রেফারি অ্যান্টনি টেলর শেষ বাঁশি বাজাতেই মাঠের মধ্যে ঠায় দাঁড়িয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। কোমরে হাত, মুখে হতাশার ছাপ, শূন্য দৃষ্টি। সতীর্থরা একে একে সান্ত্বনা জানাতে এগিয়ে এলেন। রোনাল্ডো তখনও ইস্পাতকঠিন মুখে দাঁড়িয়ে। এরপরই ক্যামেরার লেন্স জুম করতেই ধরা পড়ল দু’চোখের কোনে টলমল করছে জল। হয়তো কিছুটা লুকানোর চেষ্টা করলেন। এক পর্যায়ে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল নোনতা জল। দ্রুত নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টায় করতালি দিতে দিতেই এগতে থাকলেন। তবে পারলেন কোথায়! ফের চোখ বেয়ে জল। আসলে দীর্ঘ দু’দশকের বেশি বর্ণময় কেরিয়ারে এমনভাবে দাঁড়ি পড়বে, তা তিনি কখনো চাননি। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি বেঁচেছেন নিজের শর্তে এবং ঔদ্ধত্যে। কিন্তু এটাই তো জগতের নিয়ম। সমাপ্তির অনেক গল্প যেন ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’ হয়ে যায়। ব্যতিক্রমী নন রোনাল্ডোও।
সাড়ে তিন বছরে আগে কাতারের মাটিতেও দেখা গিয়েছিল এই একই দৃশ্য। সেবার কোয়ার্টার-ফাইনাল থেকে বিদায়ের পর মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সিআরসেভেন। তবে দ্রুত নিজেকে সামলে নেমে পড়েন ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে। ৪১ বছর বয়সে ফেরেন মার্কিন মুলুকে। টানা ছ’টি বিশ্বকাপে গোল করার নজিরও তাঁর পকেটে। তবে বয়সের ছাপ ক্রমশ থাবা বসায় পারফরম্যান্সে। মন চাইলেও শরীর সঙ্গ দিচ্ছিল না। দলের মধ্যে সতীর্থদের সঙ্গে বাড়তে থাকে দূরত্ব। কালের যাত্রার ধ্বনি আগেই শুনতে পেয়েছিলেন সিআরসেভেন। তাই তো স্পেন ম্যাচের আগেই জানিয়ে দেন, ‘এটাই শেষ বিশ্বকাপ।’ আর সোমবার বিদায়বেলায় রোনাল্ডো কাঁদলেন। কাঁদালেন তাঁর বিশ্বব্যাপী সমর্থকদের। মাদেইরা টু মাদ্রিদ, এমনকি কলকাতার মানিকতলার বছর পঁচিশের বেদান্তেরও মন খারাপ। বিশ্বকাপের আসরে আর যে দেখা যাবে না ‘সিউউউ...’ সেলিব্রেশন।
দেশের জার্সিতে রোনাল্ডোর অভিষেক ২০০৩ সালে। তার আগে পর্তুগাল ফুটবলে সাফল্যের ভাণ্ডার শূন্য। রোনাল্ডোর হাত ধরে ২০১৬ সালে প্রথম খেতাব জয়ের স্বাদ পায় ইউসেবিওর দেশ। এরপর আরও দু’বার উয়েফা নেশনস লিগ ঘরে তোলে তারা। তবে অধরাই রইল সোনালি ট্রফি জয়। রোনাল্ডোর অবশ্য তা নিয়ে বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই। বরং চেনা ঔদ্ধত্যের সঙ্গে জানিয়ে দিলেন, ‘আমার আগে পর্তুগাল কখনো ট্রফি জেতেনি। তবে এখন ঝুলিতে রয়েছে তিনটি সাফল্য। সেদিক থেকে আমি খুশি। সত্যি বলতে, ২০১৬ সালে ইউরো জয় আমার কেরিয়ারের সেরা সাফল্য। যা বিশ্বকাপেরই সমান।’ এরপরই দেশের জার্সিতে ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে রোনাল্ডোর সংযোজন, ‘এখনও কোনো কিছু ঠিক করিনি। তবে এটা নিশ্চিত, এই বিশ্বকাপই আমার শেষ। তবে দেশের জার্সিতে শেষ ম্যাচ কিনা তা পরিবারের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব।’ রোনাল্ডো এমনই। তিনি নিজের মর্জির মালিক। তবে কখনো কখনো ‘বেস্ট’কেও রেস্ট নিতে হয়।