সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর : রথযাত্রা মানেই ভক্তি, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য মিলন। বাংলার রথযাত্রার ঐতিহ্যে প্রতিটি রথেরই রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। কোথাও জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার দর্শন, কোথাও আবার রাধাকৃষ্ণের যুগলবিগ্রহকে কেন্দ্র করে ভক্তদের ঢল নামে। কিন্তু নদিয়ার কৃষ্ণনগরের গোয়াড়ী বাজারের শ্রীচৈতন্য গৌড়ীয় মঠের রথযাত্রা এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। কারণ, এখানে একই রথে একসঙ্গে বিরাজ করেন শ্রী গোপীনাথ জী, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, শ্রীরাধারাণী, শ্রীবলদেব এবং গুরুবর্গ। এই বিরল দর্শনের জন্য প্রতিবছরই দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য দর্শনার্থীর সমাগম হয় মঠ প্রাঙ্গণে। এই মঠে রথযাত্রার প্রস্তুতি জোরকদমে শুরু হয়ে গিয়েছে।
মঠের সেবায়তদের থেকে জানা যায়, ১৯৬২ সালে শ্রীচৈতন্য গৌড়ীয় মঠের রথযাত্রার সূচনা হয়। একই দিনে শ্রী মাধব গোস্বামী মহারাজের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রীশ্রী গৌরাঙ্গ রাধা গোপীনাথজী মন্দিরের। সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করেই প্রতি বছর রথযাত্রা উৎসব মহাসমারোহে পালিত হয়ে আসছে। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই উৎসব কৃষ্ণনগরের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে আসছে। রথযাত্রার দিন সকাল থেকেই মঠ প্রাঙ্গণে ভক্তদের ভিড় জমতে শুরু করে। সুসজ্জিত রথে আরোহন করেন শ্রী গোপীনাথ জী, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, শ্রীরাধারাণী, শ্রীবলদেব ও গুরুবর্গ। এরপর খোল, করতাল, শঙ্খধ্বনি এবং নিরবচ্ছিন্ন হরিনাম সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে রথ রাজপথে নগর পরিক্রমায় বের হয়। মাঠের সেবায়েত ঋষিকেশ দাস ব্রহ্মচারী বলেন, একসময় এই রথযাত্রা ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট পরিসরের। স্থানীয় ভক্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল উৎসবের আয়োজন। এখন গোপীনাথের প্রভাব ও মাহাত্ম্য বেড়েছে। প্রতিষ্ঠাতা শ্রী মাধব গোস্বামী মহারাজ ও তাঁর শিষ্য তীর্থ গোস্বামী মহারাজের আশীর্বাদ নিয়ে এবং বর্তমান আচার্য্য শ্রী বিষ্ণু মহারাজের নির্দেশে এবারও তিন দিন ধরে নানা অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে আমাদের রথযাত্রা উৎসব পালিত হবে। প্রথম দিন অধিবাস কীর্তন, দ্বিতীয় দিন গুন্ডিচা মার্জন এবং মহাভিষেক এবং শেষদিন রথযাত্রার মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়। প্রতিদিনই থাকবে প্রসাদ বিতরণ।মঠে প্রভুর উদ্দেশ্যে ৬৪ প্রকার ব্যঞ্জনে সজ্জিত মহাভোগ নিবেদন করা হয়। এবছর প্রায় সাত হাজার ভক্তের জন্য খিচুড়ি ভোগের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া যারা বসে প্রসাদ নেবেন তাদের জন্য অন্ন, ডাল, লাবড়া, পটল পনির, পায়েস দেওয়া হবে। আবার বিভিন্ন সময়ে সোয়াবিন, বোদেরও আয়োজন থাকছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আদর্শ অনুসরণ করায় এই মঠে উল্টো রথের প্রচলন নেই। তাই রাজপথ দিয়ে নগর পরিক্রমা করার পর রথ আবার পুনরায় মঠেই ফিরে আসে।