অগ্নিভ ভৌমিক, ধুবুলিয়া: দেশভাগের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে ওপার বাংলা থেকে বহু মানুষ চলে এসেছিলেন নদীয়া জেলার ধুবুলিয়াতে। সেই ধুবুলিয়া এখন কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভার অন্তর্গত। এবারের এসআইআর ধুবুলিয়ার মানুষকে প্রায় আশি বছরের পুরোনো সেই তিক্ত স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়েছে। নাম বাদ গিয়েছে প্রায় ১২ হাজার ‘বিচারাধীন’ ভোটারের। সবমিলিয়ে এই কেন্দ্রে ভোটার কমেছে ২৫ হাজারের বেশি। এসআইআরে নাম বাদ যাওয়া এবং বাম-কংগ্রেসের ভোট কাটাকাটির অঙ্ক চিন্তায় রেখেছে দুই ফুল শিবিরকেই।
কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভায় কৃষ্ণনগর-২ ব্লকে ৭টি এবং কৃষ্ণনগর-১ ব্লকে ৫টি পঞ্চায়েত রয়েছে। বরাবর দেখা গিয়েছে, এই কেন্দ্রে তৃণমূলের জয়-পরাজয় কৃষ্ণনগর-২ ব্লকের উপর নির্ভর করে। এই ব্লকের ৭টি পঞ্চায়েতের মধ্যে ৫টা তৃণমূলের দখলে।আর কৃষ্ণনগর-১ ব্লকের ৫টা পঞ্চায়েতের মধ্যে মাত্র ১টা তাদের। এই কেন্দ্রে প্রায় ২৮ শতাংশ ভোট সংখ্যালঘুদের, যাএবারের ভোটে নির্ণায়ক হতে চলেছে।
২০১১ সাল থেকেই কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভা তৃণমূলের দুর্গ। তবে এবার লড়াইটা চতুর্মুখী। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট ভেঙে বামেরা নিজেদের ভোট বাড়াতে চাইছে। এখানে সিপিআইএমএল প্রার্থী তরুণ লাবণী জঙ্গি। অন্যদিকে বহু বছর পর এই কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস প্রার্থী দেওয়ায় চাঙ্গা হাত শিবিরও। নাম বাদ যাওয়া ভোটারদের ট্রাইবুনালে আবেদন করতে সহায়তার জন্য হেল্প ডেস্ক খুলে জনসংযোগ করছেন কংগ্রেসের আইনজীবী প্রার্থী আব্দুল রহিম শেখ। বিজেপি প্রার্থী করেছেসাধন ঘোষকে। যাঁকে নিয়ে অন্যান্য আসনের মতো এই কেন্দ্রে দলের অন্দরে সেভাবে ক্ষোভ নেই। বিজেপির ভোট ব্যাঙ্ক ধরে রাখতে তিনিও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চুটিয়ে প্রচার করছেন। যদিও গালিগালাজ করার তাঁর একটি অডিও তৃণমূলের তরফ থেকে ভাইরাল করা হয়েছে। অন্যদিকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের এই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল ফের প্রার্থী করেছে তিনবারের বিধায়ক বর্ষীয়ান উজ্জ্বল বিশ্বাসকে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহু লড়াইয়ের যোদ্ধা তিনি।
তৃণমূল প্রার্থী উজ্জ্বলবাবুর গলায়আত্মবিশ্বাসের সুর,‘এসআইআরের কারণে সব দলের ভোটারের নামই বাদ গিয়েছে। গত বিধানসভা নির্বাচনেও সবাই বলেছিল আমি নাকি হেরে যাব। তখন আমিই বলেছিলাম যে,জিতব। এবারেও জিতব বহু ভোটে।’ বিজেপি প্রার্থী সাধন ঘোষ বলেন, মানুষ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এতবছর এলাকায় মন্ত্রী থেকেও কোনো উন্নয়ন করতে পারেননি। যে অডিও ভাইরাল হয়েছে সেটা এআই অডিও। তৃণমূল পরাজয় নিশ্চিত বুঝেই এইসব করছে। সিপিআইএমএল প্রার্থী লাবণী জঙ্গী বলেন, এসআইআরের কারণে দুই ফুলের রাজনীতি নিয়ে মানুষ বীতশ্রদ্ধ। মানুষের মধ্যে বিভেদতৈরি করেছে বিজেপি। অন্যদিকে এলাকায় তাদের মন্ত্রী আছে বলে দম্ভ রয়েছে তৃণমূল নেতাদের। যা মানুষ পছন্দ করছে না। ওদের টাকা আর দম্ভ থাকলে, আমাদের মানুষ আছে।কংগ্রেস প্রার্থী আব্দুল রহিম শেখ বলেন, ‘যেভাবে তৃণমূল মানুষের উপর অত্যাচার করেছে, তাতে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বিজেপিকে মানুষ আগেই ত্যাগ করেছে।
২০০১ সালের ভরা বাম জমানাতে কৃষ্ণনগরে প্রথমবার ঘাসফুল ফুটেছিল। ২০১১ সাল থেকে কৃষ্ণনগর দক্ষিণ কেন্দ্র তৃণমূলেরই থেকে গিয়েছে। তবে বিগত কয়েক বছরে এই কেন্দ্রে বাম ভোটেই নিজেদের বাগান সাজিয়েছে বিজেপি। ২০১৬সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে সিপিএম পেয়েছিল ৩৮ শতাংশ ভোট এবং বিজেপি পেয়েছিল ১৩ শতাংশ ভোট। চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে সিপিএম পায় ১২ শতাংশ ভোট এবং বিজেপি পায় প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোট। ভোটের পাটিগণিত বলছে, বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে তৃণমূল জিতলেও লোকসভা নির্বাচনে পরপর দু’ বার বিজেপি এগিয়ে থেকেছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৬৭০০ এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ৯ হাজার ভোটে এগিয়েছিল বিজেপি। সেখানে একুশের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল জিতেছিল ৯,৩০৫ ভোটে।