নতুন আঙ্গিকে রামায়ণ, ভিএফএক্স-এর মানদণ্ড তৈরি করে দিল এই সিনেমা
  • ৭ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাম-রাবণের দ্বন্দ্ব। অশুভর বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়। এটাই মহাকাব্যের মূল বিষয়। চিরাচরিত কিংবদন্তিকে নতুন করে পর্দায় তুলে ধরা চ্যালেঞ্জের। সেই আপাত কঠিন কাজটাই দক্ষ হাতে সামলেছেন ‘রামায়ণ: পার্ট ১’ ছবির নির্মাতারা। ভারতীয় সিনে জগতে ভিএফএক্স-এর মানদণ্ড তৈরি করে দিল এই সিনেমা। 

Advertisement

অযোধ্যা নয়, পরিচালক নীতেশ তিওয়ারির ‘রামায়ণ’ শুরু হচ্ছে দশাননের লঙ্কা বিজয় দিয়ে। শৈশব থেকেই পরাক্রমশালী রাবণের সহস্র বছরের তপস্যায় সন্তুষ্ট হন প্রজাপতি ব্রহ্মা। তাঁর আশীর্বাদে সমস্ত দেবতা, রাক্ষসের অবধ্য হয়ে ওঠেন রাবণ। তবে মানুষের হাত থেকে রক্ষাকবচ চাইতে ভুলে যান তিনি। অহংকারে। মনুষ্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। বর লাভ করেই শুরু হয় রাবণের অত্যাচার। ত্রিলোকে ত্রাহি ত্রাহি রব। একদিকে শিবস্তুতি, নৃত্যশৈলী, অন্যদিকে যুদ্ধ, নিপীড়ন— পর্দার রাবণরূপী যশ শুরু থেকেই ছবির মূল সুর বেঁধে দেন। তাঁর পারফরম্যান্স ছবির ইউএসপি। ভয় ধরানো অভিনয়ে, শরীরী ভাষ্যে আর অভিব্যক্তিতে যশকে দারুণ লাগবে রাবণের ভূমিকায়। লঙ্কাধিপতির বিনাশ করতে অবতীর্ণ হন বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রাম। অযোধ্যার যজ্ঞ, জন্মলগ্ন, রাম-লক্ষ্মণ-ভরত-শত্রুঘ্নর শৈশব, যুদ্ধশিক্ষার পর্ব যথাযথ। রণবীর কাপুর প্রথম থেকেই অত্যন্ত সংযত। পর্দায় তাঁকে ‘রাম’ হিসাবে ভালো লেগেছে। চরিত্রের প্রতি মর্যাদা, সংযম যেন কোনোভাবেই আহত না হয়, সেদিকে খেয়াল রেখেছেন তিনি। তাঁর শান্ত দৃষ্টি, মার্জিত আচরণ, স্মিত হাসি— সমালোচকদের জবাব দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। অ্যাকশনেও তিনি সাবলীল। অরণ্যকাণ্ডে গাছে চড়ে তির ছোড়া হোক বা খর-দূষণ বধ, রণবীর সেরাটা দিয়েছেন। বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরামের ভূমিকাতেও তিনি নজরকাড়া। রণবীরের সঙ্গে সীতার ভূমিকায় সাই পল্লবীর রসায়নও অনবদ্য। ছবিতে সীতা অন্তঃপুরবাসিনী নন, তিনি শক্তিস্বরূপা, বুদ্ধিমতী। যুদ্ধক্ষেত্রে রাম-লক্ষ্মণের সঙ্গে তিনিও অস্ত্রধারণ করেন। ব্রাহ্মণরূপী রাবণকে দেখেই তিনি লক্ষ্মণ রেখা পার করেন না। বরং সন্দেহ করেন। সেই সংশয় নিবারণে তিনি রাবণকে প্রশ্ন করেন। এখানেই নিজস্ব ছাপ রেখেছেন পরিচালক নীতেশ তিওয়ারি। মনে পড়বে ‘দঙ্গল’ ছবির সেই সংলাপ, ‘হামারও ছোরি ছোরো সে কম হ্যায় ক্যায়া!’ 
পরিচালকের নিজস্বতার পরিচয় মিলবে লক্ষ্মণের চরিত্রায়নেও। লক্ষ্মণের মতো বীর যোদ্ধার প্রতি সম্মান দিয়েও তাঁর সংলাপে সূক্ষ্ম কমেডির ছোঁয়া দিয়েছেন পরিচালক। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কমিক রিলিফ নয়। রবি দুবে লক্ষ্মণের ভূমিকায় অসাধারণ। অরুণ গোভিলের দশরথ, লারা দত্তর কৈকেয়ীও যথাযথ। মূল বাল্মিকী রামায়ণের সঙ্গে আঞ্চলিক নানা ভাষ্যকেও গুরুত্ব দিয়েছেন নির্মাতারা। পৃথক আঙ্গিকে দেখানো হয়েছে শূর্পনখার (রাকুলপ্রীত সিং) গল্প। 
ছবির মেরুদণ্ড ভিএফএক্স। বিশাল ক্যানভাসে চোখ ধাঁধানো স্বর্ণলঙ্কা, পুষ্পক রথ থেকে অরণ্য, পশুপাখি— দুর্ধর্ষ। ক্লাইম্যাক্সে রাবণের সঙ্গে জটায়ুর যুদ্ধ প্রাণ পেয়েছে ভিএফএক্স-এর গুণেই। এ আর রহমান ও হান্স জিমারের মিউজিক অসাধারণ। কয়েকটি বিষয়ে আরেকটু নজর দিতে পারতেন নির্মাতারা। রামায়ণের মতো মহাকাব্যের কয়েকটি দৃশ্যের সংলাপ নিয়ে আরও সচেতন হওয়া দরকার ছিল। নজর দেওয়া যেত অ্যাকশনেও। তা সত্ত্বেও এই ছবি উপভোগ্য। পোস্ট ক্রেডিট সিনে দেখা মিলবে সানি দেওলের বজরংবলির ঝলক। কাউন্টডাউন শুরু ‘রামায়ণ: পার্ট ২’-এর। রাম-রাবণের সম্মুখ সমরের। 
শান্তনু দত্ত