রামকুমার আচার্য, ভাবাদিঘি: সালটা ২০০১। আজকের বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী। ‘রাঙামাটি’র সঙ্গে কলকাতার দূরত্ব কমিয়ে আনতে গ্রহণ করলেন তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর রেল প্রকল্প। ওই বছরই হল শিলান্যাস। প্রাথমিক পর্যায়ের কাজও শুরু হয়ে যায়। ভাবাদিঘিতে এসে থমকে যায় সবকিছু। তারপর দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ-আন্দোলন দেখেছে ভাবাদিঘি। মামলা গড়িয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত। লক্ষ্মীবারে সব জটিলতার অবসান। কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় ভাবাদিঘিতে কাজ শুরু করল রেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন রাঙামাটির দুই জেলা পুরুলিয়া, বাঁকুড়া সহ হুগলির আরামবাগ।
কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানমের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, ভাবাদিঘির আশপাশের মানুষের স্বার্থে কোনওরকম আঘাত না দিয়ে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশের সহযোগিতা নিতে পারে রেল। সেই মতো এদিন সকাল থেকে কড়া পুলিশি পাহারায় ভাবাদিঘির অ্যাপ্রোচ অংশে মাটি ফেলার কাজ শুরু করে পূর্ব রেল। না, কোনওপ্রকার বাধা আসেনি। ডাম্পারে করে মাটি নিয়ে এসে ফেলা হয়। কাজে লাগানো হয়েছে জেসিবিকেও। এখন তিন জেলার বাসিন্দারা দিন গুনছেন, বিষ্ণুপুরের সঙ্গে তারকেশ্বর রেল যোগাযোগ কবে সম্পন্ন হবে। গত বুধবার কলকাতা হাইকোর্টের রায়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, যত দ্রুত সম্ভব কাজ শুরু করতে হবে। সেইমতো ওইদিনই কাজের প্রস্তুতি নিয়ে পরিকল্পনা করে ফেলে পূর্ব রেল। এদিন সকালে ভাবাদিঘি গ্রামে ঢোকার মুখে রেলের আন্ডারপাশের কাছে একটি এলাকায় মাটি ফেলা শুরু হয়। অশান্তি এড়াতে পুলিশও তৎপর ছিল। ভাবাদিঘিতে হাজির ছিলেন গোঘাট থানার আইসি মধুসূদন পাল। মহিলা সহ বিশাল পুলিশ বাহিনীও মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি আরপিএফ কর্মীরাও নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। সবমিলিয়ে এদিন সুষ্ঠুভাবে কাজ সম্পন্ন হয়।
এদিন সকালে ভাবাদিঘিতে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই রেলের কাজের কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করছেন। কিন্তু কেউই কাজে কোনও রকম বাধা দেননি। আবার মুখও খুলতে চাননি। থমথমে পরিবেশ। কাজ চলতে থাকে নিজের গতিতে। একের পর এক ডাম্পার এসে মাটি ফেলতে থাকে। যন্ত্রের সাহায্যে রেল লাইন পাতার অংশে লেবেল দেখার কাজও চলেছে সমানে। এখন নাগাড়ে কাজ চলবে বলে রেল সূত্রের খবর। সেক্ষেত্রে শ্রমিকদের ভাবাদিঘিতে থাকার বন্দোবস্ত হতে পারে। ভাবাদিঘিতে পুরো কাজের তদারকি করেছিলেন পূর্ব রেলের সিনিয়র সেকশন ইঞ্জিনিয়ার তথা রেল প্রকল্পের ইনচার্জ ইন্দ্রজিৎ হাজারি। সাংবাদিকদের তিনি বলছিলেন, ‘এদিন গ্রামবাসী, পুলিশ, আরপিএফ সকলের সহযোগিতায় কাজ হয়েছে। আপাতত কিছুদিন মাটি ফেলার কাজই চলবে। ভাবাদিঘির উপর সেতু নির্মাণে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে।’
এদিকে, ভাবাদিঘি বাঁচাও কমিটির সম্পাদক সুকুমার রায় বলেন, ‘গত মঙ্গলবার ভাবাদিঘিতে এসে স্থানীয়দের বৈঠকের আশ্বাস দিয়েছিল প্রশাসন। কিন্তু সেই বৈঠক না করেই রেল অ্যাপ্রোচ অংশে কাজ শুরু করেছে। হাইকোর্টের নির্দেশে কাজ শুরু হয়েছে বলে আমরা বাধা দিইনি। তবে, পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য আইনি পরামর্শ নিচ্ছি।’ তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর প্রস্তাবিত রেল প্রকল্পে আপাতত আরামবাগ হয়ে গোঘাট পর্যন্ত ট্রেন চলছে। গোঘাট থেকে কামারপুকুরের মাঝে রয়েছে ভাবাদিঘি। গোঘাট স্টেশন থেকে ভাবাদিঘির দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। অন্যদিকে, ভাবাদিঘি থেকে কামারপুকুরের দিকে কয়েকশো মিটার অংশ বাদে লাইন পাতা রয়েছে। আগামী বছরের মধ্যেই ভাবাদিঘির অংশে কাজ শেষ হয়ে যেতে পারে বলে রেল কর্তৃপক্ষের আশা। নিজস্ব চিত্র