ালি। ধর্মতলা ঘণ্টা দেড়েক লাগবে।
ক্যালকাটা বাংলো
রাজবাড়ি তো অনেক হল। এবার চলুন গিয়ে দাঁড়াই পুরনোদিনের আস্ত কলকাতার সামনে। পুরনো কলকাতা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গলি, তস্য গলি, রকের আড্ডা, তারে আটকে থাকা ছেঁড়া ঘুড়ির উত্তর কলকাতা। এই বাংলো এখনও সেই প্রাচীন উত্তর কলকাতার গন্ধ মেখে দাঁড়িয়ে আছে শ্যামবাজারে। পটুয়াপাড়া, দর্জিপাড়া, যাত্রাপাড়া, বইপাড়া, সাহেবপাড়া সবই পাবেন এক ছাদের নীচে। বাংলোর নাম ক্যালকাটা বাংলো।
কেন যাবেন
একদিন বা একটা বেলা ছুটি কাটানোর জন্য আদর্শ। ১৯২০ সালের একটি বাড়িকে সংস্কার করে এই বাংলোর রূপ দেওয়া হয়েছে। এই বাংলোর প্রতিটা ঘর কলকাতার এক একটি পাড়ার মেজাজে তৈরি। বাজেট বুঝে সেসব ঘর বুক করে নিতে পারেন। এখানে প্রবেশ করেই পাবেন বৈঠকখানা। আধুনিক ও সাবেক সাজের মিশেলে সেটি আদতে রিসেপশন। অডিও ভিস্যুয়াল রুমের নাম ‘আড্ডাখানা’। ডাইনিং রুম এখানে ‘নতুনবাজার’। ঘরের ছাদ কড়িবরগা জানলা দরজা পরদা সবেতেই সাবেককালের ছাপ। পুরনো সাইকেল, আসবাব মুগ্ধ করবে। অত্যন্ত রুচিশীল সাজ ও আধুনিক সরঞ্জাম ঘরগুলির মায়া বাড়িয়েছে। যাত্রাপাড়ার ঘর যেমন পুরনো বিখ্যাত সব যাত্রার নামে ওয়ালপেপার, ছবি ও ওয়াস হ্যাঙ্গিংয়ে সেজেছে। তার সঙ্গে সাজুয্য রেখে সেই ঘরের অন্দরসাজ ও আসবাব বাছাই করা হয়েছে। বইপাড়া সেজেছে বই, পত্রিকা ও পোস্টার দিয়ে। মুচিপাড়ার ঘরে পাবেন চামড়া ও জুতো দিয়ে তৈরি তাক লাগানো সব অন্দরসাজ। আধুনিক দেওয়ালটি একঝলক দেখলে মনে হয় বোধহয় স্যাঁতসেঁতে। মোটেই তা নয়। সবই উপকরণ আর রঙের খেলা। সব ক’টি ঘর এসি ও আধুনিক পাশ্চাত্য সরঞ্জামে ঠাসা। শুধু উপস্থাপনার জোরে সেগুলোই আপনাকে টেনে নিয়ে যাবে সাবেকদিনের গল্পে।
শ্যামবাজার এমনিতেই কলকাতার ‘ফুড স্টেশন’। প্রাচীন তেলেভাজা, চপ, কাটলেট, মিষ্টি, কলকাতার বনেদি নানা কেবিন ও স্ট্রিট ফুডের স্বর্গ এই শ্যামবাজার। এখানে পৌঁছে বাংলোবাড়িটা ঘুরে দেখুন। বিশ্রাম উপভোগ করুন। বাংলোর মধ্যেই রয়েছে নিজস্ব অভিজাত রেস্তরাঁ। সেখানে খাবার অর্ডার করতে পারেন। খাওয়াদাওয়া সেরে একটু জিরিয়ে নিন। বিকেলে ঘুরে আসুন শ্যামবাজার হয়ে বাগবাজারের গঙ্গার ঘাট, মা সারদার বাড়ি। বাগবাজার এলাকার বিখ্যাত মাছের কচুরি ও কাবাব দিয়ে সন্ধের খাওয়াও সেরে নিতে পারেন। ক্যালকাটা বাংলোর রেস্তরাঁতেও নানা স্ন্যাক্স পারেন। বাংলোবাড়ির রুম বুক করলে রাত্রিবাস সেখানেই করুন। এখানে থেকে ট্রামে চেপে চিৎপুরও ঘুরে আসতে পারেন। বাংলো কর্তৃপক্ষকে বললে একটি রিকশা রাইডের ব্যবস্থাও করা হয়। সেই রিকশাতেও প্রাচীনত্বের ছাপ। উত্তর কলকাতা এগলি, ওগলি ঘুরিয়ে তারা এই ট্যুরকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
কীভাবে যাবেন
শ্যামবাজার ফড়িয়াপুকুরের এই বাংলোবাড়ি বেশ বিখ্যাত। যে কোনো অ্যাপ ক্যাবে সরাসরি ডেস্টিনেশন লিখে পৌঁছে যেতে পারেন। শ্যামবাজারগামী যে কোনো বাসে চেপেও চলে আসা যায় এখানে। মেট্রোয় এলে শ্যামবাজার নেমে পায়ে হেঁটে চলে আসতে পারেন এই বাংলোয়।
বছর শুরুর দিনে ভরপুর বাঙালিয়ানায় সফর করতে চাইলে এই তিন জায়গাই আদর্শ হতে পারে। বেড়ানোর অ্যালবামে যা কখনো ফিকে হবে না।
মনীষা মুখোপাধ্যায়