Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / ম্যাগাজিন

রোগ নিয়ে ভুল ধারণা

রোগ নিয়ে ভুল ধারণা
  • ৩০ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
অমিতাভ ভট্টাচার্য: সংস্কার নিয়েই তো আমাদের জীবন। সেই সংস্কার যখন বাড়াবাড়ি হয়ে কুসংস্কার হয়ে দাঁড়ায়, তখনই বিপত্তি ঘটে। বিশেষ করে শরীর স্বাস্থ্যের ব্যাপারে। তখন যেন আমরা যুক্তি তর্কে না গিয়েই বিশ্বাস করে বসি নাক ডাকা সারে না, রাতে দই খেতে নেই, টক খেলে গলা ধরে, জ্বরে ভাত খেতে নেই, ডিম খেলে শরীর গরম হয়, শরীর কষে গিয়ে নাক দিয়ে রক্ত পড়ে, কানে ব্যথা হলে তেল দিতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সত্যিই কি তাই! চিকিৎসা বিজ্ঞান এসব নিয়ে কী বলে একটু দেখা যাক।
Advertisement
 নাক ডাকা সারে না
কোনও দুরারোগ্য রোগের মধ্যে নাক ডাকা কখনওই পড়ে না। এটাকে সেই অর্থে কোনও বড় রোগও বলা যায় না। বরং বলা যেতে পারে, শ্বাস পথ অর্থাৎ মুখ এবং নাকের সাহায্যে আমরা যে বাতাস গ্রহণ করি এবং যেই পথ ধরে সেটা সরাসরি ফুসফুসের বায়ুথলিতে পৌঁছয়, সেই পথে কোনও বাধা দেখা দিলে আমাদের নরম তালু বা সফট প্যালেটে কম্পন শুরু হয়, ডাকতে থাকে নাক। অর্থাৎ নাক ডাকায় নাক কিন্তু সরাসরি  নিজে ডাকে না। ডাকে অর্থাৎ শব্দ সৃষ্টি করে শ্বাস পথে বাধা পাওয়া বাতাস। এই বাধা না থাকলে নাকও ডাকবে না।
নাকের নানা অসুখের জন্য নাক ডাকতে পারে, আবার নাকের কোনও অসুখ ছাড়া অন্য অসুখেও ডাকতে পারে। আবার কোনও অসুখ-বিসুখ ছাড়া শুধুমাত্র মেদ-বৃদ্ধির জন্য নাক ডাকতে পারে। নাকের অসুখের মধ্যে যেমন নাকের পার্টিশনের হাড় বাঁকা, নাকে পলিপ, টিউমার, অ্যালার্জি, সাইনাস ইনফেকশন। গলার অসুখের মধ্যে বড় টনসিল, বড় অ্যাডিনয়েড গ্ল্যান্ড, বড় জিভ, লম্বাটে তালু, ছোট চোয়ালের হাড়, তালুতে প্যারালাইসিস, জিভের অসুখ ইত্যাদি। এছাড়া নানা ধরনের নেশা, মানসিক রোগ, থাইরয়েড ও মস্তিষ্কের অসুখ এবং অন্য অনেক কারণ।
কাজেই নাক ডাকা সারে না, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। যদি সঠিক কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা করা হয়, নাক ডাকা অবশ্যই সারবে। মধ্য বয়সের পর অনেকেরই কিঞ্চিৎ মেদ বৃদ্ধি হয়, একটু নাক তখন ডাকেন সবাই। এ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। মেদ ঝরালেই নাক ডাকা ভ্যানিশ। কিন্তু যদি ঘুমের মধ্যে বিকট শব্দে নাক ডাকার সঙ্গে  শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, মনে হয় কেউ যেন গলা টিপে ধরেছে, হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে ধড়পড় করে উঠে বসেন রোগী; তাহলে কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তার আছে। একে বলে স্লিপ অ্যাপনিয়া। এই ধরনের রোগীদের মস্তিষ্ক এবং হৃদযন্ত্র ঘুমের মধ্যে অক্সিজেনের অভাবজনিত কারণে নানা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, হতে পারে মৃত্যুও।
ঘুমের মধ্যে আপনার শিশু যদি নাক ডাকে, মুখ হাঁ করে শ্বাস নেয়, তাহলে সেটা নিয়েও চিন্তার আছে। নাকের পিছনের অ্যাডিনয়েড গ্ল্যান্ড বেড়ে যাওয়ার ফলে এমনটা হয়। যদি আপনার শিশু ল ল করে আধো স্বরে কথা বলে, সারা বছর সর্দি কাশিতে ভোগে, কান দিয়ে পুঁজ পড়ে, কান ব্যথা করে, খাবার গিলতে চায় না—তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন। প্রথমে ওষুধপত্র দিয়ে চিকিৎসা হয়। নিরুপায় হলে ই এন টি সার্জেন অ্যাডিনয়েড গ্ল্যান্ড, অনেক সময় টনসিল অপারেশন করে বাদ দেন।
কাজেই নাক ডাকা সারে না, তাই কোনও চিকিৎসা করানোরও দরকার নেই— এমন ভাবনা কিন্তু সম্পূর্ণ ভুল।
 শীতকালে দই খেলে ঠান্ডা লাগে
এমন বিশ্বাস শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব মানুষেরই। যে জন্য শীতকালে দই বা কলা খাওয়ার কথা উঠলে অনেকেই আঁতকে ওঠেন। বাপরে, এগুলো খেলে তো ঠান্ডা লাগবে, হাঁচি-কাশি-হাঁপানি বাড়বে। সত্যিই কি তাই!
দুধ আমাদের দেহের পক্ষে অতি প্রয়োজনীয় একটি খাদ্য উপাদান। দুধ থেকে দই হয়, জানেন সবাই। দুধের চিনি বা ল্যাকটোজ দইয়ে ল্যাকটিক অ্যাসিডে পরিবর্তিত হয় নানা ধরনের ল্যাকটোব্যাসিলাস জীবাণুর উপস্থিতিতে। দই আমাদের কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে, খাদ্যের পচন রোধ করে, মাছ-মাংসের জটিল প্রোটিন ভেঙে তাকে সহজপাচ্য করে। যে জন্য নিমন্ত্রণ বাড়িতে ভূরিভোজের পর একসময় শেষ পাতে দই রাখা হতো। হালের ক্যাটারিং সার্ভিসের দাপটে সেই পাট উঠে গেছে। সে জায়গা নিয়েছে আইসক্রিম বা কুলপি।
দই আমাদের শরীরের উত্তাপ নিয়ন্ত্রণ করে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, ক্যালশিয়াম ও ফসফরাস শিশুদের মস্তিষ্ক ও হাড় গঠনে সাহায্য করে, ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়, মুখের ভেতরের স্বাস্থ্য বা ওরাল হাইজিন ঠিক রাখে। এমনকী পেটের নানা গণ্ডগোলে, কিডনির গণ্ডগোলে, রক্তাল্পতায়, ক্যান্সার প্রতিরোধেও দইয়ের ভূমিকা আছে।
এত গুণপনা যার, শুধু ঠান্ডা লাগবে এই জুজু দেখিয়ে খাদ্যতালিকায় তাকে বঞ্চিত রাখা কেন! শুধু দই নয়, কলার মতো একটি পুষ্টিকর ফলকেও আমরা শীতকালে খাদ্যতালিকা থেকে বাদ রাখি। যে কোনও খাবারে ঠান্ডা লাগে, তার কম তাপমাত্রার জন্য। ফ্রিজে রাখা ঠান্ডা দই খেলে নিশ্চয়ই ঠান্ডা লাগবে। সেজন্য দইকে ভিলেন বানিয়ে লাভ কী! যে কোনও ঠান্ডা জিনিস খেলেই তো হঠাৎ করে তাপমাত্রার পরিবর্তনের জন্য ঠান্ডা লাগতেই পারে। এখানে দই বা কলার কোনও ভূমিকা নেই। দায়ী তার ঠান্ডাটা অর্থাৎ কম তাপমাত্রা। ফ্রিজ থেকে বার করে যদি  দু’এক ঘণ্টা  বাইরে রেখে খাওয়া যায়, তাহলে তো ভয়ের কিছু নেই। তবে যাদের দই খেলে অস্বস্তি হয় অর্থাৎ খুশখুশে কাশি, অম্বল, পেট ভার— তারা নিশ্চয়ই দই খাবেন না, কারণ দইয়ে তাদের অ্যালার্জি আছে। তবে দইয়ের এতসব উপকার পেতে গেলে আপনাকে কিন্তু বাজারি মিষ্টি দই খেলে হবে না, খেতে হবে সাদা টক দই। সেটা ঘরে পাতা হতে পারে, আবার দোকানেরও হতে পারে।
শেষ কথা হল, শীত গ্রীষ্ম বর্ষা, টক দই আপনার ভরসা।
 কানে তালা, কান ব্যথায় কানের ড্রপ
অনেক কারণেই কানে তালা ধরতে পারে। সেই তালা খুলতে কানের ড্রপ কিন্তু কোনও চাবির ভূমিকা পালন করে না। সবথেকে বেশি কানে তালা ধরে, অর্থাৎ কান বন্ধ হয়ে যায় ঠান্ডা লাগলে। এই ঠান্ডা অর্থাৎ ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ নাক এবং গলা থেকে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে ইউস্টেশিয়ান টিউব দিয়ে সরাসরি মধ্যকর্ণে চলে যায়। কানে তালা ধরে, শুনতে অসুবিধা হয়, অনেক সময় তীব্র ব্যথাও হয়। এক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথার ওষুধ, অ্যান্টি অ্যালার্জিক ওষুধ এবং নাকের ড্রপ দিয়ে চিকিৎসা করতে হয়। কানের ড্রপের এখানে কোনও ভূমিকা নেই।
আবার কানের সামনে তীব্র শব্দ হলে, সেটা বাজি-পটকা হতে পারে, ট্রেনের বা অন্য কোনও যানবাহনের সুতীব্র কর্কশ শব্দ হতে পারে, একটানা মাইক বা ডিজের শব্দ হতে পারে—হঠাৎ করে কানে তালা ধরে যায়। কানে নানারকম শব্দও হতে পারে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কোনও ইএনটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে আপনার কানটা দেখাতে হবে, যদি অন্তঃকর্ণের স্নায়ুতে চোট লেগে থাকে! সময়মতো চিকিৎসা না করলে এই তালা কিন্তু পার্মানেন্ট হয়ে যেতে পারে এবং কানের শ্রবণ ক্ষমতাও চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
শব্দের তীব্রতা অর্থাৎ শব্দ কতটা জোরে হচ্ছে তা মাপা হয় ডেসিবেল একক দিয়ে। প্রায় ৯০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ আমরা সহ্য করতে পারি। এর বেশি হলে দেহের নানা ক্ষতি হয়। যার মধ্যে রয়েছে ধীরে ধীরে শ্রবণ ক্ষমতা কমে যাওয়া, হার্টের গতি ও রক্তচাপ বৃদ্ধি পাওয়া, মানসিক বিকলন ইত্যাদি। ১৪০ ডেসিবেলের শব্দ আমাদের শরীরে ব্যথার সৃষ্টি করে এবং ১৮০ ডেসিবেলের শব্দ আমাদের কানের পর্দা ফাটিয়ে দেয়। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত শব্দ গর্ভস্থ শিশুর পক্ষে অবশ্যই ক্ষতিকর।
তীব্র শব্দ থেকে যদি কানে তালা ধরে যায়, তাহলে খেয়াল রাখবেন যেন আর কোনও জোরালো শব্দ কানে না আসে, পুকুরে ডুব দিয়ে স্নান করবেন না, কান খোঁচাখুঁচি করবেন না, কানে কোনও ড্রপ দেবেন না। কিছুদিন শব্দহীন নিরিবিলি পরিবেশে থাকতে পারলে ভালো হয়। তবে সবার আগে দরকার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ।
 শিশুদের কানে ব্যথা হলেও দেখেছি মা-বাবারা কিছু না ভেবেই ঘরে পড়ে থাকা কোনও পুরনো কানের ড্রপ কিংবা দোকান থেকে কিনে আনা নতুন ড্রপ কিংবা তেল অল্প গরম করে কানের ফুটোতে দিয়ে দেন। খুবই বিপজ্জনক প্রবণতা। কানে ব্যথা হতে পারে নানা কারণেই। চিকিৎসা হবে সেই নেপথ্য কারণটিকে খুঁজে বার করে সেই অনুযায়ী। সাময়িকভাবে ব্যথা কমাতে শিশুকে যে কোনও ব্যথার সিরাপ বয়স অনুযায়ী খাইয়ে দিন। একটা কাপড় বা রুমাল ভাঁজ করে হ্যারিকেন, চাটু, ইলেকট্রিক ইস্ত্রি বা হট প্যাডের শুকনো সেঁক দিন। যদি নাক বন্ধ থাকে নাকের ড্রপ ব্যবহার করুন। তারপর ডাক্তার খুঁজুন।
 নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে, নাকে জল টানবেন!
এমন কথা উঠলে যে কেউ ব্যঙ্গ করে বলতেই পারেন, জল টানব না তো কী করব! নাক দিয়ে রক্ত পড়লে আমরা জল টানার কথা ভাবি, অথচ দেহের অন্য কোনও জায়গা থেকে রক্ত বার হলে কাউকে দেখেছেন, সেই রক্তপাতের জায়গায় জল ঢালতে। নাক দিয়ে রক্তপাত আটকাতে জল টানার কোনও ভূমিকা নেই। বরং রক্তের সঙ্গে ওই জল মিশে রোগী এবং তাঁর বাড়ির লোকেদের ভয় পাইয়ে দেয়। তাঁরা ডাক্তারবাবুর কাছে এসে বলেন, আমার নাক দিয়ে বালতি বালতি রক্ত পড়ছে।
নাক দিয়ে রক্ত পড়ে কেন? প্রায় সর্বজনীন উত্তর হল, শরীর কষে গিয়ে। কীভাবে শরীর কষে, জানেন না কেউই। অতিরিক্ত গরমে নাকি শরীর কষে যায়? কিন্তু রক্ত তো শুধু গরমকালে পড়ে না। শীতকালেও পড়ে। এমনকী সারা বছরের যে কোনও সময়ই পড়তে পারে। শরীর কষে গেছে এই ভেবে কারও নাক দিয়ে রক্ত পড়লে, বাড়ির লোকেরা তাকে ডাবের জল, বেলের পানা, ঠান্ডা মিছরির জল, লেবুর রস ইত্যাদি খাইয়ে শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা করেন। রক্ত পড়ার সঙ্গে এইসব খাওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই।
রক্তপাতের কারণগুলি এবার বলি। শিশুদের বেলায় রক্তপাতের কারণ হল নখ দিয়ে নাক খোঁটা। নাকের পার্টিশন, যেখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালী থাকে, যেখানে ঘা হওয়ার ফলে রক্তপাত ঘটে। বড়দের বেলায় রক্তপাতের কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হঠাৎ করে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া। এছাড়া নাকে কোনও পলিপ বা টিউমার, কোনও ইনফেকশন, হরমোনের গণ্ডগোল, রক্তের নানা অসুখ থেকেও কিন্তু রক্তপাত হতে পারে। রক্তপাতের সঠিক কারণ নির্ণয় করে সেই ভাবে চিকিৎসার প্ল্যানিং হয়।
এবার বলি হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত পড়লে তখুনি কী করবেন। নাকের পাটা দুটো আপনার আঙুল দিয়ে ভালো করে চেপে ধরুন। মুখ দিয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস নিন। চেয়ার বা বিছানায় মাথা হেলিয়ে দিয়ে বসে থাকুন। যদি মুখে রক্ত আসে থু থু করে ফেলে দিন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। যদি রক্তপাত বন্ধ না হয়,  পরিষ্কার তুলো বা গজ জলে ভিজিয়ে একটু চিপে নিয়ে নাকের ফুটোর মধ্যে ঠেলে ঠুলে ঢুকিয়ে দিন। আধঘণ্টা অপেক্ষা করুন। রক্ত বন্ধ না হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন। যাঁদের প্রেশারের ওষুধ খেতে হয়, তাঁরা নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করাবেন। সেই ভাবে ওষুধের ডোজ অ্যাডজাস্ট করতে হবে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না এলে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে পরামর্শ করলে তিনি ওষুধ পাল্টে দেবেন। হঠাৎ করে ওষুধ বন্ধ করবেন না। টেনশন এড়িয়ে চলবেন। শিশুদের নখ মায়েরা বা বাবারা নিয়মিত কেটে দেবেন। শেষ কথা হল, নাক দিয়ে রক্ত পড়লে ঘাবড়ে যাবেন না, চিৎকার চেঁচামেচি করবেন না। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের শরীরে পাঁচ-ছয় লিটার রক্ত থাকে, তার থেকে অল্প রক্ত বেরিয়ে গেলে কিছুই হয় না। শিশুদের বেলায়ও একই কথা। মাথা ঠান্ডা রাখবেন, নাক দিয়ে রক্ত পড়লে জল টানাবেন না। দুই আঙুল দিয়ে নাকের দুটো পাটা চেপে ধরুন। একটু বরফ সেঁক নাকের উপর দিতে পারেন।
 নাক বন্ধর চিকিৎসা কী নাকে ড্রপ!
সবাই তো তাই ভাবেন। জীবনে একবারও নাক বন্ধ হয়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াই ভার। হাঁচি, কাশি, অ্যালার্জি নিয়েই তো আমাদের জীবন কাটে। আমাদের নাকের ভিতর অসংখ্য রক্তজালক থাকে নাকের আবরক পর্দা বা মিউকাস মেমব্রেন  জুড়ে। কোনও কারণে সেগুলো প্রসারিত হলে নাক বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে শীতকালে হঠাৎ করে ঠান্ডা লেগে। ঠান্ডা লাগার নেপথ্যে থাকে নানা ধরনের ভাইরাসের সংক্রমণ, যার ফলে নাকের ভিতরে রক্ত ও অক্সিজেন সঞ্চালন কমে যায়। প্রথমে নাক বন্ধ এবং হাঁচি দিয়ে শুরু হয়। তারপর নাক দিয়ে জল ঝরতে থাকে, জ্বর জ্বর লাগে, নাকের ভিতরটা ফুলে ওঠে, চিকিৎসা না করলে পাকা সর্দি দেখা দেয় জীবাণু সংক্রমণের ফলে। ঠান্ডা লাগা ছাড়াও অ্যালার্জির কারণে, বারে বারে নাকে প্রদাহ হলে, পলিপ হলে, নাকের পার্টিশনের হাড় বাঁকা থাকলে, সাইনাস থাকলে, নাকে কোনও টিউমার থাকলেও নাক বন্ধ হতে পারে। আবার শিশুরা নাকে কিছু ঢুকিয়ে রেখে বলতে ভুলে গেলে নাক বন্ধ, দুর্গন্ধ, এক নাকে সর্দি-সহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়।
বন্ধ নাক চটজলদি খুলতে নাকের ড্রপের কোনও বিকল্প নেই। নাকের দুটো ফুটোতে দু’ফোঁটা করে দিনে দু-তিনবার নাকের ড্রপ দেওয়াই যেতে পারে। তবে তা অল্পদিনের জন্য। নজর দিতে হবে নাক বন্ধের নেপথ্যে যে কারণ আছে তার উপর। অ্যালার্জির কারণ হলে তার জন্য দীর্ঘদিন চিকিৎসা করাতে হবে, সাইনাসের ইনফেকশন হলে সেটা সারাতে হবে। পলিপ বা টিউমার থাকলে অপারেশন করার প্রয়োজন হতে পারে। শীতে ধোঁয়া ধুলো ঠান্ডা এড়িয়ে চলতে হবে।
দীর্ঘদিন নাকের ড্রপ কখনওই ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ এগুলোতে রক্তনালী সংকোচনকারী বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ থাকে। দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে নাকের ভিতরের মিউকাস মেমব্রেনের ক্ষতি হয়। নাক আর খুলতেই চায় না। যদি নাকের ড্রপ দীর্ঘদিন ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে নরমাল স্যালাইনের যেসব ড্রপ বাজারে পাওয়া যায়, সেগুলোই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ব্যবহার করা উচিত। কাজেই নাক বন্ধর সঠিক কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা করালে আর যখন-তখন নাকের ড্রপ দেওয়ার প্রয়োজনই হয় না।
 মাথাব্যথা সারে না, ভরসা পেইন কিলার
আপনার পাড়ার ওষুধের দোকানে একবার খোঁজ নিয়ে দেখবেন তো, কোন ওষুধ প্রেসক্রিপশন ছাড়াই সবথেকে বেশি বিক্রি হয়? অবশ্যই ব্যথার বড়ি বা পেইন কিলার। এবং ক্রেতাদের মধ্যে অধিকাংশই নানা ধরনের মাথার যন্ত্রণায় ভোগেন। একটা প্রচলিত কথা আছে না, মাথা থাকলেই মাথাব্যথা। কথাটা একশো ভাগ সত্যি। জীবনে একবার মাথাব্যথায় ভোগেননি, এমন মানুষ বিরল। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে পৃথিবীর সমস্ত দেশের গড়পড়তা ৬৫ শতাংশ মানুষ কোনও না কোনও সময় মাথার যন্ত্রণায় ভুগে থাকেন। অথচ ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই এই মাথাব্যথার কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। রক্তনালীর অনিয়মিত সংকোচন প্রসারণের জন্য আট জনের এবং মস্তিষ্কের অসুখের জন্য শতকরা মাত্র দু’জনের মাথার যন্ত্রণা হয়। বাকিদের মাথার যন্ত্রণার কারণ এখনও অধরা। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত ৩১৬ ধরনের মাথার ব্যথার কারণ খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু আমরা বাঙালিরা সব থেকে বেশি ভুগি মাইগ্রেনের ব্যথায়, তারপরে সাইনাসের ব্যথায়।
মাইগ্রেনকে আমরা আধকপালি ব্যথাও বলে থাকি। যেহেতু প্রায় ক্ষেত্রেই মাথার এক পাশ জুড়ে রোগটার  দাপাদাপি দেখা যায়, আবার অনেকের পুরো মাথা জুড়েই হয়। যন্ত্রণাটা হয় চোখের পিছনে, ঘাড়ে, মাথার একধারে। কপালের দু’পাশের রগগুলো দপদপ করতে শুরু করে। বাড়তে বাড়তে একসময় অসহনীয় হয়ে ওঠে। রোগীর গা গোলায়, অনেকের বমি হয়, আলো চিৎকার-চেঁচামেচি এমনকী স্বাভাবিক কথাও অসহ্য লাগে। রোগী ঘর অন্ধকার করে একা শুয়ে থাকতে ভালোবাসে, লোকজন এড়িয়ে চলে। এক থেকে তিন দিনের মধ্যেই ব্যথা কমে আসে।
মাইগ্রেনের শুরুটা একেকজনের একেক ভাবে হয়। কেউ দীর্ঘক্ষণ উপোসে থাকলে হয়, কারও খুব বেশি কোল্ড ড্রিংক, চকলেট খেলে, কিংবা মদ্যপান করলে হয়। কারও কারও ফাস্টফুড খেলে হয়, সিনেমা হলে কিংবা বাসে ভ্রমণ করলে অনেকের হয়, আকাশ মেঘলা হলে হয়। অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা সবকিছুই মাইগ্রেনের নেপথ্য কারণ হতে পারে। রোগী নেপথ্যের কারণটা ধরে ফেলতে পারলে, আগেভাগেই সাবধান হতে পারেন। মাইগ্রেনের কিন্তু চিকিৎসা আছে। প্রথমে লাইফ স্টাইল পাল্টে দেখতে হবে। যেসব কারণে মাথাব্যথা বাড়ছে বলে মনে হয়, সেগুলো বাদ দিতে হবে। ইএনটি বা নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারবাবুকে দেখিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে এবং চিকিৎসা চলবে অনেক দিন ধরে। মুঠো মুঠো পেইনকিলার খেয়ে দয়া করে শরীরের বারোটা বাজাবেন না।
মাইগ্রেনের ব্যথায় সাধারণত রোগীর সর্দি কাশি থাকে না, কিন্তু সাইনাসের ব্যথায় সর্দি-কাশি, হাঁচি, নাক বন্ধ— এগুলোই হল প্রধান উপসর্গ। সাইনাস ইনফেকশন হল, আমাদের মাথার করোটির মধ্যে কয়েকটি ফাঁকা অংশ বা খুপরির আবরক পর্দা বা মিউকাস মেমব্রেনের প্রদাহ। সাইনাসের ব্যথা সকাল থেকেই শুরু হয়, সারা মাথা জুড়েই ব্যাথা থাকে, কপাল টিপটিপ করে। কিন্তু মাইগ্রেনের ব্যথার মতো গা গোলানো, বমি আলো-শব্দ অসহ্য লাগা, এগুলো থাকে না। উপসর্গ শুনেই রোগটা ধরে ফেলা যায়। এক্স রে, সিটি স্ক্যান করলে রোগটা ভালোভাবে বোঝা যায়। প্রথমে ওষুধ পত্র দিয়ে চিকিৎসা হয়, অনেক সময় অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে। সাইনাস অবশ্যই সারে এবং খুব দ্রুত সারে। মাইগ্রেনের মতো দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। আবারও বলছি, দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের পেইন কিলার খেয়ে কখনও মাথাব্যথা কমানোর চেষ্টা করবেন না। মনে রাখবেন অল্প ক্ষেত্রে হলেও, মাথাব্যথার নেপথ্য কারণ কিন্তু হতে পারে ব্রেন ক্যান্সারও।
 টনসিল অপারেশন করালেই গলার স্বর নষ্ট
টনসিল। চার অক্ষরে এই শব্দটি আমাদের কাছে খুবই পরিচিত। টনসিল হল একগুচ্ছ লসিকা কোষ বা লিম্ফয়েড টিস্যুর সমাহার। থাকে আমাদের গলার ভিতর জিভের একদম শেষে, গলার দুপাশের দুটো খোপে, যাদের বলে টনসিলার ফসা। এছাড়া আরও কয়েক ধরনের টনসিল আছে। কিন্তু আমরা টনসিল বলতে গলার এই একজোড়া টনসিলকেই বুঝি। টনসিল আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বছর ১২ পর্যন্ত। বলা যেতে পারে, আমাদের শ্বাসপথের প্রহরীর কাজ করে এরা, রোগ জীবাণুর আক্রমণ থেকে শ্বাসপথকে রক্ষা করে। কিন্তু এই টনসিল যখন বারে বারে অসুস্থ হয়, সেপটিক হয়, তখন দেহের নানা ক্ষতি শুরু হয়।
টনসিলের সংক্রমণকে বলে অ্যাকিউট টনসিলাইটিস। শুরু হয় গলা ব্যথা, ঢোক গিলতে কষ্ট, গলা শুকিয়ে আসা, জ্বর, গা হাত পা ব্যথা মাথার যন্ত্রণা  ইত্যাদি দিয়ে। ঠিকমতো চিকিৎসা করলে ভালো হয়ে যায়। কিন্তু অনেক সময় বারে বারে টনসিল অসুস্থ হতে শুরু করে, যাকে বলে ক্রনিক টনসিলাইটিস। শিশু বারে বারে গলা ব্যথা ও জ্বরে ভোগে, টনসিল দুটো সাইজে বড় হয়ে যাওয়ায় খাবার গিলতে পারে না, গলার স্বর পাল্টে যায়, মনঃসংযোগ নষ্ট হয়,দেহের বৃদ্ধি হয় না, খিটখিটে হয়ে যায় ইত্যাদি। শিশু চিকিৎসক কিংবা গলার চিকিৎসক নানা ধরনের ওষুধ দিয়েও যখন টনসিল ভালো করতে পারেন না তখন অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বাড়ির লোককে সে কথা বলতেই তারা রে রে করে ওঠেন, বলছেন কী ডাক্তারবাবু, ওর গলার স্বর তো চিরকালের জন্য নষ্ট হয়ে যাবে, আমার শিশু তো আর কথা বলতেও পারবে না!
এই ধারণাগুলো সম্পূর্ণ ভুল। গলার স্বর সৃষ্টিতে টনসিলের সরাসরি কোনও ভূমিকা নেই। আমরা নাক এবং মুখ দিয়ে যে বাতাস গ্রহণ করি, সেটা শ্বাসপথ বেয়ে ফুসফুসে পৌঁছয়। সেখানে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই অক্সাইডের বিনিময় হওয়ার পর ওই বাতাস যখন আবার আগের পথে ফিরতে থাকে, তখন ধাক্কা মারে শ্বাসপথের দুটো ভোকাল কর্ডে। কম্পন শুরু হয় ভোকাল কর্ডে এবং গলার স্বর সৃষ্টি হয়। এখানে টনসিলের সরাসরি কোনও ভূমিকা নেই। টনসিল, জিভ, আল জিভ, তালু— এরা গলার স্বরে মিষ্টতা দান করে, রেগুলেটর বা অনুরণকের কাজ করে। কাজেই যেখানে গলার স্বর সৃষ্টিতে টনসিলের সরাসরি কোনও  ভূমিকাই নেই, সেখানে গলার স্বর নষ্ট করার জন্য টনসিলকে ভিলেন বানিয়ে কী লাভ! তবে টনসিল দীর্ঘদিন গলায় পুষে রাখলে কিন্তু নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে, যাদের মধ্যে অন্যতম হল ল্যারিনজাইটিস বা স্বরযন্ত্রের প্রদাহ। আর এর ফলেই গলার স্বর নষ্ট হয়ে যায়। এই নষ্ট হওয়ার পরে অনেকে বাধ্য হন দীর্ঘদিনের সেপটিক টনসিলটিকে অপারেশন করিয়ে বাদ দিতে। বাদ দেওয়ার পর অন্যান্য জটিলতার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া গেলেও গলার স্বর অনেকের আর আগের মতো ফিরে আসে না, আর তখনই দোষ পরে অপারেশনের এবং সার্জেনের ঘাড়ে। কাজেই অসুস্থ টনসিল দীর্ঘদিন গলায় পুষে রাখলেই বরং গলার স্বর নষ্ট হয়। সময় থাকতে বাদ দিলে গলার স্বর তো নষ্ট হয়ই না, বরং ভালো হয়। বহু বিখ্যাত গাইয়ে অসুস্থ টনসিল অপারেশনের পরেই বরং আরও সুকণ্ঠের অধিকারী হয়েছেন।
 মুখে দুর্গন্ধ, তার মানেই লিভার খারাপ
লিভারের অবস্থাটা অনেকটা যত দোষ নন্দ ঘোষের মতো। মুখে ঘা, দুর্গন্ধ, ত্বকে মেচেতা, পেটভার, গ্যাস, বদ হজম, কোষ্ঠকাঠিন্য, অকালে চুল পাকা, শ্বেতী, ব্রণ— এসব কিছুর জন্যই নাকি লিভার দায়ী। বেচারা লিভার! 
আমাদের দেহের সমস্ত বিপাকীয় কাজের হেড অফিস হল আমাদের লিভার এবং দেহের সবথেকে বড় গ্ল্যান্ড এটি। ওজন প্রায় দেড় কিলোগ্রামের মতো, থাকে পেটের প্রধানত ডান দিক জুড়ে ডায়াফ্রামের ঠিক নীচে। একজন পূর্ণ বয়স্কর দেহের মোট ওজনের দুই শতাংশ হল লিভারের ওজন, শিশুদের বেলায় এটা পাঁচ শতাংশ। লিভারের আর কাজের শেষ নেই। খাবার রান্না করা, জমিয়ে রাখা, সময়মতো বিলিয়ে দেওয়া, বিপাকীয় কাজের প্রায় সবটাই করতে হয় লিভারকে। এছাড়া আরও অসংখ্য কাজ করে লিভার, যেগুলো এখানে আলোচনার বিষয় নয়।
মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে নানা কারণেই। তার সঙ্গে লিভারের কোনও সম্পর্ক নেই। সবথেকে বড় কারণ হল, মুখের ভেতরটাকে অপরিষ্কার রাখা। ঠিকমতো দাঁত মাজি আমরা কজন! মাজলেও ব্রাশ-পেস্ট ব্যবহার করেন না অনেকেই। ছাই, মাটি বিজ্ঞাপনের লাল মাজন, গুড়াখু-সহ নানা ক্ষতিকর জিনিস দিয়ে দাঁত মেজে অনেকেই দাঁতের বারোটা বাজান। তারপর আছে যখন তখন যা খুশি খাওয়া এবং খেয়ে মুখ না ধোয়ার বদ অভ্যাস। এর ফলে খাবারের টুকরো দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকে। আমাদের মুখের ভেতরের ল্যাকটোব্যাসিলাস পরিবারের নানা জীবাণু এই খাবারের টুকরোগুলোকে ভেঙে ল্যাকটিক অ্যাসিড-সহ বিভিন্ন অ্যাসিড তৈরি করে, দাঁতের এনামেল নষ্ট করে, দাঁতে কালো ছোপ পড়ে গর্ত হয়। একে বলে ডেন্টাল করিস, চলতি কথায় দাঁতে পোকা।
এছাড়া নাক বা সাইনাসের পচা সর্দি, মাড়ির অসুখ, মুখের ভেতরের কোনও ঘা, সেপটিক টনসিল, কানে পুঁজ থেকেও মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে। পান, জর্দা, খৈনি, নস্যি, পান মশলা, মদ—সহ নানা ধরনের নেশার ফলেও মুখে দুর্গন্ধ হয়। সুগন্ধি মশলা চিবিয়ে অনেকেই এই দুর্গন্ধ চেপে রাখার চেষ্টা করেন। অনেকে আবার গুড়াখু দিয়ে দাঁত মেজে দাঁত ব্যথা, মাড়ি ব্যথা কমানোর চেষ্টা করেন। বলা বাহুল্য, এর সবগুলোই অপচেষ্টা। জিভের নানা ধরনের ঘা, বিশেষ করে ভিটামিন-সহ নানা পুষ্টিকর উপাদানের অভাবজনিত কারণেও ঘা থেকে মুখে দুর্গন্ধ হয়। কাজেই লিভারকে ভিলেন না বানিয়ে সবরকম নেশা থেকে নিজেকে দূরে রাখুন, প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। আর ঠিকঠাক দাঁত মাজার পদ্ধতিটা সবথেকে ভালো হয় কোনও ডেন্টাল সার্জনের কাছ থেকে শিখে নিলে।
 গলায় কাঁটা! ওষুধ খেয়ে কাঁটা গলাবেন?
আছে নাকি এমন ওষুধ, যা খেলে গলার কাঁটা গলে জল হয়ে যায়। এককথায় উত্তর না এমন কোনও ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। তবে যে অনেকেই কাঁটা গলানোর ওষুধ খায়! সে তো অনেকেই সুস্থ হতে ঠাকুর-দেবতার চরণামৃত খায়, জন্ডিস কমাতে মালা পরে, তাবিজ কবজ মাদুলি ব্যবহার করে অসুখ কমাতে। শিক্ষিত মানুষকেই দায়িত্ব নিতে হবে এদের মন থেকে এই সব ভুল ধারণা দূর করার জন্য।
ধরুন আপনি ভাপা ইলিশ খাচ্ছিলেন রবিবারের দ্বিপ্রাহরিক ভোজনে। হঠাৎ গলায় খচ করে উঠল, বুঝলেন কাঁটা বিঁধল। শুকনো ভাত, চিঁড়ে, কলা খেলেন। নো রেজাল্ট। গলায় আঙুল দিয়ে খোঁচাখুঁচি করলেন। রক্তপাত হল, ব্যথা হল, কিন্তু কাঁটা বের হল না। অবশেষে কারও পরামর্শে কাঁটা গলানোর ওষুধও খেলেন। কষ্ট আরও বাড়তে থাকায় অবশেষে গেলেন ঠিক জায়গায় অর্থাৎ ইএনটি সার্জেনের চেম্বারে কিংবা হাসপাতাল-নার্সিংহোমের ইএনটি আউটডোরে। সেখানে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফরসেপ দিয়ে সার্জেন কাঁটাটিকে বেঁধে থাকা জায়গা থেকে তুলে আনলেন। আপনিও হাপ ছেড়ে বাঁচলেন। এমন অভিজ্ঞতা কিন্তু আমাদের মাঝেমধ্যেই হয়।
গলায় কাঁটা সাধারণত আটকায় টনসিলে। বিশেষ করে শিশুদের। কারণ ওদের টনসিলগুলো বেশ বড় সাইজের হয়, তাই কাঁটা আটকাতেও সুবিধা হয়। এছাড়া জিভের পিছন দিকে, ফ্যারিংসে, ল্যারিংসে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাঁটা কোথাও গেঁথে না থেকে গলার খাঁজে পড়ে থাকে। কয়েক ঢোক জল খেলেই যা কিছুক্ষণের মধ্যেই নেমে যায়।
কাজেই গলায় কাঁটা আটকেছে মনে হলে কলা, চিঁড়ে, মুড়ি না খেয়ে বারে বারে কয়েক ঢোক করে জল খেয়ে যান। কাঁটা নামতে কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। একটু ধৈর্য ধরুন। গলায় বেশি ব্যথা হলে, ব্যথা কমানোর ওষুধ খেতেই পারেন। গলায় যেন ভুলেও আঙুল দেবেন না। কারণ আপনার আঙুল তো আর ফরসেপ নয় যে, ফুটে থাকা কাঁটাকে টেনে বের করে আনবে। বরং আঙুল দিয়ে খোঁচাখুঁচির ফলে গলা চিরে যাবে, কাঁটা না থাকা সত্ত্বেও গলা ব্যথা হবে। বেশ কয়েকদিন ওষুধপত্রও খেতে হবে। আর একটা কথা তো আগেই বললাম যে, গলার কাঁটা গলিয়ে বার করার কোনও ওষুধ এখনও আবিষ্কার হয়নি। গলার কাঁটা থেকে বড় বিপত্তি সাধারণত হয় না, তবে একবার  ইএনটি ডাক্তারকে দেখিয়ে নেওয়াই ভালো। প্রয়োজন তিনি এক্স রে করে কাঁটার সঠিক অবস্থান নির্ণয় করে, সেটা বের করবার ব্যবস্থা করবেন। তবে আমার দীর্ঘদিনের ডাক্তারি অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, শতকরা ৯০টি কাঁটা নিজে নিজেই নেমে যায়। বাকি দশ ভাগ কাঁটা বের করার দায়িত্ব দিন আপনার ডাক্তারবাবুকে।
 বেশি ঘুম নাকি শরীরের পক্ষে ভালো!
খুব ছোটবেলায় যখন মা-বাবা বা অন্য কেউ আমাকে সকালবেলায় ঘুম থেকে তোলার চেষ্টা করত, তখন নাকি আমার ঠাকুমা, যাকে আমি কর্তামা বলে ডাকতাম, বারে বারেই তাদের বাধা দিয়ে বলত, ‘আহা অতটুকু বাচ্চা আরেকটু ঘুমোক না। যত ঘুমোবে তত শরীরের বাড় তাড়াতাড়ি হবে।’ কর্তামা না হয় আগের দিনের মানুষ ছিলেন! কিন্তু এই প্রজন্মেরও অনেকেই বিশ্বাস করেন যে যত বেশি ঘুমানো যাবে, ততই নাকি শরীরের উপকার হবে। 
নার্কোলেপসি নামে একটি অসুখ আছে, যে অসুখে অনেকে অকারণেই বেশি বেশি ঘুমোন। সকাল দশটায় ঘুম থেকে উঠে খাওয়ার পর দুপুরে ভাত ঘুম, অন্তত দু’ঘণ্টা। আবার রাত দশটায় যথারীতি শয্যায় গমন। নিদ্রা বিলাসীরা ভোজনবিলাসীয় হন, ফলে খুব তাড়াতাড়ি মোটা হয়ে যান। আর মোটা হলে তো রোগের শেষ থাকে না।
লেপটিন এবং অ্যাড্রিনালিন নামক হরমোনের হঠাৎ বাড়া কমা দেখা যায় ঘুমবিলাসীদের মধ্যে। এর সঙ্গে সম্পর্ক আছে মেদবৃদ্ধির। লেপটিন হরমোনটি আমাদের দেহে কম সংশ্লেষ হলে খিদে বেড়ে যেতে পারে। কারণ মস্তিষ্কের হাঙ্গার সেন্টারটিকে নিউরোপেটাইড ওয়াই নামক একটি উৎসেচকের সাহায্যে আংশিক নিয়ন্ত্রণ করে এই লেপটিন। খিদে বেড়ে যাওয়া মানেই বেশি খাওয়া, নিট ফল মোটা হওয়া।
আবার বেশি ঘুমোলে আমাদের দেহে ইনসুলিন হরমোনের গ্রাহক কোষ বা রিসেপ্টরে গণ্ডগোল দেখা দেয়, ফলে ইনসুলিনের বিরুদ্ধে একটা প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে, ইনসুলিন আর তার স্বাভাবিক কাজ করতে পারে না। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গিয়ে ডায়াবেটিস দেখা দেয়। এ ছাড়া ঘুমবিলাসীদের রক্তে ইনসুলিন বিরোধী নানা হরমোন, যেমন গ্রোথ হরমোন, অ্যাড্রিনালিন, স্টেরয়েড, গ্লুকাগন ইত্যাদি বেশি পরিমাণে ক্ষরিত  হওয়ার ফলে ডায়াবেটিসের আশঙ্কা বাড়ে। কারণ আমরা সবাই জানি যে ইনসুলিনই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
বেশি ঘুমনো মানেই বেশি করে মোটা হওয়া, আর তার থেকে ডায়াবেটিস ছাড়াও উচ্চ রক্তচাপ, রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইড এবং কোলেস্টেরল বেড়ে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক এবং ব্রেন স্ট্রোকের সম্ভাবনা, ফ্যাটি লিভার ইত্যাদি নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। বেশি ঘুমনোর ফলে হতে পারে ডিমেনশিয়া অর্থাৎ চিত্তভ্রংশ রোগ, হতে পারে অ্যালঝাইমার অর্থাৎ স্মৃতিভ্রংশ রোগ। সারাবিশ্বে এই মুহূর্তে প্রতি চার সেকেন্ডে একজন করে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
সেরোটনিন রাসায়নিকটি  মস্তিষ্কে তৈরি হয়, যা আমাদের ঘুম পাড়াতে সাহায্য করে। বেশি ঘুমিয়েদের মস্তিষ্কে এটি বেশি করে ক্ষরিত হয়। ডিমেনশিয়ায় বেশ কয়েকটি স্নায়ু প্রেরক রাসায়নিকের ক্ষরণ ভীষণভাবে কমে যায়। শেষ কথা হল, সুস্থ থাকার জন্য ঘুম আমাদের অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা ছয় থেকে নয় ঘণ্টার বেশি নয়। অতিরিক্ত ঘুম অবশ্যই এক ধরনের অসুখ, যা পরবর্তীকালে নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। বেশি ঘুমিয়েরা  অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন।
 অনিদ্রার দাওয়াই স্লিপিং পিল!
অনিদ্রা অর্থাৎ ঘুম না আসা। আবার ঘুম এলেও সেটা ঠিক সাউন্ড স্লিপ নয়, ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম। এককথায় ঘুম বিভ্রাট। শুনে আশ্চর্য হবেন এ দেশের মোট প্রাপ্তবয়স্কের এক তৃতীয়াংশই নানা ঘুমের সমস্যায় ভোগেন। তার ফলে এরা ঠিকমতো কোনও কাজে মনঃসংযোগ করতে পারেন না, ঠিকসময় ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না এবং নানা অসুখে ভোগেন। অনিদ্রা মানে না ঘুমিয়ে থাকা কিন্তু পুরোপুরি না ঘুমিয়ে তো বাঁচা সম্ভব নয়। আসলে ঘুম ঠিকমতো না হলে বা কম হলে তাকেই আমরা বলি অনিদ্রা রোগ। অথচ অনেককেই বলতে শুনবেন, কাল দু’ চোখের পাতা এক করতেই পারিনি। এরা কিন্তু ঠিক কথা বলেন না। ঘুম কম হওয়া অবশ্যই একটা অসুখ। এর নেপথ্যে আছে নানা কারণ।
লিখিত বা বিজ্ঞাপিত এমন কোনও নিয়ম-কানুন নেই যে এত ঘণ্টা বাধ্যতামূলকভাবে ঘুমতেই হবে। ঘুমের বেলায় কত ঘণ্টা ঘুমচ্ছি, সেটা বড় কথা নয়, ঘুমটা ঠিকঠাক হচ্ছে কি না, সেটাই বড় কথা। অর্থাৎ কোয়ান্টিটি নয় কোয়ালিটি অব স্লিপ টাই বিবেচ্য। এটা একেকজনের একেক রকম হতেই পারে। সদ্যোজাত শিশুরা বেশিক্ষণ ঘুমোয় দিনে প্রায় আঠারো-কুড়ি ঘণ্টা। একজন সুস্থ পূর্ণবয়স্ক মানুষের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমলেই যথেষ্ট অর্থাৎ গড়ে আট ঘণ্টা, এই আট ঘণ্টা রাতে একটানা না হয়ে, রাতে  ছয় ঘণ্টা, দুপুরে এক থেকে দুই ঘণ্টাও হতে পারে। আবার চার পাঁচ ঘণ্টা ঘুমিয়েও দিব্যি ফিট আছেন, এমনও দেখা যায়। মোদ্দা কথা হল, যে পরিমাণ ঘুমোলে আপনি সারাদিন চনমনে থাকতে পারেন, সেটাই আপনার ঘুমের পরিমাণ। ১০ ঘণ্টা বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করার চেয়ে ৪-৫ ঘণ্টা টানা ঘুম যে শরীরের পক্ষে অনেক বেশি উপকারী, তা বলাই বাহুল্য। ঘুম থেকে খুব ভোরে উঠবেন, নাকি বেলায় উঠবেন— সেটাও আপনার অভ্যাস। তবে মধ্যরাত অর্থাৎ রাত বারোটার আগে বিছানায় গেলে নিদ্রাদেবীকে আহ্বান করতে সুবিধা হয়, তিনি সাড়াও দেন দ্রুত। বয়স্কদের ৫-৬ ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট।
অনিদ্রার দাওয়াই কখনও স্লিপিং পিল নয়। দীর্ঘদিন খেলে মারাত্মক সাইড এফেক্ট দেখা দেয়। ওষুধের উপর নির্ভরতা বাড়ে, তখন ডোজ বাড়াতে হয়। একসময় সেই ওষুধে আর কাজ করে না। আরও কড়া ওষুধ খেতে হয়। যেগুলো আমাদের মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুর উপর নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। বরং ঘুম কেন হচ্ছে না অর্থাৎ নেপথ্যের কারণটি কী, সেটি আগে খুঁজে বের করার চেষ্টা করা উচিত। শারীরিক নানা কারণ থাকতে পারে। যেমন বাত, হাঁপানি, হাই প??
Advertisement