অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: পুজোর দিনগুলোতে কোথাও বুকস্টল তুলে দেওয়ার হুমকি, কোথাও স্টলে ঢুকে বই রাস্তায় ছুড়ে ফেলা, এমনকি বইয়ে লাথি মারার অভিযোগ। নদীয়ায় বামপন্থীদের বুক স্টলগুলিতে একের পর এক হামলার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এতকিছুর পরও বই বিক্রির হার কমেনি। বরং অন্যান্যবারের তুলনায় এবার প্রতিটি স্টলেই বই বিক্রি বেড়েছে বহুগুণ। সিপিএম, এসইউসিআই ও আরএসপি—তিন দলের বুক স্টল মিলিয়ে প্রায় ৮ লক্ষ ২০ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে বলে দাবি। গত বছরের তুলনায় সিপিএমের বই বিক্রি দ্বিগুণ হয়েছে। বই বিক্রি বৃদ্ধি পেয়েছে এসইউসিআইয়ের স্টলগুলিতেও। এই তথ্য এটাই প্রমাণ করে, হামলাকারীদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে বই কিনে নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছেন বইপ্রেমীরা। যা সমাজের কাছে শিক্ষণীয় বলে মনে করছেন সমাজের বিদগ্ধজনেরা। বামেরাও বলছেন, নানা বাধা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও বইয়ের প্রতি মানুষের এই ভালোবাসা নীরব প্রতিবাদেরই শামিল।
সাহিত্যিক তমাল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘পুজো মানেই সবাই ঠাকুর দেখতে যাবেন, তা নয়। বই পড়া, নতুন লেখকদের লেখা জানা কিংবা বামপন্থী, দক্ষিণপন্থী ও ইসলামীয় সংগঠনের বইয়ের স্টল থেকে বিভিন্ন মতাদর্শ ও দর্শন সম্পর্কে জানাও উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’ কৃষ্ণনগরেরর আদি বাসিন্দা সঞ্জিত দত্ত বলছিলেন, ‘বইয়ের স্টলে হামলা, বই ছুড়ে ফেলে লাথি মারা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও নিন্দনীয়। তাই সাধারণ মানুষ বই কিনে মানুষ নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছেন। মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছেন বই হল সভ্যতা বিকাশের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বই ছুড়ে ফেলে লাথি মারা হচ্ছে! এটা কি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত নয়?’ বুকস্টলে হামলার ঘটনায় বিব্রত শিক্ষক সব্যসাচী মখোপাধ্যায়। তিনি বলছিলেন, ‘বই হল চলমান সভ্যতার অন্যতম হাতিয়ার। বই ছাড়া শিক্ষা সম্পূর্ণ হতে পারে না। যতই বাধা বিপত্তি আসুক শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ মাত্রই বই কিনবেন।’
সিপিএম সূত্রে খবর, এবারের পুজোয় নদীয়া জেলায় সিপিএমের তরফে মোট ৪২টি বুক স্টল করা হয়েছিল। সবমিলিয়ে ৬ লক্ষ টাকার বই বিক্রি হয়েছে বলে দাবি দলের। গত বছর বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩ লক্ষ টাকা। সিপিএমের জেলা কমিটির সদস্য সুমিত বিশ্বাস বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এমনই হিসেব পাওয়া গিয়েছে। আরও কিছুটা বাড়তে পারে। এর থেকে এটাই স্পষ্ট, স্টলের উপর হামলা চালিয়ে বইয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে কেড়ে নেওয়া যায় না। বরং বহু মানুষ হামলার প্রতিবাদ জানাতে বই কিনেছেন আমাদের স্টল থেকে।’
অন্যদিকে, এসইউসিআইয়ের ৩৬টি বুক স্টল থেকে এবার ২ লক্ষ ৩ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে। গত বছর এই দলের বই বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ ৭ হাজার টাকা। চাপড়ায় এসইউসির বুকস্টলে ব্যাপক হামলা চালায় একদল যুবক। সবাইকে অবাক করে চাপড়ার স্টলে এসইউসির বই বিক্রি ৩ হাজার ১০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। এসইউসিআই নেতা অঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘এবছর আমাদের বই বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।’ কৃষ্ণনগর পোস্ট অফিস মোড়ে আরএসপির তরফে একটি বুক স্টল করা হয়েছিল। অষ্টমীর সন্ধ্যায় সেই স্টলে দেদার ভাঙচুর চালায় একদল দুষ্কৃতী। একাধিক বই রাস্তায় ছুড়ে ফেলে তাতে লাথি মারতে থাকে তারা। দেওয়া হয় ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানও। বহু মানুষ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন ওই স্টল থেকে বই কিনে। গতবারে ৮ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। এবার ১৭ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে বলে দাবি দলীয় নেতৃত্বের। বুকস্টলে হামলার ফাইল চিত্র



