শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: গাড়ি ভাড়া নিয়ে চালকই হয়ে গেল মালিক! আরটিও অফিসে গিয়ে রাতারাতি তৈরি হয় গাড়ির কাগজ। এমনকী, ব্যাঙ্ক ঋণ শোধের জাল নথি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জমা পড়ে যায়। তার ভিত্তিতে তৈরি হয় নতুন স্মার্ট কার্ড। এরপর অনলাইনে গাড়ি কেনাবেচার একটি সংস্থার কাছে বিক্রি হয়ে যায় সেই গাড়ি। গাড়িটি হাতবদল হয়ে এখন যে ওই সংস্থার গ্যারাজে রয়েছে, জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের সূত্র ধরে তা জানা যায়। শাসন থানা গাড়িটি উদ্ধার করলেও অভিযুক্ত বেপাত্তা। গোটা ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে কৃষ্ণনগর আরটিও অফিসের কর্মী-আধিকারিকদের একাংশের ভূমিকা।
পুলিস সূত্রে জানা যাচ্ছে, ঘোলার বাসিন্দা সুজিত দে গাড়ি ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা করেন। তাঁর কাছ থেকে এক সপ্তাহের জন্য অনলাইনে গাড়ি ভাড়া নেয় একটি সংস্থা। সেই সূত্রেই আশিক বিশ্বাস নামে এক চালকের সঙ্গে পরিচয় হয় সুজিতের। গত ১৭ জুলাই সে একটি গাড়ি ১০ দিনের জন্য সুজিতবাবুর থেকে ভাড়া নেয়। এর জন্য আশিক নিজের আধারেও জমা দিয়েছিল। কিন্ত ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও গাড়ি ফেরত না আসায় সুজিত আশিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কয়েকদিন পরই গাড়ি ফেরত দেওয়ার কথা জানায় ওই চালক। এর জন্য বাড়তি টাকা দিতেও রাজি হয়। মালিক এই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে গাড়িটি ফেরত দিতে বলেন। তারপরেও গাড়ি ফেরত না পেয়ে জিপিএস ট্র্যাক করে জানতে পারেন, উত্তর ২৪ পরগনার খড়িবেড়িয়া এলাকায় অনলাইনে গাড়ি কেনাবেচার একটি কোম্পানির গ্যারাজে রয়েছে গাড়িটি। সঙ্গে সঙ্গে তিনি শাসন থানায় অভিযোগ করেন। মোবাইলের সঙ্গে গাড়ির সংযোগ থাকায় সুজিতকে হর্ন দিতে বলে পুলিস। মোবাইল থেকে সেই ‘অপশন’ চালু করা মাত্র পুলিস গাড়িটি চিহ্নিত করে। সেই সঙ্গে গাড়িটির প্রকৃত মালিকানা নিয়েও অনেকটা নিশ্চিন্ত হয় তারা। ২৮ জুলাই পুলিস উদ্ধার করে গাড়িটি।
পরবর্তী তদন্তে সামনে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। সরকারি অ্যাপে গাড়ির ঠিকুজি-কোষ্ঠী খুঁজতে গিয়ে তদন্তকারীরা দেখেন, গাড়িটির মালিকের নাম ও ঠিকানা বদলে গিয়েছে। ব্যাঙ্ক ঋণ থাকার পরেও নতুন স্মার্ট কার্ড ইস্যু হয়ে গিয়েছে। অভিযুক্তের বাড়ি ধানতলা এলাকায়। গাড়ির মালিককে সে জাল আধার জমা দিয়েছিল। তদন্তে আরও জানা যায়, আশিক নামে ওই চালক ২৩ জুলাই গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে দালালদের মাধ্যমে হাজির হয় কৃষ্ণনগর আরটিও অফিসে। অভিযোগ, সেখানকার কর্মীদের একাংশের সাহায্যে গাড়ির মালিকের সই, অন্যান্য নথি ও অথরাইজেশন জাল করে গাড়ির মালিকের নাম ও ঠিকানা বদল করে। ঋণ শোধের ভুয়ো নথি তৈরি করে বারাকপুর আরটিওতে জমা দিয়ে ‘নো অবজেকশন’ নেয়। সেটি কৃষ্ণনগর আরটিও অফিসে জমা করে নতুন স্মার্ট কার্ড তৈরি করে। এরপর সে অনলাইনে গাড়ি কেনাবেচার কোম্পানিকে আট লক্ষ টাকায় গাড়িটি বিক্রি করে বলে জানা গিয়েছে। এর পিছনে দালালদের একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। আরটিও অফিসের কর্মীদের মধ্যে কারা এই চক্রে জড়িত থাকতে পারেন, জানার চেষ্টা করছে পুলিস।