সংবাদদাতা, ঘাটাল: সরকারি নথিতে অবসরের সিল পড়েছে অনেক আগেই। কিন্তু তাতে যেন থামেনি রামজীবনপুর সার্কেলের লক্ষ্মীপুর দক্ষিণপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অশোককুমার চক্রবর্তীর। এখনও প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়েই পৌঁছে যান বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। ঘণ্টা পড়ার আগেই ঘুরে দেখেন ক্লাসরুম, খোঁজ নেন ছাত্রছাত্রীদের, নিয়ম করে বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত ক্লাসও নেন। বাস্তবে তিনি কিন্তু আর ওই স্কুলের বেতনভুক শিক্ষক নন। অবসরে স্কুলে গিয়ে নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার জন্য একটি টাকা পারিশ্রমিকও নেন না। অবসরের পরেও শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীদের টান আর শিক্ষকতার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই টানা কয়েক বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে পাঠদান করে চলেছেন তিনি। যেন স্কুলটাই তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। রামজীবনপুর সার্কেলের এসআই সুনীতা রানা বলেন, এমন শিক্ষক আমার চোখে এর আগে পড়েনি। বিনা পারিশ্রমিকে নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার ঘটনা সত্যিই বিরল। তাঁকে সাম্মানিকের বিনিময়ে উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ তিনি সবিনয়ে ফিরিয়ে দিয়েছেন। কারণ তাঁর কাছে শিক্ষকতা কোনও ব্যবসার মাধ্যম নয়।
অশোকবাবুর বাড়ি চন্দ্রকোণা থানার লক্ষ্মীপুর গ্রামে। কর্মজীবনের প্রথম প্রহরে তিনি গড়বেতার কেশিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দায়িত্ব সামলেছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন, তবে ২০০৬ সালে যখন তিনি লক্ষ্মীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পা রাখেন, তখন স্কুল বলতে ছিল স্রেফ একটি জীর্ণ ক্লাবঘর। বিদ্যালয়ে যোগদান করেই অশোকবাবুর লক্ষ্য ছিল এই স্কুলকে একদিন তিনি আদর্শ বিদ্যাপীঠ করে তুলবেন। সেই জেদ আর নিরলস পরিশ্রমে আজ স্কুলের ভোল বদলেছে। সরকারি সহায়তা আর গ্রামবাসীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে আজ তৈরি হয়েছে স্কুলের নিজস্ব পাকা ভবন।
স্কুলে কেবল পড়ানো নয়, প্রতিটি শিশুর ব্যক্তিগত অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কোনও পড়ুয়া দু’দিন স্কুলে না এলে বা কেউ অসুস্থ হলে, অশোকবাবু নিজেই পৌঁছে যেতেন তাদের বাড়িতে, সেই অভ্যেস এখনও রয়েছে। এই মায়ার বাঁধনই কাল হয়েছিল ২০২৩ সালের অবসরের দিনে। সেদিন গোটা স্কুল চত্বর যেন শোকাতুর হয়ে পড়েছিল। স্যারের বিদায়বেলায় ছোট ছোট পড়ুয়াদের চোখের জল ছিল এক অন্যরকম প্রাপ্তি। কিন্তু বিচ্ছেদ সেখানে শেষ হয়নি। তাদের সমবেত আবদার ছিল একটাই, ‘স্যার, আপনি স্কুলে না ফিরলে আমরা পড়ব না’।
ছাত্রছাত্রীদের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা আর আর্তিকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা ছিল না তাঁর। গত তিন বছর ধরে ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো’ সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে তিনি প্রতিদিন বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার পথ উজিয়ে স্কুলে আসেন। স্কুলের প্রার্থনার শুরু থেকে ছুটির ঘণ্টা পর্যন্ত তাঁর ক্লান্তিহীন বিচরণ। স্কুলের টিআইসি প্রদীপ মাইতি কৃতজ্ঞচিত্তে বলেন, অশোকবাবুর মতো দায়বদ্ধ মানুষ এ যুগে মেলা ভার। উনি না থাকলে সেই সময় একা এতগুলো ক্লাস সামলানো আমার পক্ষে অসাধ্য হত। উনি আমাদের স্কুলের স্তম্ভ।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি সফল, ছেলেকে চিকিৎসক করে গড়ে তোলা বা মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করা সব কর্তব্যই তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। অশোকবাবু বলেন, শিক্ষকতার অবসর রয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। জীবনে ছাত্রছাত্রী পড়িয়ে বহু টাকা পেয়েছি। তাই শেষ বয়সে শিক্ষাদানের বিনিময়ে টাকা রোজগার করতে চাই না।