সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়: ডানদিক থেকে হোয়াও কানসেলোর মাইনাস। বক্সে শিকারি বাঘের মতো ছোঁ মেরে তা জালে জড়াতেই হিউস্টন স্টেডিয়ামে ‘সিউউউউ’ সেলিব্রেশন। কিন্তু, এ কী! নিজের ট্রেডমার্ক সেলিব্রেশনে গা না ভাসিয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো কোন দিকে ছুটছেন? ডাগ আউটে! সতীর্থদের জড়িয়ে ধরে আবেগে ভাসলেন সিআরসেভেন। বার্তাটা নিন্দুকদের। কয়েক ঘণ্টা আগেও যাঁরা পর্তুগাল টিমের সংঘবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছিলেন, তাঁদের গালে সপাটে চড়। ব্রুনো ফার্নান্ডেজ, হোয়াও নেভেসদের জড়িয়ে ধরে ক্যাপ্টেন বোঝালেন, ‘তাঁর পর্তুগালে কোনো ফাটল নেই।’ তারপর সেই চেনা ভঙ্গি। শূন্যে লাফ, পিঠ ঘুরিয়ে নামা, আর গলা ফাটিয়ে ‘সিউউউউ....’। গ্যালারিও ফের গর্জে উঠল একই সুরে।
‘বয়স হয়ে গিয়েছে। অবসর নেওয়াই সম্মানের’, ‘টিমের বোঝা, স্ট্যাচু’— কঙ্গো ম্যাচে ড্রয়ের পর রোনাল্ডোকে কম কটাক্ষ শুনতে হয়নি। ড্রেসিং-রুমে বিভেদের খবরও দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু রোনাল্ডো যে হারার আগে হারতে জানেন না। ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে ঠিক ফিরে আসেন তিনি। নিন্দুকদের জবাব দেওয়ার জন্য হিউস্টনে একটা গোল যথেষ্ট ছিল না। তাই রোনাল্ডো আবার চোয়াল শক্ত করলেন। মুখে কিছু একটা বিড়বিড় করে বল পায়ে এগিয়ে গেলেন। হয়তো নিজেকেই বলছিলেন, ‘আয়াম দ্য বেস্ট।’ আর প্রথমার্ধেই দেখা পেলেন দ্বিতীয় গোলের। এবার কোনো সংযম নয়, উত্সব নয়— আগুনের মতো উগরে দিলেন রাগ। শূন্যে লাফিয়ে তাঁর চিৎকার যেন বলতে চাইছিল, ‘কোথাও যাইনি। আমি এখানেই আছি।’ উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিকও পেতে পারতেন তিনি। তবে হিউস্টনের রোনাল্ডো নিজের রেকর্ডের পরোয়া করেননি। আদর্শ টিমম্যান হওয়াই ছিল তাঁর লক্ষ্য। ১৭ মিনিটে নুনো মেন্ডেসের ফ্রি-কিক গোলই তার প্রমাণ। মহাতারকা এমনভাব দেখাচ্ছিলেন, যেন শট তিনিই মারবেন। উজবেক দেওয়ালেরও চোখ তাঁর দিকেই। কিন্তু প্রতিপক্ষকে বোকা বানিয়ে বল জালে জড়ালেন নুনো। তখন রোনাল্ডোর মুখে তৃপ্তির হাসি। এখানেই শেষ নয়, নিজের দ্বিতীয় গোলের পর ব্রুনো ফার্নান্ডেজকেও তো জড়িয়ে ধরতে দেখা গেল তাঁকে। হ্যাঁ, সেই ‘শত্রু’ ব্রুনো। যাঁর সঙ্গে নাকি প্রায়শই আড়ি হয় মহাতারকার।
উজবেকিস্তানকে ৫-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দেওয়ার পরও একই চিত্র। অপর গোলদাতা রাফায়েল লিও সহ বাকি সতীর্থদের সঙ্গে নিয়ে গ্যালারির সমর্থকদের অভিবাদন জানালেন মহাতারকা। এই বিশ্বকাপে ইগোকে বাইসাইকেল কিকে মাঠের বাইরে পাঠিয়েছেন তিনি। তবে জেদ এতটুকুও কমেনি। তাই তো ম্যাচের পর ক্যামেরার উদ্দেশে ফুঁসে উঠলেন, ‘আয়াম ব্যাক।’ আরও একবার জোরে— ‘আয়াম ব্যাক।’ মিক্সড জোনে প্রশ্ন উড়ে এল, ‘কেন এমন বললেন?’ জেদি রোনাল্ডোর জবাব, ‘যাতে আপনারা ভুলে না যান।’ একটু থেমে সংযোজন, ‘একটা ম্যাচ না জিতলেই আমাদের আক্রমণ করা হয়। বিশেষ করে আমাকে। কিন্তু আমি সবসময় ফিরে আসি। একটু আগে কিংবা পরে। নিজের কাজটা করে যাওয়াই আসল। আর এই দল ঐক্যবদ্ধ।’ জবাবে অহংকার নেই, রয়েছে জেদ। নিজের লড়াইটা নিজের সঙ্গে লড়েন সিআরসেভেন, কারো ছায়ায় নয়। হোটেলে ফিরেও বুকের আগুন নেভেনি। নিজের ভাষায় সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখলেন, ‘এসতামোস আকুই।’ অর্থাত্, ‘আমরা এখানেই আছি।’